সাশ্রয় নিউজ ★ সাইপ্রাস : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) পেলেন সাইপ্রাসের (Cyprus) সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘গ্র্যান্ড ক্রস অফ দ্য মাকারিওস থ্রি’ (Grand Cross of the Order of Makarios III)। রাষ্ট্রনায়কোচিত অভ্যর্থনা, আন্তরিকতা আর দুই দেশের বন্ধুত্বের গভীর বার্তা, এই সফর মৈত্রীর এক অনন্য পর্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সম্মান গ্রহণ করে বললেন, “এই সম্মান কেবল আমার ব্যক্তিগত সম্মান নয়, ১৪০ কোটি ভারতবাসীর প্রাপ্য। এ হল ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ দর্শনের স্বীকৃতি।” দেশটির রাষ্ট্রপতি নিকোস ক্রিস্টোডুলিডিস (Nikos Christodoulides)-এর হাত থেকে এই বিরল সম্মান গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সাইপ্রাসের প্রথম রাষ্ট্রপতি আর্কবিশপ মাকারিওস থ্রি (Makarios III)-এর নামেই এই সম্মান, যা দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
প্রধানমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট, এই সফরের গুরুত্ব নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের গণ্ডিতে আটকে নেই। তিনি বলেন, “এই সম্মান দুই দেশের শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক। এটি ভারত-সাইপ্রাস সম্পর্কের ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে।” দুই দেশের সম্পর্কের ৬০ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করেছে, এবং মোদীর এই সফর তাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে বলেই মত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের। সাইপ্রাসে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে লারনাকা বিমানবন্দরে স্বাগত জানান দেশটির রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টোডুলিডিস। পরে দুই রাষ্ট্রনেতা মিলিত হন একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে। ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি ও সাইপ্রাসের ইউরোপীয় অবস্থান, দু’টি মিলিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তাঁরা আশাবাদী। মোদী বলেন, “আমরা দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দ্বার খুলতে পারি। ভারতের বাজার, সাইপ্রাসের প্রযুক্তি ও ইউরোপিয়ান সংযোগ একসঙ্গে অনেক কিছু গড়ে তুলতে পারে।” দুই রাষ্ট্র নেতার বৈঠকে পর্যটন শিল্পকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মোদী বলেন, “সাইপ্রাস ভারতীয় পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।” পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টোডুলিডিসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারত সফরে আসার জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও সাইপ্রাসের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা বিগত দশকে অনেকটাই বেড়েছে। মোদীর মন্তব্য, “আমরা একসঙ্গে শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়াই, সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলি, এবং বিশ্বজনীন সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত।”
প্রসঙ্গত, রবিবারই ভারত থেকে ত্রিদেশীয় সফরে রওনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রথমেই গন্তব্য ছিল সাইপ্রাস। এরপর তাঁর যাওয়ার কথা ক্রোয়েশিয়া (Croatia) এবং কানাডায় (Canada) অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) সম্মেলনে যোগ দিতে। তবে সফরের সূচনা সাইপ্রাসে করাই ছিল এক কৌশলী কূটনৈতিক বার্তা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে চায় ভারত ও সাইপ্রাস তার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলে বৈদেশিক কূটনীতিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন। অন্যদিকে, তাঁর বিদেশ সফরের প্রথম দিনেই মোদীর সম্মানে আয়োজিত এক বিশেষ নৈশভোজে দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের বার্তা ফুটে ওঠে। ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও নৃত্যের পরিবেশনা সেখানে উষ্ণতা নিয়ে আসে। মোদী বলেন, “ভাষা আলাদা হলেও হৃদয়ের বন্ধনই সবচেয়ে বড় সেতু।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, সাইপ্রাসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত বিনিময়ের বিষয়েও এবার অগ্রগতি হতে পারে।
অন্যদিকে সাইপ্রাসের রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টোডুলিডিসও মোদীকে ‘এক দুরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর কথায়, “ভারতের নেতৃত্বে আজ বিশ্ব নতুনভাবে ভারতকে দেখছে। এই সম্মান তারই প্রতিফলন।” আন্তর্জাতিক রাজনীতির পটভূমিতে এই সফরকে কেবল সম্মান প্রদান বা সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কূটনীতিক মহল মনে করছেন, এটি ভারতীয় কূটনীতির এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। সেখানে উন্নয়ন, অংশীদারিত্ব ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে ভবিষ্যতের রূপরেখা রচিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত, এই সফর ভারতের ‘Act East’ ও ‘Link West’ নীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ জিয়োপলিটিক্যাল সেতুবন্ধন গড়তে চলেছে বলেই মত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। এখন দেখার, প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সফর কেবল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ-ই নয়, সেটি থেকে দুই দেশের ভেতর ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দিকও দেখা যায়।
ছবি ঋণ: পিটিআই




