সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি: দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক শুধু কূটনীতির গণ্ডিতে আটকে নেই, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূরাজনীতি ও মানুষের আবেগেও তার গভীর ছাপ। সেই সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে মরিশাসের (Mauritius) প্রধানমন্ত্রী নবীনচন্দ্র রামগুলাম (Navinchandra Ramgoolam)-এর সঙ্গে মঙ্গলবার সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। দুই রাষ্ট্রনেতার কথোপকথনের মূলে ছিল প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির কৌশল। ফোনালাপের সময় মোদী স্পষ্ট করেন যে, মরিশাস ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির অঙ্গ ও ‘ভিশন মহাসাগর’ (MAHASAGAR: Mutual and Holistic Advancement for Security and Growth Across Regions)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি বলেন, “ভারত মহাসাগর অঞ্চলের শান্তি ও বিকাশে মরিশাসের ভূমিকা অসামান্য। এই বন্ধুত্বকে আরও নতুন দিশা দিতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
মরিশাসের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধন শুধু রাজনৈতিক স্তরেই নয়, জনসম্পৃক্ততার স্তরেও সুদৃঢ়। সেদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। এই জনগোষ্ঠী দুই দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কে উষ্ণতা এনে দিয়েছে। মোদীর ফোনালাপে এই বিষয়টিও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে, “মোদী ও রামগুলাম দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হন। প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নয়নে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তাঁরা।”
আন্তর্জাতিক যোগ দিবসেও দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতার ছাপ মিলেছে। গত ২১ জুন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মরিশাসের সরব উপস্থিতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য রামগুলামের প্রশংসা করেন মোদী। এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে মোদী লেখেন, “আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগত দিক থেকে উন্নত করতে রামগুলামের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমি তাঁকে দ্রুত ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি।” ভারত-মরিশাস সম্পর্ক শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, এক্ষেত্রে অর্থনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। ২০০৫ সাল থেকেই মরিশাস ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। অর্থনীতির পরিসংখ্যান বলছে, এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২০৬.৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০২৩-২৪ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৮৫১.১৩ মিলিয়নে। ভারত থেকে ৭৭৮.০৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে মরিশাসে এবং সেখান থেকে এসেছে ৭৩.১০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে মরিশাস ভারতের পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দুই দেশই এ বিষয়ে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসদমন, মেরিটাইম ট্রানজিট ও উপকূলীয় নজরদারির মতো বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিকাঠামোতেও ভারত মরিশাসের পাশে রয়েছে। মোদীর ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ অভিযানের অংশ হিসেবে মরিশাসের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি। মোদীর দৃষ্টিতে, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলিতে দুই দেশই অভাবনীয় উন্নতি করতে পারে। এই ফোনালাপ যেন দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত। কূটনৈতিক আলোচনার বাইরেও এই কথোপকথন দুই রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যকেও সামনে এনে দিয়েছে। একে অন্যকে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধনের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও মজবুত হল বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও মরিশাসের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু কৌশলগত বা অর্থনৈতিক নয়, এটি দুই দেশের ঐতিহাসিক সংস্কৃতির এক ধারাবাহিক রূপ। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক দুই দেশের নাগরিকদের জন্য আরও সুসংবদ্ধ ও ফলপ্রসূ হবে, এমনটাই প্রত্যাশা। এই মুহূর্তে বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে ভারত এবং মরিশাসের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা যে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Pavel Durov | Telegram : সন্তানের সংখ্যা শতাধিক, এক লক্ষ কোটিরও বেশি সম্পত্তির মালিক, ব্যতিক্রমী ধনকুবের পাভেল দুরভ




