সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নতুন শ্রম বিধি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে জোর জল্পনা, হাতে পাওয়া বেতন কি কমে যাবে? বিশেষত যাঁরা ইতিমধ্যেই মাসিক বাজেট টানাটানির মধ্যে দিন কাটান, তাঁদের জন্য এই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নতুন আইনের ফলে বেতনের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ‘সিটিসি’ (CTC) এবং ‘বেসিক পে’ -এর (Basic Pay) অনুপাত পুরোপুরি বদলে দেবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক (Ministry of Labour and Employment) শুক্রবার এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পরিষ্কার জানিয়েছে, “নতুন শ্রম আইনে টেক-হোম স্যালারি কমবে, এ ধারণা পুরোপুরি ভুল।” মন্ত্রকের এক মুখপাত্র বলেন, “নতুন বিধির উদ্দেশ্য বেতন কমানো নয়। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভিন্নতা আনা।” একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) কর্তন বর্তমান বাধ্যতামূলক সীমার মধ্যেই থাকবে। তাই কর্মচারীর হাতে আসা বেতন অপরিবর্তিত থাকবে, যদি না সংস্থা অতিরিক্ত কোনও পরিবর্তন আনে।”

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের বেসিক বেতন ১৫,০০০ টাকার মধ্যে, তাঁদের ক্ষেত্রে ইপিএফও (EPFO) -এর স্কিমে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেসিক বেতন ১৫,০০০ টাকার বেশি হলে নিয়োগকর্তা ইপিএফ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে বাধ্য নন। এই নিয়মের ফলে বহু কর্মচারী সংগঠিত অবসর সঞ্চয়ের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছিলেন। নতুন আইনের পরও কিন্তু এই ১৫,০০০ টাকার বাধ্যতামূলক সীমা অপরিবর্তিত থাকছে। ফলে যাঁদের বেসিক বেতন বেশি হওয়ায় এখন পর্যন্ত ঐচ্ছিক ভিত্তিতে PF কাটা হত বা হত না, তা একই রকম থাকবে। ফলে টেক-হোম স্যালারি কমবে না বলেই জানাচ্ছে কেন্দ্র। মন্ত্রকের ব্যাখ্যা, “নতুন শ্রমবিধিতে PF কর্তনের সীমা পরিবর্তন হয়নি। তাই কর্মচারী এবং নিয়োগকর্তা উভয়ের PF ছাড় পূর্বের মতোই থাকবে।”
তবে বড় পরিবর্তন এসেছে CTC এবং বেসিক পে-এর অনুপাতে। এত দিন বেশিরভাগ সংস্থায় CTC -এর মাত্র ২০-২৫% ধরা হতো বেসিক বেতন হিসেবে। বাকি অংশ ভাতা, PF, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদি ধরা হত। কিন্তু নতুন শ্রম আইনে বলা হয়েছে, মোট CTC -এর অন্তত ৫০% বাধ্যতামূলকভাবে বেসিক বেতন হতে হবে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে শ্রম মন্ত্রক-
ধরা যাক, কারও বার্ষিক CTC ১২ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ মাসে ১ লক্ষ টাকা।
পুরনো নিয়মে-
* বেসিক পে: ২৫,০০০ টাকা
* PF ও গ্র্যাচুইটি: প্রায় ৩,০০০ টাকা
* ভাতা: ৭২,০০০ টাকা
নতুন নিয়মে-
* বেসিক পে: বেড়ে হবে ৫০,০০০ টাকা
* PF ও গ্র্যাচুইটি: প্রায় ৬,০০০ টাকা
* ভাতা: কমে হবে ৪৪,০০০ টাকা
এই পরিবর্তনের পর অনেকের আশঙ্কা ছিল, বেসিক বেতন বাড়লে PF-এর বাধ্যতামূলক ছাড়ও কি বাড়বে? ফলে কি টেক-হোম স্যালারি কমে যাবে? কিন্তু মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, “PF বাধ্যতামূলক ছাড় শুধুমাত্র ১৫,০০০ টাকার বেসিক বেতনের উপরই হিসাব করা হবে। অতিরিক্ত বেতনের ক্ষেত্রে কর্তন ‘ঐচ্ছিক’। তাই টেক-হোম স্যালারি কমবে না।” শ্রম মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কথায়, “কর্মচারীর নেট বেতন কমানোর মতো কোনও বিধান নতুন শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বরং কর্মচারীরা দীর্ঘমেয়াদে বেসিক বেতন বাড়ার কারণে গ্র্যাচুইটি ও PF -এর ক্ষেত্রে বড় সুরক্ষা পাবেন।”
এদিকে পাঁচ বছর আগেই সংসদে পাশ হয়েছিল চারটি শ্রমবিধি-
* বেতন সংক্রান্ত বিধি (Code on Wages),
* শিল্প সম্পর্ক সংক্রান্ত বিধি (Industrial Relations Code),
* সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধি (Social Security Code),
* পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত বিধি (OSH Code)।
কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইন বেসরকারি কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষা বাড়াবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনবে।
কিন্তু, সব কর্মচারীই যে সন্তুষ্ট, তা নয়। অনেকেই মনে করছেন, ভাতা কমে যাওয়ার ফলে হাতে পাওয়া অঙ্ক মোটামুটি একই থাকলেও তাৎক্ষণিক সুবিধার তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি PF এবং গ্র্যাচুইটি বেশি হওয়ার লাভ এখনই অনুভব করা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের বার্তা, “নতুন শ্রমবিধির উদ্দেশ্য কর্মচারীদের সুরক্ষা বৃদ্ধি, বেতন কমানো নয়।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Digital Census India 2027 | ডিজিটাল যুগে প্রথম জনসুমারি: নভেম্বরেই শুরু দেশজুড়ে পরীক্ষামূলক সমীক্ষা, ২০২৭-এ পূর্ণাঙ্গ জনগণনা




