সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার ঐতিহাসিক শহর লালবাগ (Lalbagh) শুধু পর্যটনের জন্যই বিখ্যাত নয়, এবার কুখ্যাত ঘটনার কারণে খবরের শিরোনামে উঠে এল। স্থানীয় সূত্রে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ হানা দিয়ে ফাঁস করল হোটেলের আড়ালে চলা দেহব্যবসার ঘটনা। বৃহস্পতিবার রাতে লালবাগের মুর্শিদাবাদ জংশন (Murshidabad Junction) সংলগ্ন এক হোটেলে অভিযান চালিয়ে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ উদ্ধার করেছে তিন যুবতীকে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া তিন জনের মধ্যে রয়েছেন হোটেল মালিক, ম্যানেজার এবং এক ‘খদ্দের’। ধৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন হোটেলের আড়ালে এই অবৈধ ব্যবসা চললেও প্রশাসন প্রথমে তেমন সক্রিয় হয়নি। তবে ক্রমবর্ধমান অভিযোগ এবং গোপন সূত্রে খবরের ভিত্তিতে অবশেষে পুলিশ পদক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। লালবাগ মহকুমার এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “নির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতেই অভিযানে নামা হয়। উদ্ধার হওয়া তিন মহিলার নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং শিগগিরই আরও কিছু হোটেলে অভিযান চালানো হবে।” প্রসঙ্গত, লালবাগ মূলত একটি ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র। হাজারদুয়ারি (Hazarduari Palace), মতিঝিল (Motijheel), নবাবি আমলের স্থাপত্য দেখতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসেন। আর সেই পর্যটনকেই ঢাল করে বেড়ে উঠছে হোটেল শিল্প। বর্তমানে শহরে প্রায় ১০০টিরও বেশি হোটেল রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, যেসব হোটেল ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ছিল, তারা মধুচক্রের মাধ্যমে লাভের পথ খুঁজে নিচ্ছে। রেজিস্ট্রি অফিস মোড় (Registry Office More) থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদ জংশন, মতিঝিল এবং হাজারদুয়ারি সংলগ্ন একাধিক হোটেলে দিনরাত অচেনা মানুষের ভিড় দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই হোটেলগুলিতে ভিড় বেড়ে যায় এবং সন্দেহজনক যাতায়াত চোখে পড়ে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “লালবাগে পর্যটন বাড়ছে, এটা আমাদের জন্য ভাল। কিন্তু হোটেলের আড়ালে যদি এই ধরনের মধুচক্র বসে, তাহলে শহরের সুনাম ধুলোয় মিশে যাবে।”
ঘটনা প্রেক্ষিতে পুলিশ জানায়, এই চক্র শুধু একটি হোটেলে সীমাবদ্ধ নয়। বহু হোটেলে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে দেহব্যবসা চলছে। তাই একের পর এক অভিযানে নামবে তারা। মুর্শিদাবাদ পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, “লালবাগে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে গেলে এবং পর্যটনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গেলে কড়া পদক্ষেপ করতেই হবে। দোষীদের কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না।” পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া যুবতীদের প্রাথমিকভাবে একটি সেফ হোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। পুলিশ মনে করছে, এদের মধ্যে অনেককে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে এই ব্যবসায় নামানো হয়েছে। তদন্তে মানবপাচারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লালবাগের মতো ঐতিহাসিক শহরে এই ধরনের ঘটনা প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক পর্যটকই বলেন, এ ধরনের ঘটনায় এলাকার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। পর্যটনের উপরেও প্রভাব পড়তে পারে। এক স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী বলেন, “মুর্শিদাবাদ মানেই ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস। সেই জায়গায় যদি এই ধরনের অবৈধ কাজকর্ম চলে, তাহলে বাইরের পর্যটকেরা নেতিবাচক ধারণা নিয়ে ফিরবেন। এটা প্রশাসনের কড়া নজরদারির দাবি রাখে।”
পুলিশ ইতিমধ্যেই শহরের সব হোটেলের উপর নজরদারি শুরু করেছে। মুর্শিদাবাদ জংশন থেকে হাজারদুয়ারির রাস্তা সংলগ্ন হোটেলগুলোতে বিশেষভাবে তল্লাশি চালানো হবে। জানা গিয়েছে, কিছু হোটেল মালিককে ইতিমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন জানিয়েছে, হোটেল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং পর্যটনের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হলে এই অবৈধ চক্র ভেঙে দিতে হবে। ফলে স্পষ্ট, পুলিশের এই পদক্ষেপ শুধু একটি অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, লালবাগ জুড়ে আরও কড়া নজরদারি চলবে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ চক্র শেষ পর্যন্ত ভাঙা যায় কি না।
ছবি: সংগৃহীত




