তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ✪ সাশ্রয় নিউজ : জাপানের কর্মব্যস্ত জীবনে নতুন শব্দবন্ধ ‘মুরি শিনাই দে’ (Muri Shinai De)। আসলে জীবনের প্রতিটি ধাপে এগোতে গেলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লক্ষ্যের পিছনে ছোটাছুটি, অফিসের ডেডলাইন, টার্গেট, বসের চাহিদা, সহকর্মীদের সঙ্গে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে এই কর্মদিবস যেন এক অন্তহীন রেস। কিন্তু এত দৌড়ঝাঁপের পরেও কি সত্যিই আমরা সুখী? নাকি প্রতিদিনের ক্লান্তির পাহাড় আমাদের ভেঙে দিচ্ছে অজান্তেই? জাপানের (Japan) কঠোর পরিশ্রমের সংস্কৃতি বিশ্বখ্যাত। ‘করোশি’ (Karoshi) শব্দটি এই দেশেরই উদ্ভাবন, যার অর্থ অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যুর ঘটনা। একসময় যে দেশ ‘ওভারটাইম’-কে সাফল্যের শর্ত মনে করত, সেখানে এখন শোনা যাচ্ছে এক নতুন শব্দবন্ধ, ‘মুরি শিনাই দে’ (Muri Shinai De)।

এই জাপানি কথার অর্থ, ‘অতিরিক্ত চেষ্টা করো না’ বা ‘নিজেকে শেষ করে দিও না’। জাপানের (Japan) বহু কর্পোরেট অফিসে এখন এই মন্ত্রই লেখা থাকে দেওয়ালে, ছাপা থাকে অফিস নোটে। কারণ, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে শুধু পরিশ্রম নয়, দরকার শরীর ও মনের স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মুরি শিনাই দে’ (Muri Shinai De) এক ধরনের জীবনদর্শন। যখন কোনও সহকর্মী লাগাতার কাজ করে চলেছেন, বিশ্রাম নিচ্ছেন না, তখন তাকে বলা হয়, ‘মুরি শিনাই দে’ অর্থাৎ আর নয়, একটু থামো, বিশ্রাম নাও। এখানে ‘মুরি’ (Muri) শব্দের অর্থ ‘অতিরিক্ত’, যা শরীরের উপর অস্বাভাবিক চাপ ফেলে। এই চাপই ধীরে ধীরে জন্ম দেয় মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, শুধু তাই নয়, শারীরিক অসুস্থতাও।
কেন এই ধারণার জন্ম? করোনার পর পৃথিবীজুড়েই বদলেছে কর্মসংস্কৃতি। কিন্তু জাপানে (Japan) পরিবর্তনের হাওয়া শুরু হয়েছিল তারও আগে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক সরকারি রিপোর্টে দেখা যায়, অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে প্রতি বছর শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই উদ্বেগজনক তথ্যই প্রশাসন ও কর্পোরেট দুনিয়াকে ভাবতে বাধ্য করে। তখনই ‘মুরি শিনাই দে’-এর (Muri Shinai De) মতো ধারণা জনপ্রিয় হতে থাকে। জাপানের (Japan) শ্রমমন্ত্রক কর্মীদের ওভারটাইম কমানোর জন্য নতুন আইনও আনে।
কীভাবে এই মন্ত্র আপনার জীবনেও কাজ করবে?
➤নিজের সীমা বোঝা: কাজের চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না। যখন শরীর বলছে থামো, তখন থামুন। না থেমে কাজ চালিয়ে যাওয়ার মানে নিজের ক্ষতি করা।
➤বাস্তবসম্মত লক্ষ্য স্থির করুন: প্রতিদিন অযৌক্তিক ‘টু-ডু লিস্ট’ না লিখে, সীমিত কিন্তু জরুরি কাজের তালিকা করুন।
➤বিরতি নিন: একটানা চার-পাঁচ ঘণ্টা কাজ নয়। প্রতি ঘণ্টায় ৫-১০ মিনিটের ছোট বিরতি নিন। জল খান, চোখ বন্ধ করুন, টানা স্ক্রিন দেখা থেকে বিরতি দিন।
➤নিজের আনন্দ খুঁজুন: অফিস শেষে এক কাপ চা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা, পছন্দের গান, বা ছোট কোনও শখ, এগুলোই আপনাকে পরের দিনের কাজের শক্তি জোগাবে।
➤ ‘না’ বলা শিখুন: সব দায়িত্ব একাই টেনে নেওয়ার মানে দায়িত্বশীলতা নয়, কখনও কখনও তা নির্বুদ্ধিতা হয়ে দাঁড়ায়। নিজের সীমানা আঁকুন, প্রয়োজনে সহকর্মীদের সাহায্য নিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে বার্নআউটের (Burnout) বড় কারণ একটানা কাজ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব। ‘মুরি শিনাই দে’ (Muri Shinai De) শুধুমাত্র একটি শব্দ নয়, বরং একটি সুস্থ জীবনদর্শনের প্রকাশ। জাপানি সংস্কৃতিতে ‘ইকিগাই’ (Ikigai)-এর মতোই এটি মানুষের জীবনে অর্থ ও আনন্দের ভারসাম্য তৈরি করে।অন্যদিকে বর্তমানে জাপানের (Japan) বহু সংস্থা কর্মীদের সপ্তাহে চার দিন কাজের সুযোগ দিচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আমরা নিজেদের প্রতিদিন নিঙড়ে দিই, তাহলে একসময় শরীর-মন দুই-ই হারিয়ে ফেলবে তার প্রাকৃতিক ক্ষমতা। তাই সাফল্যের পাশাপাশি সুস্থ থাকা জরুরি। এই মন্ত্রই দিচ্ছে ‘মুরি শিনাই দে’। কাজের চাপের পাহাড়ে দিনরাত লড়াই করা মানুষগুলির জন্য এই জাপানি বাণী এক আশার আলো। মনে রাখুন, দৌড় প্রতিদিনের জন্য নয়, কখনও কখনও হাঁটার মধ্যেই থাকে জীবনের সত্যিকারের আনন্দ।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Beauty Tips | রাতের ঘুমে সৌন্দর্যের চাবিকাঠি, মুখে ঘি লাগানোর সাত দিনের ম্যাজিক!




