সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন তৈরি মনুষ্যবাহিত ট্যাংক বিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল, সংক্ষেপে এমপিএটিজিএম (Man-Portable Anti-Tank Guided Missile — MPATGM) -এর পরীক্ষানিরীক্ষার পর সেনাবাহিনী এই প্রযুক্তিকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া সমস্ত পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সন্তোষজনক হওয়ায় আগামী বছর থেকেই ভারতের ভিন্ন ইউনিটে এটি হস্তান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে DRDO এই ক্ষেপণাস্ত্রটির উন্নয়ন ও মাঠে চেকিং চালাচ্ছিল। প্রতিরক্ষা রিসার্চ সংস্থার এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “প্রাথমিক স্তর থেকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত ফাংশনাল এবং পরিবেশগত পরীক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করেছে।” উল্লেখ্য, এমপিএটিজিএম হচ্ছে একটি ‘শোল্ডার-ফায়ারড’ টাইপ সিস্টেম, একজন প্রশিক্ষিত দক্ষ সৈনিক কাঁধে লঞ্চার রেখে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবেন। পুরো ইউনিটটি বহনের জন্য ট্রাইপড ও কমান্ড লঞ্চ ইউনিট (Command Launch Unit – CLU)-সহ দুইজন সেনাসদস্যের প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ক্ষেপণাস্ত্রটিকে কেবল শক্তিশালী বলেই দেখা যাবে না -এর ডিজাইনে রাখা হয়েছে আধুনিক ইনফ্রারেড ভিশন এবং গাইডেন্স প্রযুক্তি যাতে লক্ষ্যবস্তু দ্রুত শনাক্ত ও অনুসরণ করা যায়।
প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও সময়টা সংবেদনশীল। সম্প্রতি সরকার জরুরি ক্রয়ের মাধ্যমে আমেরিকা থেকে জ্যাভলিন (Javelin) ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ১২টি লঞ্চার ও ১০৪টি ক্ষেপণাস্ত্র। সরকারি সূত্র জানায়, তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে জ্যাভলিন কেনা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরে যদি দেশীয় উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে DRDO -এর এমপিএটিজিএম ধাপে ধাপে জ্যাভলিনের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। প্রশিক্ষিত একজন সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “জ্যাভলিনের মতোই এমপিএটিজিএমও ‘ফায়ার-এন্ড-ফরগেট’ প্রযুক্তি সমর্থন করবে; অর্থাৎ আঘাতকালে অপারেটর জায়গা বদলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর সৈন্যদের জীবন ঝুঁকি অনেক কমে আসে।” সরকারের এক আধিকারিক বলেন, “সামরিক কৌশলগতভাবে ‘ফায়ার-এন্ড-ফরগেট’ ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি -এটা সামরিক অপারেশনকে দ্রুত ও নমনীয় করে তোলে।”
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এমপিএটিজিএম -এর ওজন প্রায় ৩০ কিলো; পাল্লা প্রায় ২০০ মিটার থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত। তুলনামূলকভাবে আমেরিকান জ্যাভলিনের পাঠক্কতা আড়াই কিলোমিটারের সামান্য বেশি হলেও, দেশের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লে খরচ ও জোগান-শৃঙ্খলা উভয় ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার সুফল মিলবে, বিশেষ করে সংকটকালীন সময়ের প্রয়োজন মেটাতে।বর্তমানেই ভারতীয় সেনার হাতে ইতিমধ্যে রয়েছে সাবেক সোভিয়েত যুগের ‘কনকার’ (Konkurs) ও ফরাসি উৎসের ‘মিলান’ (Milan) জাতীয় দ্বিতীয় প্রজন্মের ট্যাংকবিধ্বংসী গাইডেড সিস্টেম; তবে সেসব অনেক ক্ষেত্রেই অপারেটরের কন্ট্রোল ও ‘ভিজ্যুয়াল-লক’ রাখা থাকায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না হওয়া পর্যন্ত অপারেটরকে জায়গা না ছাড়তে হত, যা আধুনিক পারিচলনায় ঝুঁকিপূর্ণ। এমপিএটিজিএম-এর ‘ফায়ার-অ্যান্ড-ফরগেট’ প্রযুক্তি ঠিক এই সীমাবদ্ধতাকে দূর করে, বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশের এই স্বদেশী উদ্যোগ নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, “মেক-ইন-ইন্ডিয়ার অন্যতম বাস্তবিক ফল হলো যে আমরা কেবল বিদেশের অস্ত্র ক্রয় করে সীমাবদ্ধই থাকব না, নিজেদের প্রযুক্তি তৈরি করে দক্ষতা অর্জন করতে পারব। এমপিএটিজিএম ঠিক সেই পথের একটি বড় মাইলফলক।” সরকারি সূত্র আরও জানিয়েছে, বিদ্যমান পরীক্ষার রিপোর্ট ও সামরিক নির্বাচনের ভিত্তিতে দ্রুত প্রোডাকশন ও স্ট্রাইকিং ইউনিটে হস্তান্তরের পরিকল্পনা চলছে। উৎপাদন শুরু হলেই জ্যাভলিন-নির্ভরতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার সমাধান দেশের সঙ্গে সামরিক জোগান-শৃঙ্খলাও মজবুত হবে।
এদিকে সামরিক কাস্টমাইজেশন ও মিশন-নির্ভর উপযোগিতা নিশ্চিত করতে DRDO আরও কিছু ফাংশনাল আপডেট ও ফাইন-টিউনিং করতে পারে, যা জেনারেল-অপারেশনাল প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর করে তুলবে। সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, আগামী বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ইউনিট-হাতে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে গেলে তা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও ডিফেন্স-ল্যাথালিটি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এমপিএটিজিএম-এর পরীক্ষায় সফলতা কেবল সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না, তা প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার প্রতিও বড় প্রভাব ফেলবে- এই বিশ্বাসেই সরকারের ও প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোবল উৎসাহী।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India own space station | PM Narendra Modi : ভারত তৈরি করবে নিজস্ব স্পেস স্টেশন, ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




