সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : তিয়ানজিনে (Tianjin) অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে মুখোমুখি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার (Galwan Valley) সংঘর্ষের পর এই প্রথমবার দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব একসঙ্গে বৈঠকে বসলেন। বৈঠকে দুই নেতা জোর দিয়ে বলেন, ভারত ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তা অংশীদার। বিশ্ব রাজনীতির অস্থির প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিকভাবে বড় বার্তা পাঠিয়েছে। চীন ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বৈঠকের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। চীনা গণমাধ্যমে বৈঠককে সামনে রেখে উষ্ণ বার্তা দেওয়া হলেও, মার্কিন সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে সতর্ক সুরে ঘটনাটিকে মূল্যায়ন করেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র চায়না ডেইলি (China Daily) শিরোনামে প্রকাশ করে : “Partnership seen as key to Sino-Indian relations”। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, মোদী ও শি উভয়েই একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং অংশীদার হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট শি তাঁর বৃহত্তর বার্তায় SCO-র মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেছেন, “Staying True to SCO Founding Mission And Ushering in a Better Future”। তাঁর বক্তব্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের মানসিকতা পরিহারের বার্তাও জোর দিয়ে উঠে এসেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস (Global Times) বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিয়ান ফেং (Qian Feng), ত্সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (Tsinghua University) ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক, মন্তব্য করেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে নিতে হলে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, সীমান্ত প্রশ্নের যথাযথ সমাধান এবং সহযোগিতা পুনরুদ্ধার।” তাঁর মতে, সীমান্ত প্রশ্নে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন, যাতে বাইরের শক্তিগুলি বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ না পায়।শি-মোদী বৈঠককে “fruitful” আখ্যা দিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য কাই চি (Cai Qi) বলেন, “এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন ঐকমত্য গড়ে উঠেছে।”

অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। সিএনএন (CNN) প্রতিবেদনে লিখেছে, “Xi and Modi talk friendship in a ‘chaotic’ world as Trump’s tariffs bite”। সেখানে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনে এই ইতিবাচক বার্তা নজরে রাখা হবে, কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন আমেরিকার দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সিএনএন বিশ্লেষণ করেছে, শি নিজেকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে “stabiliser” হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “bullying” প্রবণতার বিপরীতে রাখা হয়েছে। টাইম (Time) তাদের প্রতিবেদনে শিরোনাম দেয়, “China’s Xi Hosts Modi and Putin for Summit Amid Anger Over Trump’s Tariffs”। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোদির চীনের দিকে ঝুঁকিকে ওয়াশিংটন কৌশলগত ধাক্কা হিসেবেই দেখবে। তবে এই সম্মেলনের আসল উদ্দেশ্য চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা ও পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করা।
ওয়াশিংটন পোস্ট (The Washington Post) তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, “China tries to use Trump turmoil to unite leaders against U.S.-led order”। তারা বিশ্লেষণ করে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে শি কাজে লাগাচ্ছেন ও SCO-কে একটি স্থিতিশীল জোট হিসেবে তুলে ধরছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (The Wall Street Journal) সরাসরি বলেছে, “Chinese, Russian, Indian Leaders Pledge Cooperation, in a Message to Trump।” অর্থাৎ ত্রিদেশীয় দৃশ্যমান ঐক্য ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে একটি রাজনৈতিক সঙ্কেত।আবার, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (Associated Press) রিপোর্টে বলা হয়েছে, “SCO summit could challenge US dominance and lend weight to China’s vision of a multipolar world”। তারা উল্লেখ করেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত রাশিয়ার তেলের অন্যতম ক্রেতা হয়ে উঠেছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করছে। তবে ভারতের SCO অন্তর্ভুক্তি রাশিয়া ও চীনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times) মোদীর চীন সফরকে ওয়াশিংটনের প্রতি “fraying patience”-এর প্রতিফলন বলে বর্ণনা করেছে। অপরদিকে দ্য ইকোনমিস্ট (The Economist) ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করে বলেছে, এটি একটি “pointless rupture” যা শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বকেই পরিবর্তন করবে।
সূত্রের খবর, রবিবারের বৈঠকে মোদী ও শি জিনপিং সীমান্ত বিবাদ নিয়ে মতবিনিময় করেন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেন। সোমবার শি ঘোষণা করেন, চীন দ্রুত উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করবে ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবে। তাঁর এই ঘোষণা অনেকের মতে মার্কিন প্রভাবের বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির প্রচেষ্টা। বছরের পর বছর SCO-কে মার্কিন প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেখা হয়েছে। এখন ভারত, চীন ও রাশিয়ার ঐক্যবদ্ধ বার্তা নতুন করে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Japan Visit | মোদীর জাপান সফর: কৌশলগত অংশীদারি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত




