সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : দেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম অভিযুক্ত পলাতক হিরে ব্যবসায়ী মেহুল চোকসী (Mehul Choksi)-এর সম্পত্তি এবার আদালতের নির্দেশে নিলামে উঠছে। মুম্বইয়ের (Mumbai) এক বিশেষ আদালত সম্প্রতি রায় দিয়েছে, চোকসী ও তাঁর সংস্থার সঙ্গে যুক্ত মোট ৪৬ কোটি টাকার সম্পদ সরকার নিলামে তুলতে পারবে। এই সম্পত্তিগুলির মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক ভবন, রুপোর বাট (Silver Bars), মূল্যবান রত্ন (Precious Gems) এবং হিরে ব্যবসার যন্ত্রপাতি।বিশেষ আদালতের বিচারক এভি গুজরাতি (A.V. Gujarati) তাঁর রায়ে জানান, “প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া মেনে কর্তৃপক্ষ এই সম্পত্তিগুলি নিলামে তুলতে পারেন। নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী স্থায়ী আমানতে রাখা হবে।” আদালতের এই নির্দেশে এক প্রকার সবুজ সংকেত মিলেছে ইডি (Enforcement Directorate) ও সিবিআইয়ের (CBI) কাছে, যারা দীর্ঘদিন ধরেই চোকসীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিচ্ছিল।
এই সম্পদগুলির সঙ্গে জড়িত সংস্থা ‘গীতাঞ্জলি জেম্স লিমিটেড’ (Gitanjali Gems Limited), যা মেহুল চোকসী ও তাঁর ভাইপো নীরব মোদী (Nirav Modi) -এর যৌথ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। দুজনেই বর্তমানে পলাতক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (Punjab National Bank) থেকে প্রায় ₹১৩,৫০০ কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের খবর, আদালতের অনুমতি পাওয়া নিলামের তালিকায় মোট ১৩টি সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুম্বইয়ের বোরিভলি (Borivali) এলাকার চারটি ফ্ল্যাট, প্রতিটিরই বাজারমূল্য প্রায় ২.৫৫ কোটি। এছাড়া বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্সে (Bandra Kurla Complex) অবস্থিত ‘ভারত ডায়মন্ড বোর্স’ (Bharat Diamond Bourse)-এর অন্তর্গত একটি বাণিজ্যিক ভবনও এই তালিকায় রয়েছে। যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হিরে বাজার হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া গোরেগাঁও (Goregaon) অঞ্চলের কিছু সম্পত্তি এবং জয়পুরে (Jaipur) অবস্থিত ‘গীতাঞ্জলি জেম্স’-এর কারখানা থেকে বাজেয়াপ্ত রুপোর বাট, রত্ন এবং উৎপাদন যন্ত্রপাতিও এই নিলামের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আদালতের নির্দেশে এই সম্পত্তিগুলি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি অ্যাকাউন্টে স্থায়ী আমানত হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক কেলেঙ্কারি : পলাতক চোকসী
২০১৮ সালে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (PNB) সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রতারণা মামলায় নীরব মোদী ও মেহুল চোকসী মূল অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভুয়ো লেটার অফ আন্ডারটেকিং (LoU) -এর মাধ্যমে বিদেশি ব্যাঙ্ক থেকে বিশাল পরিমাণ ঋণ তোলা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ফেরত দেওয়া হয়নি। কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার কিছুদিনের মধ্যেই চোকসী দেশ ছেড়ে পালান। চোকসী ও তাঁর স্ত্রী প্রথমে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় (Antigua and Barbuda) নাগরিকত্ব নেন। পরে বেলজিয়ামে (Belgium) তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ভারত সরকারের অনুরোধে তাঁর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং সম্প্রতি বেলজিয়ামের আদালত জানিয়েছে, মেহুল চোকসীর ভারত প্রত্যর্পণে আর কোনও আইনগত বাধা নেই। অর্থাৎ, এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ার উপর।
সূত্রের খবর, ইডি ও সিবিআই-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের এই অনুমতি চোকসী-সংক্রান্ত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইডির এক আধিকারিক বলেন, “চোকসী ও নীরব মোদীর অর্থনৈতিক লেনদেনের জাল এতটাই জটিল যে, বহু সংস্থা ও সম্পত্তি এখন তদন্তের আওতায়। আদালতের এই নির্দেশ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।” প্রসঙ্গত, ইডি ইতিমধ্যেই ‘গীতাঞ্জলি গ্রুপ’-এর (Gitanjali Group) বেশ কিছু সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মুম্বই, জয়পুর, হায়দরাবাদ, দিল্লি এবং সুরাতের (Surat) সম্পত্তি। এই সম্পত্তিগুলির বাজারমূল্য কয়েকশো কোটি টাকা। কূটনৈতিকদের মতে, চোকসীর সম্পত্তি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলির ক্ষতিপূরণে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এই নিলামের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে অনুমান।আর্থিক বিশেষজ্ঞ অনিরুদ্ধ সেন (Aniruddha Sen) বলেন, “এই ধরনের মামলায় নিলামের অনুমতি পাওয়া মানে অভিযুক্তের সম্পদ পুনরুদ্ধারের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে প্রকৃত অর্থ ফেরত পেতে সরকারকে এখনও দীর্ঘ আইনি পথ অতিক্রম করতে হবে।”
এই ঘটনার পর অর্থ মন্ত্রকও (Ministry of Finance) জানিয়েছে, বড় আর্থিক প্রতারণার মামলাগুলিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম কার্যক্রম আরও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে, যাতে জনগণের অর্থ সুরক্ষিত থাকে এবং অভিযুক্তরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পান। যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড়, মেহুল চোকসীকে আদৌ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না। তবে আদালতের এই নিলাম অনুমতি সরকারের হাতে একটি বড় হাতিয়ার, যা ভবিষ্যতে ব্যাংক প্রতারণার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mobile Recharge Cost in India | মোবাইল রিচার্জের বাড়তি চাপ: সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার, জরুরি পদক্ষেপের দাবি




