সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নিউ ইয়র্ক : নাসা (NASA)-এর বিখ্যাত মহাকাশচারী মেগান ম্যাকআর্থার (Megan McArthur) অবসর নিয়েছেন। প্রায় ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি দুইটি মহাকাশ অভিযানে অংশ নেন, মোট ২১৩ দিন মহাকাশে কাটান এবং নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে (Johnson Space Center, Houston) একাধিক নেতৃত্বের পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই অবসরের মাধ্যমে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।২০০৯ সালে মেগান ম্যাকআর্থার প্রথমবার মহাকাশযাত্রায় যান। স্পেস শাটল আটলান্টিসের (Atlantis) STS-125 মিশনে তিনি ছিলেন, যা ছিল হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope)-এর শেষ সার্ভিসিং মিশন। সেই অভিযানে ম্যাকআর্থার স্পেস শাটলের রোবোটিক বাহু ব্যবহার করে হাবলকে ধরেছিলেন, যাতে তাঁর সহকর্মীরা টেলিস্কোপে পাঁচটি স্পেসওয়াকের মাধ্যমে মেরামতি ও উন্নতকরণ করতে পারেন। ওই সময় হাবল প্রায় দুই দশক পুরোনো হয়ে যাচ্ছিল। আজও সেটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সক্রিয় রয়েছে, যার কৃতিত্বের একটি বড় অংশ মেগানের কাজের ফল। নাসার ভাষায়, তিনি ছিলেন হাবলের সঙ্গে শারীরিকভাবে যুক্ত হওয়া শেষ মহাকাশচারী।

কিন্তু, শুধু হাবলের সঙ্গেই নয়, মহাকাশ অভিযানে বাণিজ্যিক স্পেসক্রাফট যুগেও মেগান নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছেন। ২০২১ সালে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রথম নারী হিসেবে স্পেসএক্স ড্রাগন (SpaceX Crew Dragon)-এর পাইলট হন। ক্রু-২ (Crew-2) মিশনে অংশ নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) ছয় মাস কাজ করেন। সেখানেই তিনি এক্সপেডিশন ৬৫/৬৬ (Expeditions 65/66)-এর ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় গবেষণা, রোবোটিক্স ও উপাদান বিজ্ঞান সম্পর্কিত একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মেগান ম্যাকআর্থারের জন্ম হাওয়াইয়ের হনলুলুতে (Honolulu, Hawaii)। ছোটবেলায় নৌবাহিনীর সন্তান হিসেবে তাঁকে দেশজুড়ে নানা স্থানে ঘুরতে হয়েছে। তিনি ইউসিএলএ (UCLA) থেকে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগো (UC San Diego)-র স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন থেকে ওশানোগ্রাফিতে পিএইচডি অর্জন করেন। ২০০০ সালে নাসার মহাকাশচারী দলে যোগ দেন তিনি। তিনি বিয়ে করেন নাসার আরেক মহাকাশচারী বব বেনকেনের (Bob Behnken) সঙ্গে। বেনকেন ছিলেন স্পেসএক্সের প্রথম মানববাহী ফ্লাইট ডেমো-২ (Demo-2)-এর পাইলট, সেটি ২০২০ সালে সফলভাবে সম্পন্ন হয়। তার পরবর্তী বছরেই, অর্থাৎ ২০২১ সালে, একই স্পেসক্রাফটে মেগান নিজের ইতিহাস লেখেন।

মহাকাশ অভিযানের বাইরেও ম্যাকআর্থার নাসার নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি জনসন স্পেস সেন্টারের ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ফ্লাইট অপারেশনের সহকারী পরিচালক হন। ২০১৯ সালে তিনি অ্যাস্ট্রোনট অফিসের ডেপুটি ডিভিশন চিফ পদে উন্নীত হন। সেখানে তিনি ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে যুক্ত ছিলেন। তিন ২০২২ সালে তিনি যোগ দেন স্পেস সেন্টার হিউস্টনের (Space Center Houston) চিফ সায়েন্স অফিসার হিসেবে। এই ভূমিকায় তিনি শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলিকে মহাকাশবিজ্ঞান ও এসটিইএম (STEM) বিষয়ে অনুপ্রাণিত করতে কাজ করছেন। নাসা ছাড়ার পরেও তিনি এই দায়িত্বে বহাল থাকবেন বলে উল্লেখ।

নিজের অবসর সম্পর্কে এক আবেগঘন বক্তব্যে মেগান বলেন, “নাসার মহাকাশচারী হিসেবে কাজ করা ছিল এক অসাধারণ সৌভাগ্য। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে আমরা যে গবেষণা করেছি, তা পৃথিবীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতের চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের পথ প্রশস্ত করছে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের এই গ্রহ কতটা ভঙ্গুর ও মূল্যবান। তাই আমাদের সবার দায়িত্ব এটি রক্ষা করা। আমি কৃতজ্ঞ যে এই মিশনের অংশ হতে পেরেছি, আর আগামিদিনে নাসার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা যেভাবে নতুন চ্যালেঞ্জ জয় করবেন, তা আমি গর্ব নিয়ে প্রত্যক্ষ করব।” অন্যদিকে, নাসার কার্যনির্বাহী পরিচালক স্টিভ কোয়েরনার (Steve Koerner) বলেন, “ম্যাকআর্থারের অবদান মানব মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আমরা তাঁর সেবার জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মেগান ম্যাকআর্থারের জীবন ও কর্মজীবন প্রমাণ করে দিয়েছেন, মহাকাশ শুধু পুরুষদের জগৎ নয়, নারীরাও সেখানে সমান দক্ষতায় ইতিহাস রচনা করতে পারেন। তাঁর পথচলা আগামী প্রজন্মের মহাকাশচারীদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : SpaceX Dragon spacecraft raises ISS orbit | ইলন মাস্কের ড্রাগন মহাকাশযানের ঐতিহাসিক সাফল্য, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পেল নতুন কক্ষপথ




