KhagenMurmu, খগেন মুর্মু, নাগরাকাটা হামলায় হাই কোর্টে কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবি, ১৪ অক্টোবর শুনানি

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৯ অক্টোবর ২০২৫: উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা (Nagrakata) কাণ্ডে ফের চড়ল রাজ্য রাজনীতির পারদ। বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু (Khagen Murmu)-এর উপর হামলার ঘটনায় এবার কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবিতে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার আদালতে অ্যাডভোকেট অনিন্দ্য সুন্দর দাস (Advocate Anindya Sundar Das) একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করেন, অন্যদিকে বিজেপি নেতা বিজন গোস্বামী (Bijon Goswami) জমা দেন পৃথক একটি রিট পিটিশন। উভয় ক্ষেত্রেই দাবি, তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হোক জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (CBI) -এর হাতে।

প্রসঙ্গত, ৬ অক্টোবর নাগরাকাটায় ত্রাণ বিতরণের সময় বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু ও শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) -এর কনভয়ের উপর একদল দুষ্কৃতী হামলা চালায় বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, পাথর, লাঠি ও জুতো ছোঁড়া হয় তাঁদের গাড়ির দিকে। খগেন মুর্মু গুরুতর জখম হন, মুখ ও চোখে গুরুতর চোট লাগে। প্রথমে তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে স্থানান্তরিত করা হয় জলপাইগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, তিনি এখনও আইসিইউতে (ICU) চিকিৎসাধীন আছেন। এই ঘটনার পরই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়। বিজেপির অভিযোগ, এই হামলার নেপথ্যে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর স্থানীয় নেতৃত্ব রয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূল জানিয়েছে, ‘ঘটনাটি রাজনৈতিক নয়, স্থানীয়দের ভুল বোঝাবুঝির ফল।’

নাগরাকাটায় খগেন মুর্মুর উপর হামলার ঘটনায় কলকাতা হাই কোর্টে কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবি। অ্যাডভোকেট অনিন্দ্য সুন্দর দাস ও বিজেপি নেতা বিজন গোস্বামীর পৃথক মামলা। আদালত ১৪ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেছে।
খগেন মুর্মু। ছবি : সংগৃহীত

আদালতে কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবি

অ্যাডভোকেট অনিন্দ্য সুন্দর দাস আদালতে যুক্তি দেন, ‘নাগরাকাটা একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল, ফলে অনুপ্রবেশকারীদের ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই হামলার পেছনে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘খগেন মুর্মু যেহেতু তফসিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ভুক্ত, তাই তদন্তে এসসি-এসটি (SC/ST) আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা যুক্ত করা উচিত। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এটি এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন।’ অন্যদিকে, বিজেপি নেতা বিজন গোস্বামী আদালতে দায়ের করা রিটে অভিযোগ করেন, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। তাঁর পক্ষে আইনজীবী ময়ুখ মুখার্জি (Mayukh Mukherjee) আদালতে বলেন, ‘ঘটনার পর এতদিনেও দোষীদের চিহ্নিত করা হয়নি। পুলিশের ভূমিকা সন্দেহজনক। সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করে তদন্তের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দিতে হবে।’

আরও পড়ুন : Modi X handle, মোদী এক্সে বললেন: ‘ friendship on move; Digital Empowerment, not Aid’

আদালতের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ

অবকাশকালীন বেঞ্চের বিচারপতি কৌশিক চন্দ (Justice Kaushik Chanda) ও বিচারপতি ঋতব্রত মিত্র (Justice Ritabrata Mitra) মামলাটি গ্রহণ করেছেন এবং শুনানির জন্য আগামী ১৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন। আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর নির্দেশ দিয়েছে, রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ঘটনাটির বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এক সিনিয়র আইনজীবীর ভাষায়, ‘হাই কোর্টের এই পদক্ষেপ রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার উপর বড়সড় নজরদারি তৈরি করবে। কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্তে নামলে অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আসতে পারে।’

ঘটনার পর থেকেই বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব সরব হয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘রাজ্যে বিরোধী দলের সাংসদ, বিধায়কদের উপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। নাগরাকাটার ঘটনাটি তারই চরম উদাহরণ। রাজ্যে আইনের শাসন কার্যত লুপ্ত।’ অন্যদিকে, তৃণমূল মুখপাত্র কুনাল ঘোষ (Kunal Ghosh) প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এটা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়। বিজেপি প্রতিবারই নিজেদের প্রচারের জন্য আদালতকে টেনে আনছে। আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে।’ 

আরও পড়ুন : Modi Trump call, Gaza peace plan, Modi X post | মোদী টুইটে বললেন: ‘Gaza peace plan সাফল্য, ট্রেড আলোচনায় অগ্রগতি’ 

নাগরাকাটার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নাগরাকাটা উত্তরবঙ্গের একটি সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী অঞ্চল, যার একপাশে ভুটান সীমান্ত। তাই এখানকার প্রশাসনিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ। স্থানীয় রাজনীতিতেও তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষক অভিজিৎ রায় বলেন, ‘এই হামলার ঘটনা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, বরং সীমান্ত রাজনীতির অস্থিরতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত। আদালত যদি কেন্দ্রীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়, তবে এটি রাজ্য রাজনীতির বড় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।’

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হামলার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলেও জানা গিয়েছে। তবে তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থা যুক্ত হলে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রশাসনের একাংশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ অফিসার বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছি। আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবে, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা

আইনজীবী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, আদালত যদি সত্যিই এনআইএ বা সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়, তবে এটি রাজ্য প্রশাসনের উপর একপ্রকার ‘অবিশ্বাসের ইঙ্গিত’ হিসেবেই দেখা হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্য যদি নিজে থেকে তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারে, তবে কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রয়োজন নাও হতে পারে। আইন বিশ্লেষক অর্পণ মুখার্জি বলেন, ‘এনআইএ তদন্ত মানে রাজ্যের বাইরে একটি স্বাধীন সংস্থার নজরদারি। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, তা থেকে সত্য উদঘাটনের সম্ভাবনাই বেশি।’ 

আগামী ১৪ অক্টোবরের শুনানিই এখন মুখ্য

রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের এখন নজর ১৪ অক্টোবরের শুনানির দিকে, যেখানে আদালত স্পষ্ট করবে, তদন্তের ভার কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে যাবে কি না। বিজেপির দাবি, কেন্দ্রীয় তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার সঠিক চিত্র প্রকাশ্যে আসবে না। অন্যদিকে, রাজ্য সরকার জানিয়েছে, তারা আদালতের নির্দেশ মেনে চলবে। সুত্রের খবর, নাগরাকাটা হামলার ঘটনায় আহত সাংসদ খগেন মুর্মুর শারীরিক অবস্থা এখনও স্থিতিশীল নয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ‘চোখের আঘাতের জন্য তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ক’য়েকদিন পর্যবেক্ষণের পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, কবে তাঁকে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।’ উল্লেখ্য, এই ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাত ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ছড়াতে শুরু করেছে। আদালতের পরবর্তী রায় রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে কী পরিবর্তন আনে, এখন সেই দিকেই তাকিয়ে রাজ্যবাসী।

ছবি : সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : Khagen Murmu attack | নাগরাকাটা হামলায় নতুন মোড়: খগেন মুর্মু–শঙ্কর ঘোষ কাণ্ডে আরও দুই গ্রেফতার

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন