Kalp Kedar Temple news | হারিয়ে গেল রহস্যময় ‘কল্প কেদার’! উত্তরকাশীর হড়পা বানে ইতিহাসের পাতায় ঢেকে গেল ৮০ বছরের পুরনো মন্দির

SHARE:

এই মন্দির প্রথম খোঁজ মেলে ১৯ শতকের গোড়ায়। ১৮১৬ সালে ইংরেজ পর্যটক ও লেখক জেমস উইলিয়াম ফ্রেজার (James William Fraser) গঙ্গা ও ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে বেরিয়ে ধরালী গ্রামে আসেন। তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ ছিল, এই গ্রামে একটি প্রাচীন মন্দিরে তিনি রাত কাটিয়েছিলেন। এরপর ১৮৬৯ সালে পর্যটক ও আলোকচিত্রী স্যামুয়েল ব্রাউন (Samuel Bourne) গোটা হর্ষিল ও গঙ্গোত্রীর পথে যাত্রা করে ধরালী গ্রামে তিনটি মন্দিরের ছবি তোলেন, যার মধ্যে একটি ছিল এই কল্প কেদার মন্দির।

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দেহরাদুন : উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলায় হঠাৎ হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গোটা ধরালী (Dharali) গ্রাম। ক্ষীরগঙ্গা নদীর ভয়াল স্রোতে ভেসে গিয়েছে বহু ঘরবাড়ি, প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫ জন, নিখোঁজের সংখ্যা ১০০-এরও বেশি। সেনাবাহিনী, আইটিবিপি (ITBP), এনডিআরএফ (NDRF), এসডিআরএফ (SDRF) মিলে চলছে জোরকদমে উদ্ধারকাজ। এই ভয়াবহ দুর্যোগে হারিয়ে গেল একটি ইতিহাস, হারিয়ে গেল এক রহস্যময় মন্দির, ‘কল্প কেদার’ (Kalp Kedarnath Temple)।

এই মন্দির ঘিরে রয়েছে একাধিক কিংবদন্তী, ইতিহাস, এ জনশ্রুতি। হর্ষিল এলাকার অধীনে থাকা ধরালী গ্রামের বহু প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, এই মন্দির কেদারনাথ (Kedarnath) মন্দিরের আদলে নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যের সাদৃশ্যের কারণেই স্থানীয়রা একে ‘কল্প কেদার’ নাম দেন। অনেকের বিশ্বাস, এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বয়ং পাণ্ডবেরা। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি আদিশঙ্করাচার্য (Adi Shankaracharya) নির্মিত একটি তীর্থস্থান।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই মন্দির প্রথম খোঁজ মেলে ১৯ শতকের গোড়ায়। ১৮১৬ সালে ইংরেজ পর্যটক ও লেখক জেমস উইলিয়াম ফ্রেজার (James William Fraser) গঙ্গা ও ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে বেরিয়ে ধরালী গ্রামে আসেন। তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ ছিল, এই গ্রামে একটি প্রাচীন মন্দিরে তিনি রাত কাটিয়েছিলেন। এরপর ১৮৬৯ সালে পর্যটক ও আলোকচিত্রী স্যামুয়েল ব্রাউন (Samuel Bourne) গোটা হর্ষিল ও গঙ্গোত্রীর পথে যাত্রা করে ধরালী গ্রামে তিনটি মন্দিরের ছবি তোলেন, যার মধ্যে একটি ছিল এই কল্প কেদার মন্দির। সেই ছবিগুলি আজও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের (ASI) নথিতে সুরক্ষিত রয়েছে। তবে এই মন্দিরকে ঘিরে রহস্যের শুরু ১৯৪৫ সাল থেকে। সে বছর ক্ষীরগঙ্গার জলপ্রবাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় মন্দিরের শিখর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তখনই স্থানীয়রা ক’য়েক ফুট মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেন একটি প্রাচীন শিবমন্দির। স্থাপত্য ও গর্ভগৃহের গঠন দেখে স্পষ্ট হয়, এটি কেদারনাথ মন্দিরের মতোই নন্দীর পিঠের মতো শিবলিঙ্গসহ একটি পূর্ণাঙ্গ গর্ভগৃহ। গর্ভগৃহটি মন্দিরের প্রবেশপথের থেকে কয়েক মিটার নিচে অবস্থান করায় তা পূর্ণাঙ্গভাবে কখনও আবিষ্কৃত হয়নি। বর্ষাকালে ক্ষীরগঙ্গার জল বেড়ে গেলে গর্ভগৃহ আবার জলের নিচে তলিয়ে যেত। বছরের অন্যান্য সময়ে কিছুটা অংশ দৃশ্যমান থাকত, তাতেই স্থানীয়রা পুজো করতেন। কিন্তু এবারকার এই ভয়াবহ হড়পা বান সব কিছু মুছে দিল। মন্দিরের যে অংশগুলি এতদিন দৃশ্যমান ছিল, সেগুলিও ধসে গিয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে।

এই মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার প্রতীক নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনও বটে। শিবলিঙ্গের গঠন, গর্ভগৃহের গভীরতা ও বহিরাংশের পাথরের খোদাইগুলি থেকে বোঝা যায়, এটি কমপক্ষে কয়েক শতাব্দী পুরনো। এই মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবেগ রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, কল্প কেদার এক অলৌকিক স্থান, যা সময়ের সাথে বারবার উদিত ও অবলুপ্ত হয়। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা গণেশ দত্ত ভট্ট (Ganesh Datt Bhatt) বলেন, “এই মন্দিরের ইতিহাস আর কাহিনি শুনে শুনে বড় হয়েছি। ১৯৪৫ সালে যখন শিখর দেখা গিয়েছিল, আমি তখন ছোট ছিলাম। বড়রা বলতেন, এটা পাণ্ডবদের স্থাপন করা মন্দির। এখন আবার সব হারিয়ে গেল।”

ধর্মীয় ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রাধিকা শর্মা (Radhika Sharma) জানান, “কল্প কেদার নিছক একটি প্রাচীন মন্দির নয়। এটি উত্তরাখণ্ডের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও পৌরাণিক অধ্যায়ের এক অমূল্য অংশ। আমাদের উচিত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে এই মন্দির ও আশপাশের নিদর্শনগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।” কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলের এই ভয়াবহ দুর্যোগ ও ধসের পর এই মন্দিরের অস্তিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। ক্ষীরগঙ্গার প্রবল স্রোত ও ভূমিধসের কারণে হয়তো আর কখনওই দেখা যাবে না এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে। হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে কল্প কেদার শুধুই হয়ে উঠবে একটি জনশ্রুতি, একটি গল্প, একটি হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস। কিন্তু উত্তরকাশীর মানুষ এখন শুধু প্রার্থনা করছেন, জীবনের ক্ষয় যেন আর না হয়, আর হারিয়ে না যায় তাঁদের আস্থা, তাঁদের ইতিহাস।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : IMD weather forecast West Bengal | কলকাতা সহ ছয় জেলায় ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস, উত্তরবঙ্গে বাড়ছে দুর্যোগের আশঙ্কা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন