সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্বের ব্যস্ততম রেল নেটওয়ার্কগুলোর কথা উঠলে জাপানের নাম সবার আগে আসে। সময়নিষ্ঠতা, প্রযুক্তি এবং যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে তারা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এই দেশেই একসময় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে, তিন বছর ধরে কেবল একজন যাত্রীর জন্য চালানো হয়েছিল একটি আস্ত ট্রেন!
এই গল্পটি জাপানের হোক্কাইডো (Hokkaido) দ্বীপের প্রত্যন্ত গ্রাম কিউ-শিরাটাকি (Kyu-Shirataki) স্টেশনকে ঘিরে। স্থানীয় মানুষ একে মজা করে বলতেন ‘মরা’ গ্রাম। কারণ, সেখানকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র চল্লিশ জনের মতো। ২০১৩ সালের দিকে যাত্রী কমে যাওয়ায় জাপান রেলওয়ে (Japan Railway) কর্তৃপক্ষ স্টেশনটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। লোকসানে চলা এই রুটটি আর চালু রাখার কোনও অর্থ ছিল না তাদের কাছে। কিন্তু সেখানেই ঘটে এক মানবিক অলৌকিকতা। গ্রামেরই এক তরুণী ছাত্রী কানা হারাদা (Kana Harada) তখন মাধ্যমিক স্কুলে পড়ত। প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল সেই ছোট্ট ট্রেনটি। স্টেশন বন্ধ হয়ে গেলে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে, এই ভেবে হারাদা আবেদন জানায় রেল কর্তৃপক্ষের কাছে। তার অনুরোধ ছিল সরল, কিন্তু গভীর, “আমার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।”

হারাদার সেই চিঠি পৌঁছায় রেল দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের হাতে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা সিদ্ধান্ত নেন রুটটি বন্ধ করা হবে না। হারাদার স্কুলের পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই ট্রেন প্রতিদিন চলবে! অর্থাৎ, একমাত্র এই ছাত্রীর শিক্ষার স্বার্থে একটি সম্পূর্ণ রেলরুট চালু রাখা হবে, যদিও যাত্রী সংখ্যা প্রায় শূন্য। এরপরের তিন বছর প্রতিদিন সকালে সেই ট্রেন থামত কিউ-শিরাটাকি স্টেশনে। হারাদা উঠত, হাসিমুখে জানালার ধারে বসত। ট্রেনটি নিয়ে যেত তাকে শহরের স্কুলে। বিকেলে একই ট্রেন আবার ফিরত, হারাদাকে নামিয়ে দিত নিজের ছোট্ট গ্রামে। প্রায় সব দিনেই সে ছিল একমাত্র যাত্রী। মাঝে মাঝে হয়ত এক-দু’জন স্থানীয় মানুষ উঠত, কিন্তু ট্রেনের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই, কানা হারাদার শিক্ষা। এই খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয় স্থানীয় এক সংবাদমাধ্যমে। তারপর তা ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিশ্বজুড়ে মানুষ অবাক হয়ে যায় জাপানের এই মানবিক পদক্ষেপে। অনেকে লিখেছিলেন, “এটাই সভ্যতার প্রকৃত মুখ, যেখানে প্রযুক্তি নয়, মানুষকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।” জাপানের রেল মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সেই সময় বলেছিলেন, ‘our decision was simple, education comes before economics. If one student wants to study, we cannot be the reason she stops.’ (আমাদের সিদ্ধান্ত সহজ ছিল, শিক্ষা সব সময় অর্থনীতির আগে। যদি একজন শিক্ষার্থীও পড়তে চায়, আমরা যেন তার পথে বাধা না হই।)
তবে অনেকের মতে, গল্পের কিছু অংশ অতিরঞ্জিত। কিছু প্রতিবেদন দাবি করে, কানা হারাদা একমাত্র যাত্রী ছিল না। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও নাকি নিয়মিত সেই ট্রেনে যাতায়াত করতেন। জাপান রেলওয়ের (Japan Railway) তরফে কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি যে ট্রেনটি কেবল হারাদার জন্যই চালানো হত। কিন্তু, এই ঘটনাটি মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কারণ, এটি নিছক রেলের ইতিহাস নয়, এটি এক ছাত্রীর শিক্ষা, এক প্রতিষ্ঠানের মানবিক দায়িত্ববোধ এবং এক সামাজিক মানসিকতার দৃষ্টান্ত।
২০১৬ সালের মার্চ মাসে কানা হারাদা তার স্কুলজীবন শেষ করে। কাকতালীয়ভাবে সেই একই মাসে কিউ-শিরাটাকি স্টেশনটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় জাপান রেলওয়ে। যেন রেলেরও একটা অধ্যায় শেষ হল হারাদার সঙ্গে সঙ্গে।একজন স্থানীয় বাসিন্দা ইচিরো তাকামুরা (Ichiro Takamura) সেই সময় বলেছিলেন, “স্টেশনটা বন্ধ হয়ে গেলেও, আমরা জানি, এর গল্প চিরকাল বেঁচে থাকবে। এই স্টেশন আমাদের শেখায়, একজন মানুষের জন্যও যদি কিছু করা যায়, সেটাই আসল উন্নতি।”
আরও পড়ুন : Hunza Valley | রহস্যময় হুনজা ভ্যালি: দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্য আর অদ্ভুত সুখের রাজ্য
বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও নীতিনিষ্ঠার আলোচনায় এই গল্প আজও উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে। রেলের মতো বিশাল ব্যবস্থাও যে মানবিক হতে পারে, তা প্রমাণ করেছে জাপান। সেখানে যান্ত্রিকতা ও সময়নিষ্ঠতার মধ্যেও মানুষকে কেন্দ্র করে নেয় তারা, এই কিউ-শিরাটাকি কাহিনি তারই প্রতিচ্ছবি।যখন আমরা আমাদের দেশে উৎসবের মরসুমে ভিড় ঠেলে ট্রেনে চড়ি, যেখানে ২৪ কোচের ট্রেনে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ যাত্রী, সেখানে জাপানের এই গল্প শোনালে বিস্মিত হতে হয়। একদিকে অতিরিক্ত ভিড়ে যাত্রী উঠতে পারেন না, অন্যদিকে মাত্র একজনের জন্য ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত এই বৈপরীত্যই যেন পৃথিবীর দুই প্রান্তের সামাজিক মনোভাবের তুলনা টেনে আনে। উল্লেখ্য যে, জাপানের গল্পটি শুধু রেল নয়, শিক্ষার মর্যাদা ও প্রশাসনিক সংবেদনশীলতারও প্রতীক। কিউ-শিরাটাকি হয়তো এখন ‘ঘুমন্ত’ স্টেশন, কিন্তু তার গল্প আজও মানুষকে শেখায়, মানবতা কখনও লোকসান নয়, সেটাই সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Muri Shinai De | মুরি শিনাই দে: কর্মব্যস্ত জীবনে জাপানি শান্তির মন্ত্র, কীভাবে বদলাবে আপনার দিন?




