কৌশিক রায় ✪ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : ১৯৫২ সালের কথা। বিশ্বজুড়ে তখন প্রথমবার আয়োজন হচ্ছে মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের লংবিচ শহরে উচ্ছ্বাসের মাঝে যখন একে-একে প্রতিযোগীরা মঞ্চে আসছেন, তখন ভারত থেকে একজন নারী উঠে এলেন যিনি সৌন্দর্যকে সংজ্ঞায়িত করলেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তাঁর নাম ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman)। শুধু সুন্দর মুখশ্রীই নয়, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ শিল্পী, যার আত্মবিশ্বাস আর শিকড়ের টান ভারতবর্ষকে বিশ্বের দরবারে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিল।

ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman) ছিলেন ভারতের প্রথম মিস ইন্ডিয়া বিজয়ী। সেই বছরই (১৯৫২) ইন্দ্রাণী ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে মিস ইউনিভার্সের মঞ্চে অংশ নেন। সেখানে তাঁর উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমী। যেখানে অন্যান্য দেশের সুন্দরীরা পশ্চিমা পোশাকে ক্যাটওয়াক করছিলেন, সেখানে ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman) সুইমস্যুট রাউন্ডেও মাথায় পরেছিলেন গজরা, কপালে ছিল টিপ। যেন বলছিলেন, ‘আমি ভারতীয়, আর এটাই আমার গর্ব।’ তাঁর মুখে ছিল নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় হাসি। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন।

সৌন্দর্যের এমন সংজ্ঞা আগে ক’জনই বা দেখেছে? শুধু সুন্দরী প্রতিযোগিতা নয়, ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman) আসলে ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী। জন্ম ১৯৩০ সালে, তৎকালীন মাদ্রাজে। বাবা রমণ (Ramman) ছিলেন ভারতীয়, মা রগার্ড (Ragard) ছিলেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত। ছোটবেলা থেকেই মা তাকে নাচের প্রতি উৎসাহিত করেন। অল্প বয়সেই ইন্দ্রাণী ভারতনাট্যম, ওডিসি, কুচিপুড়ি ও কথকলি শিখে নেন। ওডিসি নৃত্যের প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। পণ্ডিত কবিচন্দ্র কালিচরণ পাত্র (Kalicharan Patra)-র কাছে ওডিসি শিখে তিনি এই নৃত্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেন। অনেকেই বলেন, ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman) যদি না থাকতেন, তাহলে ওডিসি নাচ হয়ত এত দ্রুত বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেত না।

নিউ ইয়র্ক টাইমস একবার লিখেছিল, “She brought not just Indian dance, but Indian grace to the world stage.” সেই সময় ভারতের পক্ষে বিদেশে সফর করাও ছিল চ্যালেঞ্জের। কিন্তু ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman) ছিলেন অকুতোভয়। আমেরিকা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান তিনি কোথায় না যাননি! তাঁর নাচের প্রদর্শন ছিল ভারত সরকারের ‘কালচারাল অ্যাম্বাসেডর’ প্রজেক্টের অংশ। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার ইন্দ্রাণী রহমানকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে।

ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman)-এর মেয়ে সুকন্যা রহমান (Sukanya Rahman) এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মা যখন মিস ইউনিভার্সে গেলেন, তখন অনেকে সমালোচনা করছিলেন যে একজন নৃত্যশিল্পীর এভাবে মডেলিং করা ঠিক নয়। কিন্তু তিনি বলতেন, একজন নারী অনেককিছু হতে পারে। নৃত্যশিল্পী, মা, সুন্দরী সব একসঙ্গে। কোনও পরিপন্থা নেই।’ ইন্দ্রাণীর (Indrani Rahman) বাঙালি-মারাঠি-আমেরিকান শিকড়, শাস্ত্রীয় নৃত্যের গভীর জ্ঞান, নৃত্যচর্চার পাশাপাশি সংসার ও সন্তান লালন এইসব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন ‘গ্লোবাল আইকন’। শুধু তা-ই নয়, তিনি ছিলেন ভারতের সেই নারীমুক্তির প্রেরণা যিনি দেখিয়েছিলেন, নিজের পরিচয় ধরে রেখেও কীভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হওয়া যায়! আজকের মডেলিং ও নৃত্যশিল্পের জগতে ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman)-এর অবদানকে অনেকেই হয়ত ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ভোলেনি।নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গল্প নিঃশব্দে অমোঘ প্রেরণা। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি কখনও পশ্চিমি পোশাক পরে নাচতে চাননি?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘আমার শাড়ির ভাঁজে যেমন আমার সুরক্ষা, তেমনই আমার নাচের ভাষা। তাই পশ্চিমি পোশাক পরে নাচ আমার আত্মাকে প্রকাশ করতে পারত না।’

ইন্দ্রাণী রহমান ছিলেন সত্যিকারের ‘ভারত সুন্দরী’। বর্তমানে, যখন ভারতের সুন্দরীরা বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে ভারতের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হন, তখন ইন্দ্রাণী রহমান (Indrani Rahman)-এর কথা আরও বেশি মনে পড়ে। কারণ তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন, ‘ভারতীয়ত্ব’ কোনও প্রতিযোগিতার জন্য সাজানো ফ্যাশন নয়, এটাই আমাদের সত্যিকারের পরিচয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vijay-Rashmika : ‘সব কিছুতে ও-ই!’ প্রকাশ্যে বিজয়-রশ্মিকা, বিয়ের গুঞ্জন ফের তুঙ্গে




