স্নিগ্ধা বসু ★ সাশ্রয় নিউজ : ঠান্ডা জলে হঠাৎ করে শরীর ডুবিয়ে দেওয়া, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কোল্ড শক (Cold Shock)’ বলা হয়, তা শুনলেই প্রথমে মনে হতে পারে বিপজ্জনক। কারণ শরীর যখন আচমকা বরফ-ঠান্ডা জলের সংস্পর্শে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তনালীগুলো সঙ্কুচিত হয় এবং কর্টিসল (Cortisol)-এর মতো স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা এক ধরনের ইমিউনোসাপ্রেসান্ট। সেই সঙ্গে সারা শরীর কেঁপে ওঠে। তবুও, এই ‘আইস বাথ (Ice Bath)’ বা বরফ-ঠান্ডা জলে স্নান করার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বিভিন্ন ফিটনেস সেন্টার থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্টে এখন এই ট্রেন্ড স্পষ্ট। নিউ ইয়র্কের এক ফিটনেস প্রশিক্ষক মায়া জনসন (Maya Johnson) জানিয়েছেন, “প্রতিদিন সকালে পাঁচ মিনিটের জন্য আইস বাথ নিই। এতে মানসিক শক্তি যেমন বাড়ে, তেমনই সারা দিন সতেজ বোধ করি।” তাঁর মতে, এই ঠান্ডা জলে ডুব মানসিক দৃঢ়তা ও সহনশীলতাও বৃদ্ধি করে।গবেষকরা বলছেন, ঠান্ডা জলে স্নানের কিছু উপকারিতা থাকলেও, এর কিছু ঝুঁকিও কম নয়। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের অধ্যাপক মাইকেল টিপটন (Michael Tipton) জানিয়েছেন, “প্রথমে শ্বাস আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। যদি কেউ নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের অভ্যাস না করে, তাহলে হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে।” তবে নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীর এই শক সামলে নিতে শেখে। অন্যদিকে, সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ফিজিওলজিস্ট হ্যান্স লারসন (Hans Larsson) মনে করেন, “ঠান্ডা জলে ডুব দিলে রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ত্বকের রক্তনালী সঙ্কুচিত হয়ে রক্তকে গভীর অঙ্গের দিকে পাঠানো হয়। ফলে অঙ্গগুলির তাপমাত্রা বজায় থাকে।” তাঁর মতে, এতে শরীরের ‘ব্রাউন ফ্যাট’ সক্রিয় হয়, যা ক্যালরি খরচে সাহায্য করে ও ওজন কমাতেও সহায়ক।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়াটি সকলের জন্য নয়। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা শ্বাসকষ্টের রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইস বাথ নেওয়া থেকে বিরত থাকাই ভাল। কারণ ঠান্ডার শক তাঁদের শরীরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বরফ-ঠান্ডা জলে ডুব দেওয়া ইনফ্ল্যামেশন কমাতে ও পেশির ব্যথা উপশমে কার্যকরী। ফলে অনেক অ্যাথলিটই ট্রেনিংয়ের পর আইস বাথ নিয়ে থাকেন।মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. লরা হফম্যান (Dr. Laura Hoffman) বলছেন, “আইস বাথ পেশির ফোলাভাব ও ক্লান্তি দ্রুত কমাতে পারে। তবে এর জন্য ১০-১৫ মিনিটের বেশি নয়।” তিনি আরও জানান, যদি কেউ মনে করে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকলে উপকারিতা বাড়বে, সেটি ভুল ধারণা। কারণ দীর্ঘক্ষণ বরফ-ঠান্ডা জলে থাকলে হাইপোথার্মিয়া পর্যন্ত হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও আইস বাথের কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করেছেন গবেষকরা। নিউইয়র্কের মনোবিজ্ঞানী জেসন গ্রিন (Jason Green) জানিয়েছেন, “ঠান্ডা জলে ডুবের সময় শরীরে এন্ডরফিন ও ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ হয়, যা মুড ভাল রাখতে সহায়তা করে।” তাঁর মতে, যাঁরা হতাশা বা ক্লান্তিতে ভোগেন, তাঁদের অনেকেই নিয়মিত আইস বাথের মাধ্যমে উপকার পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া হঠাৎ করেই এই অভ্যাস শুরু করা ঠিক নয়। প্রথমে হালকা ঠান্ডা জলে স্নান, তারপর ধীরে ধীরে বরফ-ঠান্ডা জলের দিকে যাওয়া ভাল। কারণ প্রতিটি শরীরের সামর্থ্য আলাদা। ফিটনেস বিশেষজ্ঞ মায়া জনসন (Maya Johnson)-এর মতে, “মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি ছাড়া সরাসরি আইস বাথ বিপদ ডেকে আনতে পারে।” সুতরাং, আইস বাথ আপনার জন্য ভাল কি না, তা আপনার স্বাস্থ্য অবস্থা ও অভ্যাসের উপরেই নির্ভর করছে। সতর্কতা অবলম্বন করে ও নিজে না শুরু করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে শুরু করলে, এই প্রাচীন অথচ আধুনিক ফিটনেস ট্রেন্ড হয়ত আপনাকেও দিতে পারে নতুন শক্তি ও সতেজতার অনুভূতি।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Rashmika Mandanda | Star Life : তিনটে ৫০০ কোটির ছবি, পাঁচ শহরে বাড়ি, গ্যারাজে লাক্সারি গাড়ি, ৩০-র আগেই সম্পত্তিতে রেকর্ড গড়লেন রশ্মিকা




