সূর্য মিত্র, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পৃথিবীতে আমরা প্রায় সবাই অতীতের কিছু বিশেষ মুহূর্ত বা স্মরণীয় দিনের কথা মনে রাখতে পারি। কিন্তু প্রতিটি দিনের খুঁটিনাটি ঘটনা নিখুঁতভাবে মনে রাখা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবু আশ্চর্যজনকভাবে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্রতম মুহূর্তও তারিখ-সহ গড়গড় করে বলে দিতে পারেন। এ ধরনের বিরল ক্ষমতার নাম হাইপারথাইমেসিয়া (Hyperthymesia)। সম্প্রতি একজন কিশোরীর মধ্যে এই অসাধারণ ক্ষমতা আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় (University of Paris)। ওই গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ মানুষ যেখানে অতীতের তথ্য হাতের মুঠোয় ধরা বালির মতো ঝরে যেতে দেয়, সেখানে এই কিশোরীর মস্তিষ্ক থেকে কোনও স্মৃতিই হারিয়ে যায় না। কিন্তু সে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে এতটাই নিখুঁতভাবে ধরে রাখতে পারে যে, বিজ্ঞানীরা একে বলছেন মানসিকভাবে ‘টাইম ট্রাভেল’।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of California) স্নায়ুবিশারদরা (Neurobiologists) ২০০৬ সালে প্রথম একজন মহিলার শরীরে হাইপারথাইমেসিয়ার অস্তিত্ব খুঁজে পান। সেই আবিষ্কারের প্রায় দুই দশক পরে আবারও নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এই বিস্ময় কিশোরীকে ঘিরে। গবেষকদের ভাষায়, “সে যেন স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিয়ে অতীতের যেকোনও ঘটনাকে পুনরায় অনুভব করতে পারে।” উল্লেখ্য, ওই কিশোরীর পরিচয় এখনও গোপন রাখা হলেও জানা গিয়েছে, শৈশব থেকেই সে নিজের এই ক্ষমতা টের পেয়েছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে বন্ধুদের কাছে নিজের অদ্ভুত ক্ষমতার কথা বললেও কেউ তাকে বিশ্বাস করেননি তো বটেই, অনেকে ভেবেছিলেন বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছেন। তখন থেকেই কিশোরী বুঝতে পারে তার মস্তিষ্ক অন্যদের মতো স্বাভাবিক নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন সেই কিশোরী। পরবর্তীতে ষোলো বছর বয়সে পরিবারের কাছে সব খুলে বলেন এবং সতেরো বছর বয়সে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অংশ নিতে রাজি হন।

গবেষকরা জানিয়েছেন, ওই কিশোরী নিজের স্মৃতিকে মনে রাখার জন্য একধরনের কাল্পনিক কক্ষ বা ঘরের ধারণা তৈরি করেছেন। তার মতে, আবেগ-সংযুক্ত স্মৃতিগুলি থাকে একটি সাদা ঘরে, যেখানে পৌঁছেই সে দ্রুত সেই মুহূর্তে ফিরে যেতে পারেন। আবার যেসব স্মৃতির সঙ্গে আবেগ জড়িত নয়, সেগুলি থাকে তথাকথিত ‘ব্ল্যাক মেমোরি’ ঘরে। ওই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গিয়েছে, এক মাস আগের কোনও ঘটনার দিন-ক্ষণ পর্যন্ত নির্দিষ্টভাবে বলতে পারে এই কিশোরী। আবার দুই বছর আগের ঘটনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাস, আর অনেক পুরনো ঘটনার ক্ষেত্রে সাল পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। বিস্ময়করভাবে কিশোরীর দাবি, কেবল অতীত নয়, ভবিষ্যতের কিছু ঘটনাও সে অনুভব করতে পারে। যদিও গবেষকেরা বলছেন, “ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্য প্রমাণ করা এখনও সম্ভব হয়নি, তবে অতীত পুনর্গঠনের ক্ষমতা আমাদের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে বর্তমানে ১০০ জনেরও কম মানুষ হাইপারথাইমেসিয়ায় আক্রান্ত। তাঁদের প্রত্যেকেরই মস্তিষ্কের গঠন ও স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা নিয়ে চলছে নিবিড় গবেষণা। এই কিশোরীকে ঘিরে গবেষণা সফল হলে মানবমস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, স্মৃতি ধরে রাখার এই বিরল ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্ককে বোঝার ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক হবে। কিশোরীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে, স্মৃতিকে শুধু মনে রাখা নয়, তা পুনরায় বেঁচে ফেলার ক্ষমতাও থাকতে পারে। ফলে গবেষকরা মনে করছেন, একদিন হয়ত হাইপারথাইমেসিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে স্মৃতিভ্রংশ বা আলঝাইমার (Alzheimer’s) রোগের চিকিৎসায়ও আশার আলো দেখা যেতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বিস্ময় কিশোরী এখন শুধু বিজ্ঞানীদেরই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। মানব মস্তিষ্কের অদ্ভুত ও রহস্যময় জগতে নতুন করে আলো ফেলেছে তার এই ক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, “তার মস্তিষ্ক যেন সময়কে থামিয়ে রাখতে পারে।” ভবিষ্যতে এই গবেষণা আমাদের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন অধ্যায় যোগ করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
-প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র
আরও পড়ুন : Mobile Recharge Cost in India | মোবাইল রিচার্জের বাড়তি চাপ: সংকটে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার, জরুরি পদক্ষেপের দাবি




