সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঝাড়গ্রাম : ঝাড়গ্রাম জুড়ে ফের হাতিকে নিয়ে হইচই। আর এবার বিতর্কের কেন্দ্রে জনপ্রিয় বন্যহাতি ‘রামলাল’ (Ramlal)। সোমবার সকালে ঝাড়গ্রামের রোহিনী বাজারে প্রবেশ করার সময় শতাধিক মানুষ হাতিটিকে তাড়া করে ও এক ব্যক্তি তার লেজ ধরে টান দেন, এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনার নিন্দায় মুখর বনপ্রেমীরা। প্রশ্ন উঠছে, বন্যপ্রাণীকে এই ধরনের ‘অত্যাচার’ কি বরদাস্তযোগ্য? সোমবার সকালে সাঁকরাইল ব্লকের (Sankrail Block) ডাহিচক (Dahichak) এলাকা হয়ে চুনপাড়া (Chunpara) গ্রামে প্রবেশ করেছিল রামলাল। একটি বাড়ির উঠানে রাখা ধানের বস্তা খুলে সে খাবার খাচ্ছিল, এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এরপর হাতিটি রোহিনী বাজার (Rohini Bazar) এলাকায় পৌঁছায়। সেখানেই ঘটে বিতর্কিত ঘটনাটি। পিচরাস্তায় ধীর পায়ে হাঁটছিল রামলাল, তখনই এক ব্যক্তি তার লেজ ধরে টানতে থাকে, আর পিছনে তাড়া করে হইচই করতে থাকে শতাধিক উৎসাহী জনতা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওতে রীতিমতো ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠেছে, একদিকে বিশাল বন্যপ্রাণী, যার স্বভাব শান্ত হলেও প্রবল উত্তেজনায় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে বেপরোয়া মানুষের ভিড়, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার লেজ ধরে টানছে। ভিডিওটি দেখে নেটিজেনদের একাংশ রীতিমতো ক্ষুব্ধ। অনেকেই লিখেছেন, “রামলাল তো কিছুই করেনি। মানুষজনই নিজেরা বাঁদরামি করেছে।” এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বন দপ্তরের (Forest Department) আধিকারিকরা। পশ্চিম মেদিনীপুর (Paschim Medinipur), বাঁকুড়া (Bankura), ওড়িশা (Odisha), ঝাড়খণ্ড (Jharkhand)–সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গত কয়েক বছর ধরেই রামলালের অবাধ বিচরণ দেখা গেছে। সাধারণত সে শান্ত স্বভাবের, গ্রামে ঘুরে খাবার খুঁজে বেড়ায়। বহু মানুষ আবার তাকে আদর করেও খাবার দেন ধান, কলা, আম, কাঁঠাল। কিন্তু তার সঙ্গে এমন আচরণ যে বিপদ ডেকে আনতে পারত, সে বিষয়ে সবাই একমত। এক বনকর্মীর কথায়, “হাতি প্রাকৃতিকভাবে শান্ত প্রাণী। কিন্তু যদি ভয় পায় বা বিরক্ত হয়, তখন সেটাই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আজ যদি রামলাল রেগে যেত, ক’য়েকজন প্রাণও হারাতে পারত। শুধুমাত্র ভিড় বা উত্তেজনার বশে এমন কাজ করলে বিপদ অনিবার্য।”
জঙ্গলমহলে (Jangalmahal) দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব (Human-Elephant Conflict) চলছেই। বনদপ্তর বহুবার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে এলে দূরত্ব বজায় রাখতে। সচেতনতার প্রচারও হয়েছে। তবুও উত্তেজিত জনতার কাণ্ড দেখে অসহায় বনকর্মীরা। এ প্রসঙ্গে বন দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, “মানুষ সচেতন না হলে আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। আমরা বারবার সতর্ক করছি, ভিডিও তুলে ভাইরাল করার নামে বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে এমন আচরণ করলে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।”
স্থানীয় পরিবেশবিদ সুমন্ত জানা (Sumanta Jana) বলেন, “রামলাল শুধু একটা হাতি নয়, একটা চলন্ত জীবন্ত সম্প্রীতির প্রতীক। সে যেভাবে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়, তার সঙ্গে মানুষের একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই সম্পর্ক যেন মানুষের বোকামিতে ভেঙে না পড়ে।” তবে প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে যে রামলালকে ‘প্রিয় অতিথি’ হিসেবে দেখা হতো, হঠাৎ এমন তাড়া, এমন অপমান কেন? স্থানীয় সূত্রে অনুমান, সম্ভবত মোবাইলে ভিডিও করার নেশাই এমন অদ্ভুত আচরণ করিয়েছে অনেককে। কেউ কেউ আবার হেসে বলছে, “সেলফি তোলার যুগে এখন হাতির সঙ্গেও সেলফি চাই!” ঘটনার পর বন দপ্তরের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে রামলালকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এরকম ঘটনা বারবার ঘটলে কীভাবে টিকে থাকবে এই সুন্দর সহাবস্থান? বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কি কেবল বন দপ্তরের দায়িত্ব? নাকি আমাদেরও কিছু দায় রয়েছে? ওয়াকিবহাল মহলের মত, মানুষ যতদিন না প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের অর্থ বুঝবে, ততদিন রামলালরা বিপন্নই থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : From Heritage Sites to Riverbanks: Delhi NCR Embraces Yoga’s Global Message




