শিবপ্রসাদ মণ্ডল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দিনের শুরুটাই যেন একটা ক্লান্তির চাদর মুড়ি দিয়ে আসে। ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট, কাজে মন বসে না, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা, আর রাত বাড়তেই আবার নিদ্রাহীন চোখে মোবাইল স্ক্রিন। এ যেন এক আধুনিক জীবনের অদৃশ্য অভিশাপ। কিন্তু এই ‘নিয়মিত ক্লান্তি’ (chronic fatigue) কিংবা ‘ঝিমুনি’কে (daytime drowsiness) আপনি যদি ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেন, তাহলে ক্ষতি আপনারই।

চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিদদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের ক্লান্তির কোনও জটিল চিকিৎসাগত কারণ থাকে না। কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে আপনার শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ৫টি অভ্যাস একটু সচেতনভাবে পাল্টাতে পারলেই জীবনে ফিরে আসতে পারে এনার্জি, মনোযোগ ও ফোকাস।

ঘুমের ঘাটতি মানেই ক্লান্তির ফাঁদ। ঘুম যেমন আমাদের শরীরকে বিশ্রাম দেয়, তেমনি মস্তিষ্ককে করে রিফ্রেশ। নিয়মিত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসল (Cortisol) ও মেলাটোনিন (Melatonin)-এর মতো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলস্বরূপ দেখা দেয় সারাদিন ঘুমঘুম ভাব, মাথা ভার, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া। ‘ইন্ডিয়ান স্লিপ রিসার্চ সোসাইটি’-এর (Indian Sleep Research Society) চিকিৎসক ডঃ সীমা দাসগুপ্ত (Dr. Seema Dasgupta) বলছেন, “রাতের পর রাত মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঘুম কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে আমাদের ডে-টাইম ফাংশনের ওপর। কেবল সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্টই নয়, কাজের ফোকাস, স্মৃতিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

এছাড়াও চিকিৎসকরা বলছেন, জল আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন এবং পুষ্টি পৌঁছে দেয়। প্রতিদিন কমপক্ষে ২.৫ থেকে ৩ লিটার জল না খেলে ধীরে ধীরে ক্লান্তি বাসা বাঁধে শরীরে। আবার খুব বেশি ঘাম হলে বা কফি-চা বেশি খাওয়ার অভ্যাস থাকলেও শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশন (National Institute of Nutrition) বলছে, “জলের ঘাটতিতে ব্লাড সঞ্চালন কমে যায়, কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হয়, মস্তিষ্কের স্নায়ু সংকেতও ধীর হয়ে পড়ে।” অথচ জল খাওয়ার অভ্যাস ঠিক করলেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। আপনি ফলের রস, স্যুপ বা লেবু-জল খেলেও শরীর পানীয় উপাদান পেয়ে যায়।

আবার প্রাতরাশ বাদ মানেই শক্তি হারানো। প্রাতরাশ না খেয়ে দিনের কাজ শুরু করা মানেই নিজের শক্তির উৎস বন্ধ করে ফেলা। পুষ্টিবিদ অনন্যা ঘোষ (Ananya Ghosh) জানাচ্ছেন, “রাতের খাবারের পর দীর্ঘ বিরতির পর শরীর একটি গঠনমূলক ও সুষম প্রাতরাশ প্রত্যাশা করে। যদি আপনি কেবল কফি বা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে যান, তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক।” প্রাতরাশে চাই হোলগ্রেন, প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যেমন ওটস, ডিম, ফল, বাদাম ইত্যাদি।

শরীরচর্চা করলে ক্লান্তি নয়, শক্তি বাড়ে। হ্যাঁ, ক্লান্ত লাগলেও শরীরচর্চা করার অভ্যাস আপনাকে সারাদিন ফুরফুরে রাখতে পারে। চিকিৎসক ও ফিটনেস কোচ রণজিৎ দে (Ranjit Dey) বলছেন, “হালকা হাঁটা, যোগাসন, ব্রিদিং এক্সারসাইজ এমনকী ১০ মিনিটেরও শরীরচর্চা শরীরে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। ফলে ক্লান্তি হ্রাস পায়।” আবার যাঁরা ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাঁদের প্রতি ১ ঘণ্টা অন্তর একটু হাঁটা বা স্ট্রেচিংয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরতি না নিলে কাজই হবে ধীরগতিতে। অতিরিক্ত চাপ মানেই বেশি কাজ, বেশি ফল নয়। নিয়মিত বিরতি না নিলে ক্লান্তি জমে গিয়ে আপনার উৎপাদনশীলতাই কমিয়ে দিতে পারে। ডাক্তার ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স নিয়ে কাজ করা মনোবিদ অনীশা সেনগুপ্ত (Anisha Sengupta) বলছেন, “রোজ অফিসে বা হোম অফিসে মাঝেমধ্যে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের বিরতি মন ও শরীর, দু’টোরই পুনরুদ্ধার ঘটায়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছুদিন কাজ থেকে ছুটি নেওয়া, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, কিংবা শুধুমাত্র নিজের জন্য একান্ত সময় বরাদ্দ করাও হতে পারে জীবনীশক্তি ফিরে পাওয়ার কৌশল। মনে রাখতে হবে যে, ক্লান্তি আমাদের জীবনের সঙ্গী হতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনওই নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসের সামান্য বদলই আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারে পুরনো ফোকাস, কর্মক্ষমতা আর আনন্দে ভরা দিন।
সব ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Darbaari Mutton recipe | নবাবি দরবারী মটন, সহজ রেসিপিতে রাজকীয় স্বাদ




