Himachal Pradesh polyandry marriage | হিমাচলে এক স্ত্রীর একাধিক স্বামী! বছরের পর বছর ধরে আজও জীবিত এই প্রথার নেপথ্যে কোন যুক্তি কাজ করছে?

SHARE:

মিলন দত্ত ✪ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : হিমাচল প্রদেশের (Himachal Pradesh) একটি পাহাড়ি গ্রামে সম্প্রতি এমন এক বিয়ের সাক্ষী থাকল দেশ, যা শুনে চোখ কপালে উঠছে শিক্ষিত সমাজের। দুই ভাই মিলে বিয়ে করলেন একজন তরুণীকে। এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই বিস্ময় ছড়িয়েছে সর্বত্র। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ এই প্রথা হাজার হাজার বছর ধরেই চলে আসছে হিমাচলের কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে। বিশেষ করে সিরমৌর (Sirmaur) জেলার শিলাই (Shillai) ব্লকের নেগি (Negi) পরিবার সম্প্রতি এই প্রথা মেনে বিয়ে করেছেন। কুনহাট (Kunhat) গ্রামের সুনীতা চৌহান (Sunita Chauhan)-এর সঙ্গে একই সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েছেন কপিল নেগি (Kapil Negi) ও প্রদীপ নেগি (Pradeep Negi)।

এই বিয়ের সংবাদ প্রকাশ্যে আসতেই নানান চর্চা দেশ জুড়ে। এবং এই বিয়ে নিয়ে তুমুল বিতর্ক হলেও দুই ভাই বা নববধূর মনে কোনও আক্ষেপ নেই। প্রদীপ (Pradeep) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা আমাদের ঐতিহ্য সর্বসমক্ষে খোলাখুলি অনুসরণ করেছি, কারণ আমরা আমাদের ইতিহাস নিয়ে গর্বিত।’ অন্যদিকে কপিল (Kapil) বলছেন, ‘আমরা সব সময় স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী।’ নববধূ সুনীতা (Sunita) জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের, কোনও চাপ নয়। তিনি বলেন, ‘আমি এই ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন। আমাদের তিন জনের মধ্যে যে বন্ধন, তাকে সম্মান জানিয়ে এই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।’ উল্লেখ্য যে, এই ধরনের প্রথাকে বলা হয় পলিঅ্যান্ড্রি (Polyandry)। অর্থাৎ, এক মহিলার একাধিক স্বামী। ভারতের উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশে আজও এই প্রথার সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে। বিশেষ করে হাট্টি (Hatti) সম্প্রদায়, যারা হিমাচল-উত্তরাখণ্ড সীমান্তে বসবাস করেন। বছর তিনেক আগে হাট্টি সম্প্রদায়কে তফসিলি জনজাতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যেই প্রচলিত এই বহুবিবাহ প্রথা, যাতে এক তরুণীর সঙ্গে একই পরিবারের একাধিক ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই রীতি? সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, এর মূল কারণ অর্থনীতি। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় কৃষিজমি অত্যন্ত সীমিত। ভাইদের মধ্যে জমি ভাগ হতে হতে তা অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায় ও পরিবারের পক্ষে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই, সম্পত্তি ভাগাভাগি বন্ধ করতে ও পরিবারকে একসঙ্গে রাখতে এই প্রথা চালু হয়েছিল। ‘দ্রৌপদী প্রথা’ নামে পরিচিত এই প্রথা মহাভারতের পাণ্ডবদের সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহের কিংবদন্তির সঙ্গেও জড়িত। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, পাণ্ডবরা এক সময় এই অঞ্চলেই লুকিয়ে ছিলেন ও সেখান থেকেই এই প্রথার শুরু হয়।

এই বিশেষ বিয়ের অনুষ্ঠানের নিয়মও আলাদা। বররা কনের বাড়ি যান না। কনে আসে বরের বাড়ি। সেখানেই বসে বিয়ের আসর, পুরোহিত স্থানীয় ভাষায় মন্ত্র পড়েন। এই রীতিকে বলা হয় ‘সিঞ্জ’ (Sinj)। বিয়ের পর সন্তানের প্রকৃত পিতা কে, তা ঠিক করেন স্ত্রী নিজেই। সন্তান বড় ভাইকে ‘বাবা’ বলেই সম্বোধন করে, বাকিদের কাকা। গত ছয় বছরে শুধু বাধানা (Badhana) গ্রামেই এমন পাঁচটি বিয়ে হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। ফলে সম্প্রতি নেগি পরিবারের এই বিয়ে তেমন নতুন কিছু নয়। তবে শিক্ষার প্রসারে ধীরে ধীরে এই প্রথা লোপ পাচ্ছে। তবুও কপিল (Kapil) ও প্রদীপ (Pradeep) দু’জনেই শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য রক্ষায় বিশ্বাসী। প্রদীপ সরকারি চাকরি করেন আর কপিল বিদেশে কর্মরত। তাঁরা মনে করেন, এই প্রথা তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অঙ্গ, যা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া দায়িত্ব।

এই বিয়ের প্রথা নিয়ে সমালোচকরাও চুপ করে নেই। সমাজতাত্ত্বিকদের একাংশ মনে করেন, এই প্রথা মহিলাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী। তাঁদের মতে, আধুনিক সমাজে এমন প্রথা অনৈতিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। আবার অন্য একাংশ মনে করেন, এই প্রথা নারীকে ‘সম্পত্তি’ হিসেবে না দেখে পরিবারে তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। কারণ কোনও ভাই মারা গেলে স্ত্রীকে বিধবা হয়ে বাকি জীবন কষ্টে কাটাতে হয় না, পুরো পরিবারই তাঁর স্বামী হিসেবে রয়ে যায়। ফলে তিনি অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন না।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাহাড়ি সমাজে এই ‘জোড়িদার’ (Jodidar) প্রথা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবে স্থিতিশীলতাও এনে দেয়। ভাইদের মধ্যে সম্প্রীতি থাকে, পারিবারিক সম্পদ অক্ষুণ্ণ থাকে, ও সমাজে কোনও মহিলাই অনাথ বা অসহায় অবস্থায় থাকেন না। যদিও এই যুক্তি নিয়েও বিরোধ আছে। অনেকেই মনে করেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা অচিরেই সম্পূর্ণভাবে লোপ পাবে। তথাপি, নেগি পরিবারের এই বিয়ে প্রমাণ করে, হাজার বছর আগে শুরু হওয়া প্রথা আজও কত গভীরে প্রোথিত পাহাড়ি জনজাতির মনে। সমাজ এগোলেও, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন মানতে নারাজ। এখানেও কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এর শেষ কোথায়? আধুনিকতার কাছে নতিস্বীকার, নাকি প্রাচীন প্রথাকেই আঁকড়ে ধরা? সময়ের সঙ্গে সেই উত্তরও খুঁজে নেবে সমাজ।

ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Darbaari Mutton recipe | নবাবি দরবারী মটন, সহজ রেসিপিতে রাজকীয় স্বাদ

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন