সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিমলা: পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুর (Bilaspur, Himachal Pradesh) জেলায় ভয়াবহ ভূমিধসের (landslide) ফলে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারী বর্ষণের জেরে পাহাড় থেকে নেমে আসা বিশাল পাথর ও কাদামাটির স্রোত এক বেসরকারি যাত্রীবাসের উপর আছড়ে পড়ে, মুহূর্তেই সেটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দেয়। দুর্ঘটনার পর থেকেই উদ্ধারকাজ চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাটি ঘটে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ, বিলাসপুরের ঝান্ডুটা (Jhanduta) উপবিভাগের বালুঘাট (Balughat) এলাকায়। বাসটি মারোট্টান (Marottan) থেকে ঘুমারউইন (Ghumariwin) যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ একটি বিশাল পাহাড়ের অংশ ভেঙে পড়ে বাসের উপর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভারী বর্ষণের পরপরই জোরালো শব্দে পাহাড়ের একটি বড় অংশ নেমে আসে এবং ক’য়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা পড়ে যায়। পুলিশ সূত্রে খবর, বাসটিতে তখন ২৮ থেকে ৩০ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, এবং ৩ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে বেরথিন (Berthin) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, বাকি যাত্রীদের খোঁজে রাতভর উদ্ধার অভিযান চলেছে। উল্লেখ্য, দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, এবং স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (SDRF)-এর দল। একাধিক JCB মেশিন নামানো হয়েছে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে। তবে, তীব্র বৃষ্টি এবং পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গমতা উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি করছে।

হিমাচল প্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী মুখেশ অগ্নিহোত্রী (Mukesh Agnihotri) নিশ্চিত করেছেন যে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তিনি জানান, “এখন পর্যন্ত মোট ১৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাসে ঠিক কতজন যাত্রী ছিলেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়।” তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল লাগাতার কাজ করছে। উদ্ধার অভিযান চলবে যতক্ষণ না প্রতিটি যাত্রীকে উদ্ধার করা যায়।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীদ (Prime Minister Narendra Modi) এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে ভূমিধসের কারণে প্রাণহানির ঘটনায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত। যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা জানাই। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।”
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, নিহতদের পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকে প্রতি পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে অনুদান এবং আহতদের জন্য ৫০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। অন্যদিকে, হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুক্কু (Sukhvinder Singh Sukhu) দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, “এই দুঃখজনক ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সমবেদনা। রাজ্য সরকার নিহতদের পরিবারের পাশে রয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সমস্তরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম যেন দ্রুত শেষ করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো ও চিকিৎসার সমস্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।” সুক্কু জানিয়েছেন, “এটি একটি ভয়াবহ দুর্যোগ। রাজ্য সরকার সমস্ত সহায়তা প্রদান করবে।”
আরও পড়ুন : Himachal Landslide | হিমাচল প্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টি, বিপর্যস্ত জনজীবন
বিলাসপুর জেলা প্রশাসনের কর্তা জানান, “দুর্ঘটনার সময় প্রবল বর্ষণ হচ্ছিল। পাহাড় থেকে আসা পাথর ও ধস এতটাই হঠাৎ নেমে আসে যে বাসচালক কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে বাসের ছাদ ও পাশ দুদিক থেকেই চাপা পড়ে যায়।” প্রসঙ্গত, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষজনই প্রথমে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। তাঁরা হাত দিয়ে ও ছোট যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যাত্রীদের বের করার চেষ্টা করেন। পরে প্রশাসন ও SDRF দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। হিমাচল প্রদেশে এ বছর লাগাতার ভারী বৃষ্টির ফলে একাধিক স্থানে ভূমিধস ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। রাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিলাসপুরে ১২.৭ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের হঠাৎ বৃষ্টি প্রায়শই ধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষত সংকীর্ণ রাস্তায় যাতায়াতকারী যানবাহনের ক্ষেত্রে বিপদের আশঙ্কা থাকে।
রাজ্যের দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তর জানিয়েছে, “এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে হিমাচলের পাহাড়ি রাস্তাগুলিতে নতুন সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হবে। ভারী বৃষ্টি বা ভূমিধসের সতর্কতা জারি হলে যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।” দুর্ঘটনায় আহত যাত্রীদের পরিবারের এক সদস্য বলেন, “আমরা ফোনে খবর পাই যে বাসটি ধসে চাপা পড়েছে। তখনই ছুটে আসি। প্রশাসনের সাহায্য দ্রুত এসেছে, কিন্তু পাহাড়ি পথে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে।”
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে যাতে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী নিজে শিমলা (Shimla) থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর ধসের প্রকৃত কারণ ও বাসচালকের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ক্রমাগত বর্ষণের ফলে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার ফলেই ধস নামে। উল্লেখ্য হিমাচলের বিলাসপুরের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল যে পাহাড়ি রাস্তায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা কতটা জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ব্যবস্থা ও রাস্তার মেরামতি কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত করা ছাড়া এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
ছবি : সংগৃহীত




