সাশ্রয় নিউজ, শম্ভুনাথ রায় ★কাকদ্বীপ : দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে সোমবার সকাল থেকে যেন উৎসবের আমেজ। বঙ্গের আকাশে আষাঢ়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নদী-বন্দরেও ফিরল রুপোলি ইলিশের (Hilsa) সুখবর। প্রথম দিনেই কাকদ্বীপের নামখানার খেয়াঘাটে ফিরে এসেছে ২৫টি ট্রলার। সেই ট্রলারগুলির জালে ধরা পড়েছে প্রায় ২৫ টন ইলিশ। মৎস্যজীবীদের মুখে ফুটেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার হাসি। এই মৌসুমের প্রথম দফার ইলিশ বাজারে আসতে চলেছে। এমন খবরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে রাজ্যের হাজার হাজার ইলিশপ্রেমীও। এ দিনের সকালে একে একে নামখানার ঘাটে ভিড় করে প্রায় ২৫টি ট্রলার। প্রত্যেকটি ট্রলারেই রয়েছে মাছের রাশি। তার মধ্যে নজর কেড়েছে টন টন ইলিশ। স্থানীয় এক মৎস্যজীবী জানালেন, ‘‘বহুদিন পর এমন সুন্দর আবহাওয়া পেয়েছি। সমুদ্র শান্ত ছিল, জালও ভরল। আমাদের এ দিনের ফল অত্যন্ত ভাল। এখনই যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, আরও ইলিশ আসবে।’’
মৎস্যজীবীদের চোখেমুখে নতুন মরসুমের আশার আলো স্পষ্ট। গত বছর আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় যেভাবে ইলিশের আগমন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল, এবার সেই ধাক্কা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগরের ইলিশ শিকার। নামখানার বহু পরিবার সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর উপর নির্ভরশীল। তাদের পক্ষে এই প্রাপ্তি শুধুই রোজগার নয়, জীবনের উৎসবও। কাকদ্বীপ ফিশারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিজন মাইতি (Bijon Maity) বলেন, ‘‘প্রথম দিনেই যে পরিমাণ ইলিশ এসেছে, তা অবশ্যই আমাদের অনেকটা আত্মবিশ্বাসী করছে। ইলিশের ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই বছর ভালই সম্ভাবনা রয়েছে।’’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘প্রথমে পরিমাণ কম হলেও এটি একটি ইতিবাচক সূচনা। এখন আবহাওয়া কেমন থাকে, সেটাই দেখার।’’ যদিও দাম নিয়ে এখনও কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। বাজারে ইলিশ এলেও প্রথম দফার ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালে সহজে পৌঁছবে না বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এক পাইকারি বিক্রেতা কথায়, ‘‘প্রথম দিকে চাহিদা বেশি থাকে। তাই দাম কিছুটা বেশি থাকতেই পারে। তবে দু’-তিন দিনের মধ্যে যদি সরবরাহ বাড়ে, দামও পড়ে যাবে।’’ বর্তমানে বাজারে যে ইলিশ আসছে, তার গড় ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রামের মধ্যে। ফলে, ১০০০ টাকা কেজির নিচে ইলিশ পেতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে।
স্বস্তির সুর শোনা গেল মৎস্যজীবী সংগঠনগুলির কণ্ঠেও। কাকদ্বীপের প্রবীণ মৎস্যজীবী সত্যেন দে (Satyen De) বললেন, ‘‘এই পরিমাণ ইলিশ এত তাড়াতাড়ি ফিরবে ভাবিনি। এখন শুধু ঈশ্বরভরসা। যদি ঝড়-জল না আসে, তাহলে এ বারের মরসুমটা আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে।’’ শুধু বাণিজ্য নয়, এই ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবেগ ও সংস্কৃতির টান। আষাঢ় এলেই বাঙালির মন চায় ভাতের পাতে এক টুকরো ইলিশ। তার আগমন মানেই ঘরে ঘরে উৎসব, পদ্মার স্বাদে কলকাতার রান্নাঘর। এক শৌখিন ক্রেতা হাওড়া বাজারে এসে বললেন, ‘‘প্রথম দিকের ইলিশ একটু দামি হলেও স্বাদে অসাধারণ হয়। আমি দুটো কিনেই নিলাম।’’ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন হাটে হাটে ইলিশের আসা শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে এখনও তা সীমিত পরিসরে। অধিকাংশ মাছ যাচ্ছে কলকাতা ও সংলগ্ন বড় বাজারগুলিতে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, সরবরাহ বাড়লেই জেলাগুলিতেও ইলিশ পৌঁছবে। মৎস্যজীবী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে আবহাওয়া সংক্রান্ত আরও স্পষ্ট ও সময়োচিত পূর্বাভাসের দাবিও উঠেছে। কারণ, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বহু সময় ঝুঁকি থাকে। ‘‘আবহাওয়ার খবর যদি সঠিক ভাবে জানা যায়, তাহলে ট্রলার চালানোও নিরাপদ হবে, মাছও বেশি ধরা পড়বে,’’ মত ট্রলার মালিক সমিতির সদস্য হরিপদ ঘোষ (Haripada Ghosh)-র।
উল্লেখ্য, সব মিলিয়ে আষাঢ়ের প্রথম দিনেই কাকদ্বীপে রুপোলি ঢেউ। এখন শুধু অপেক্ষা, সেই রুপোলি শস্য আরও কবে ভরাবে বাঙালির পাত। আবহাওয়ার আশীর্বাদ থাকলে, হয়তো এ বছরের ইলিশ-মরসুম হয়ে উঠবে স্বপ্নের মতোই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Monsoon update | বর্ষার ঢেউয়ের দোরগোড়ায় দক্ষিণবঙ্গ




