সূর্য মিত্র : বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কন্টেনার শিপিং সংস্থা মার্শেক লাইনার (Maersk Liner) যখন ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে আর্কটিক মহাসাগরের উত্তর সমুদ্রপথে তাদের ৪২,০০০ টন মাছ ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইলেকট্রনিকস বোঝাই জাহাজটি ভ্লাডিভোস্টক থেকে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে দেয়, তখন বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কারণ, আগে এই পথে পাড়ি দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। উত্তর মেরুর কঠিন বরফ গলে যাওয়ার ফলেই জাহাজটি নির্বিঘ্নে পৌঁছতে পেরেছে। আর এই ঘটনা প্রমাণ করে, বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে যা মানুষের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে, পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক যুগে পৃথিবীতে এক ভয়াবহ গণবিলুপ্তি (Mass Extinction) ঘটেছিল। যার নাম ‘গ্রেট ডাইং’ (Great Dying)। তখন পৃথিবীর ৯৬% সামুদ্রিক প্রজাতি ও ৭০% স্থলজ মেরুদণ্ডী প্রাণী চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এভাবে প্রকৃতি থেকে অরণ্য ও প্রাণের হারানো পূর্ণতা ফিরে পেতে লেগেছিল লক্ষ লক্ষ বছর। এবারও কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে, তবে মানুষের হাতেই?
সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক (University College Cork), কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয় (University of Connecticut) ও ভিয়েনার প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের (Natural History Museum Vienna) গবেষকরা অস্ট্রেলিয়ার সিডনির উত্তরে ‘ডাইক্রোইডিয়াম’ (Dicroidium) নামক বিলুপ্ত বীজ ফার্নের জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন। সেই শিলা ও জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা যা বলছেন, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ৬ মার্চ, ২০২৫-এ জিও সায়েন্স ওয়ার্ল্ড বুলেটিনে (Geoscience World Bulletin) প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, পার্মিয়ান যুগের শেষদিকে প্রথমে ফার্ন (Fern) প্রজাতির গাছ দ্রুত অরণ্য গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের কারণে ৭০০,০০০ বছর ধরে চলা ‘লেট স্মিথিয়ান থার্মাল ম্যাক্সিমাম’ (Late Smithian Thermal Maximum) পর্যায়ে এই অরণ্যও ধ্বংস হয়ে যায়। সেই সময়, প্রথমে ফার্ন, পরে ভোল্টজিয়াল পাইন বা সিডার (Voltzialean pine or cedar) ও শেষপর্যন্ত প্লুরোমিয়ান লাইকোফাইট (Pleuromeian Lycophyte) উদ্ভিদগুলো উদ্ভিদের সাম্রাজ্যে আধিপত্য করলেও, একটার পর একটা প্রজাতি হারিয়ে যায়। গবেষক মার্কোস আমোরেস (Marcos Amores) বলছেন, “প্রকৃতিতে কার্বন ভারসাম্যের ব্যাঘাতের প্রভাব লক্ষ লক্ষ বছর স্থায়ী হয়। তাই আজকের বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা অতীতের যে-কোনও সময়ের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
৫০০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে পৃথিবীতে অন্তত ৫ বার গণবিলুপ্তি ঘটেছে। কখনও উল্কাপাত (Meteor Strike), কখনও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanic Eruption) -এর জন্য। কিন্তু এবার এর নেপথ্যে মানুষই (Human-induced Extinction)। বাড়তে থাকা দূষণ, অরণ্য উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এসবের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। গবেষক ক্রিস মেস (Chris Mays) বলেন, “প্রকৃতিতে গণবিলুপ্তির পুনরুদ্ধার শব্দটি বিভ্রান্তিকর। যা একবার হারিয়ে যায়, তা আর ফেরে না। নতুন প্রজাতি আসে, কিন্তু হারানো চরিত্র আর ফিরে আসে না।” বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, বরফ গলার হার, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস এখন আগের চেয়ে ১০০ থেকে ১০০০ গুণ দ্রুত। ফলে একসময় যেমন ডাইনোসররা হারিয়ে গিয়েছিল, তেমনভাবেই মানুষেরও বিলুপ্তি অবধারিত হতে পারে। তবে পার্থক্য একটাই এবার এর কারণ মানুষ নিজেই।
অস্ট্রেলিয়ার এই গবেষণা থেকে জানা যায়, লেট স্মিথিয়ান থার্মাল ম্যাক্সিমামের (Late Smithian Thermal Maximum) পর যখন জলবায়ু শীতল হয়, তখনই ফের ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদের পুনর্জন্ম শুরু হয়। ধীরে ধীরে বড় গাছ, সবুজ অরণ্য গড়ে ওঠে। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। প্রায় কয়েক মিলিয়ন বছর লেগেছিল সেই অরণ্য ফিরতে। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানের বিশ্ব উষ্ণায়নের ধাক্কা যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে মানুষের কাছে আর সময় থাকবে না।তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি এই গভীর অসুখের জন্য প্রস্তুত? যদি একদিন মানুষই না থাকে, তবে এই পৃথিবীর আর কী প্রয়োজন থাকবে?
ছবি: সংগৃহীত। প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Census 1931: In sex ratio : লিঙ্গ অনুপাতে ১৯৩১ সালের জনগণনার বিস্ময়কর চিত্র, ‘উঁচু’ নয়, ‘নিচু’ই এগিয়ে




