Graphene quantum physics | গ্রাফিনে কোয়ান্টাম রহস্যের সমাধান: পদার্থবিদ্যার মূল সূত্র ভাঙল ইলেকট্রন

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিজ্ঞান দুনিয়ায় নতুন ইতিহাস তৈরি করল গ্রাফিন (Graphene)। একক স্তরের কার্বন পরমাণু দিয়ে তৈরি এই অদ্ভুত পদার্থ আবারও প্রমাণ করল যে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অজানা রহস্য। এবার ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হাত ধরে উঠে এসেছে এমন এক আবিষ্কার যা প্রচলিত পদার্থবিদ্যার মৌলিক সূত্রকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (Indian Institute of Science – IISc) ও জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স (National Institute for Materials Science) যৌথভাবে এমন একটি গবেষণায় সফল হয়েছে যা প্রমাণ করে, গ্রাফিনে থাকা ইলেকট্রন কখনও কখনও তরলের মতো আচরণ করে, যেন একেবারে নিখুঁত তরল প্রবাহ। এই আবিষ্কার কেবল মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্ত খুলে দেবে না, ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতেও বিপ্লব ঘটাতে পারে।

দশকের পর দশক ধরে কোয়ান্টাম পদার্থবিদরা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, ইলেকট্রন কি সত্যিই নিখুঁত তরলের মতো, প্রতিরোধহীনভাবে প্রবাহিত হতে পারে? কিন্তু এতদিন তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ অধিকাংশ পদার্থের ভেতরে থাকা পরমাণুর ত্রুটি, অশুদ্ধতা ও গঠনগত খুঁত এই অদ্ভুত প্রভাবকে বাধাগ্রস্ত করত। এই সমস্যার সমাধান এল গ্রাফিনে। গবেষকদল আল্ট্রা-ক্লিন বা অত্যন্ত পরিষ্কার গ্রাফিন স্যাম্পল তৈরি করে তাতে একসঙ্গে বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ও তাপ পরিবাহিতা পরিমাপ করেন। তাদের বিস্মিত করে দিয়ে দেখা গেল, যখন বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বেড়ে যাচ্ছে তখন তাপ পরিবাহিতা কমছে, আবার উল্টোটাও ঘটছে। পদার্থবিদ্যার সুপরিচিত Wiedemann-Franz আইন, যা বলে বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ও তাপ পরিবাহিতা একে অপরের সমানুপাতিক হবে, গ্রাফিন সেখানে একেবারে উল্টো আচরণ করছে।

আইআইএসসি-র পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ও গবেষণার অন্যতম মূল লেখক অরিন্দম ঘোষ (Arindam Ghosh) বলেন, “গ্রাফিন আবিষ্কারের ২০ বছর পরেও এর ভেতরে এত গবেষণার সুযোগ আছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।” উল্লেখ্য, গবেষণায় দেখা গেছে, কম তাপমাত্রায় এই বিচ্যুতি ২০০ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ চার্জ পরিবহন ও তাপ পরিবহনের প্রক্রিয়া এখানে পুরোপুরি আলাদা হয়ে গেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই দুই প্রক্রিয়াই নির্ভর করছে একটি সার্বজনীন কোয়ান্টাম ধ্রুবকের ওপর, যা ইলেকট্রনের গতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথাকথিত Dirac Point। এটি এমন একটি ইলেকট্রনিক অবস্থা, যেখানে গ্রাফিন না পুরোপুরি ধাতু, না পুরোপুরি অন্তরক। এই অবস্থায় ইলেকট্রন আলাদা আলাদা কণার মতো আচরণ না করে তরলের মতো একসঙ্গে চলতে শুরু করে। এই প্রবাহ জলীয় তরলের মতো হলেও শতগুণ কম সান্দ্র। গবেষণার প্রথম লেখক ও আইআইএসসি-র গবেষক অনিকেত মজুমদার (Aniket Majumdar) বলেন, “যেহেতু এই পানির মতো আচরণ ডির্যাক পয়েন্টে দেখা যায়, একে বলা হয় ডির্যাক ফ্লুইড (Dirac Fluid)। এটি আসলে এক ধরনের অদ্ভুত পদার্থ অবস্থা, যা ইউরোপের CERN-এ পর্যবেক্ষিত কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমার (Quark-Gluon Plasma) সঙ্গে তুলনা করা যায়।”

উল্লেখ্য, গবেষক দল ডির্যাক ফ্লুইডের সান্দ্রতাও পরিমাপ করেন এবং দেখেন এটি প্রায় নিখুঁত তরলের মতো, যা পদার্থবিদ্যার দুনিয়ায় অত্যন্ত বিরল। এই ফলাফল শুধু কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষকরা মনে করছেন, গ্রাফিনকে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এমনসব প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক সিগন্যাল বাড়িয়ে তুলতে পারবে অথবা দুর্বলতম চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ কোয়ান্টাম সেন্সর, হাই-এনার্জি ফিজিক্স কিংবা মহাকাশ পদার্থবিদ্যার অনেক জটিল বিষয় পরীক্ষাগারে বোঝার জন্য গ্রাফিন হতে পারে আদর্শ মাধ্যম।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল Nature Physics-এ। এতে অনিকেত মজুমদার (Aniket Majumdar), নিষর্গ চাধা (Nisarg Chadha), প্রীতম পাল (Pritam Pal), আকাশ গুগনানি (Akash Gugnani), ভাস্কার ঘাউরি (Bhaskar Ghawri), কেনজি ওয়াতানাবে (Kenji Watanabe), তাকাশি তানিগুচি (Takashi Taniguchi), সুব্রত মুখার্জি (Subroto Mukerjee) এবং অরিন্দম ঘোষ (Arindam Ghosh) প্রমুখ বিজ্ঞানীদের নাম রয়েছে। প্রসঙ্গত, কোয়ান্টাম দুনিয়ায় গ্রাফিনের এই নতুন সাফল্য নিঃসন্দেহে আগামী দিনের প্রযুক্তি বিপ্লবের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। পদার্থবিদ্যার পাঠ্যবইয়ের বহু প্রচলিত সূত্র হয়তো নতুন করে লিখতে হবে এই আবিষ্কারের আলোয়।

-প্রতীকী 
আরও পড়ুন : Indian women cricket team historic win | ইতিহাস গড়ল হরমনপ্রীতের দল, ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয় ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন