তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ : ব্রিটেনে রাত যত গাঢ় হয়, শহরগুলো ততটাই উজ্জ্বল হতো। থেমে থাকা জানালার কাচের গা বেয়ে আলো গড়াত, ক্লাবের সামনে লম্বা লাইন পড়ত, আর পাব-এর ভেতর থেকে ভেসে আসত জমে ওঠা আড্ডার হুল্লোড়। কিন্তু এখন সেই রাতগুলো অনেকটাই নীরব। সম্প্রতি Night Time Industries Association (NTIA) জানিয়েছে, ২০২০ সালের পর থেকে ব্রিটেনের ৩৭% নাইটক্লাব বন্ধ হয়ে গেছে। প্রথম ধাক্কা ছিল কোভিড-১৯ (Covid-19) এর সময়। লকডাউনে যেসব ক্লাব বন্ধ হয়েছিল, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি। আরও আশঙ্কার বিষয়, বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ধারা এখনও থামেনি। NTIA-এর প্রধান মাইকেল কিল (Michael Kill) বলেছেন, ‘যদি এমনই চলতে থাকে, দশকের শেষে ব্রিটেনে আর নাইটক্লাব থাকবে না। ব্রিটিশরা কোথায় যাবে গান গাওয়ার জন্য, মাতাল হয়ে গিটার কাঁধে বমি করার জন্য?’ তাঁর কথায় রসিকতার ছোঁয়া থাকলেও তাতে লুকানো নেই গভীর উদ্বেগ। কারণ, ব্রিটিশ সমাজের দীর্ঘকালীন সংস্কৃতির অংশ ছিল এই নাইট লাইফ। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে নতুন প্রজন্ম, জেন জেড (Gen Z)।
একসময় ২০-৩০-এর যুবসমাজ শুক্রবার রাত মানেই পাব, ক্লাব, পার্টি আর সীমাহীন পানীয়ের উল্লাসে মাতত। কিন্তু এই সময় জেন জেড অনেকটাই আলাদা। তারা স্বাস্থ্য সচেতন, মানসিক শান্তি-জাগতিক সাফল্যকে অগ্রাধিকার দেয়, ও অ্যালকোহল বা মাদকের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির (Oxford University) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ১৬-২৫ বছরের মধ্যে যাঁরা জেন জেড হিসেবে পরিচিত, তাঁদের প্রায় ৪৩% বলছে তারা ‘হ্যাংওভার’ একেবারেই পছন্দ করে না, শারীরিক-মানসিক ফিটনেসকে গুরুত্ব দেয়। ব্রিটিশ যুব সম্প্রদায়ের এই আচরণ পরিবর্তনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট ক্রিস্টিন মারফি (Christine Murphy) জানিয়েছেন, ‘এই প্রজন্ম বড় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে। তাদের কাছে রাত জেগে ক্লাবে যাওয়ার চেয়ে Netflix, ফিল্ম, স্কিন কেয়ার রুটিন, বা জিমে সময় কাটানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরা পরের দিন সকালটা ফ্রেশ থাকতে চায়।’

২০২২ সালের ইউগভ (YouGov) সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ১৮-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ২৫% একেবারেই অ্যালকোহল স্পর্শ করে না। তুলনায় ২০০১ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭%। এর পাশাপাশি, ব্রিটেনে নাইটক্লাবগুলোর আর্থিক চাপও বেড়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক ভাড়া, বিদ্যুৎ, স্টাফ সাপোর্ট ও লাইসেন্সিং খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে যেসব ক্লাবের ব্যবসা দুর্বল, তারা দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লন্ডনের (London) জনপ্রিয় ক্লাব ‘Fabric’ এর এক প্রাক্তন ম্যানেজার টম রবার্টস (Tom Roberts) বললেন, ‘আগের মতো লাইন পড়ে না। আজকের কিশোররা ক্লাবিং করতে আসে না। TikTok বা ইউটিউবে ভিডিও বানানোই তাদের কাছে বেশি ‘কুল’।’ কিন্তু শুধুই স্বাস্থ্য সচেতনতা নয়, এর পিছনে আছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও। লন্ডন, ম্যানচেস্টার (Manchester), লিভারপুলের (Liverpool) মতো শহরে বাড়ি ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ অত্যধিক। জেন জেডদের অনেকেই আংশিক চাকরি (Part-time job) বা ইন্টার্নশিপ করে, ফলে তাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে না। এছাড়া, কোভিড ও মন্দার পর থেকে ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক ক্রমেই মানসিক চাপ তৈরি করেছে। ২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এলিসা ওয়ালশ (Elissa Walsh) বলেন, ‘আমাদের কাছে ফিউচার সিকিউর করা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। পার্টি করে পরদিন হ্যাংওভার নিয়ে ক্লাস বা ইন্টার্নশিপে গেলে চলবে না।’ অন্যদিকে, ক্লাব সংস্কৃতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যৌন হয়রানি, অতিরিক্ত মদ্যপান, মারপিট এগুলি অনেককেই ক্লাব থেকে দূরে রাখছে। সম্প্রতি এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে নাইটক্লাবগুলিতে নারীরা ৬৪% যৌন হয়রানির শিকার হন। এর ফলে অনেকেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিক থেকে ক্লাবে যেতে অনিচ্ছুক। এছাড়া নতুন প্রজন্মের বিনোদনের সংজ্ঞাও বদলে গিয়েছে। আগে যেটা ছিল শারীরিক উপস্থিতি ও উল্লাসের মাধ্যমে আনন্দ পাওয়া, এখন সেটা হয়েছে ভার্চুয়াল কমিউনিটির মাধ্যমে কানেক্ট করা। গেমিং, ডিসকর্ড (Discord) চ্যাট, ভার্চুয়াল মুভি নাইট, এগুলিই তাদের রাতের বিনোদন।কনসালটেন্সি সংস্থা Kantar-এর ব্র্যান্ড অ্যানালিস্ট স্যাম হিউগো (Sam Hugo) বলছেন, ‘জেন জেডকে পেতে হলে ব্র্যান্ডগুলোকেও বদলাতে হবে। ওরা হেলদি পানীয় চায়, অ্যালকোহল ফ্রি বিয়ার চায়, মাইন্ডফুলনেস চায়। লাইভ ডিজে-র চেয়ে এখন লাইভ পডকাস্ট বা স্পোকেন ওয়ার্ড পারফরম্যান্স বেশি আকর্ষণীয়।’
আশার কথা, এই প্রজন্ম নতুন ধরণের নাইটলাইফ তৈরি করছে। স্পেন, জাপান বা কোরিয়ার মতো দেশে দেখা যাচ্ছে, নতুন ক্লাবগুলোতে অ্যালকোহল ফ্রি পার্টির ট্রেন্ড। ব্রিটেনেও অ্যালকোহল ফ্রি বার, সোবের রেভ (Sober Rave), ইয়োগা ক্লাবিংয়ের মতো ধারনাগুলি জনপ্রিয় হচ্ছে। যেখানে মদ নয়, হাইড্রেশন ড্রিঙ্ক, স্যুপ শট, ভেষজ চা আর স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস দেয়া হচ্ছে। মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট রিচার্ড ওয়েলস (Richard Wells)-এর কথায়, ‘এটা একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। ভবিষ্যতের ক্লাব হবে ‘ওয়েলনেস স্পেস’। এখানে লাইভ মিউজিক থাকবে, তবে সঙ্গে থাকবে মেডিটেশন, সেলফ কেয়ার, থেরাপিউটিক ফ্লোরওয়ার্ক।’ তবে এই পরিবর্তন সবার কাছে সুখকর নয়। ব্রিস্টলের (Bristol) ক্লাব DJ মার্ক স্ট্রিমার (Mark Streamer) বলেন, ‘ক্লাব মানেই নাচ, চিৎকার, বেহিসাবি মজা। এটা যদি না থাকে, তাহলে ক্লাবের আলাদা মানে কী রইল?’ এ বিষয়ে সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, জেন জেড-এর এই প্রবণতা একটি প্রজন্মগত মানসিক রূপান্তরের ইঙ্গিত। যেখানে আত্ম নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থ সাশ্রয় ও ভার্চুয়াল কানেকশনই মূল চাবিকাঠি। এমনকী ২০৩০-এর মধ্যে ব্রিটেনে নাইটক্লাব শব্দটার সংজ্ঞাই বদলে যাবে বলে মনে করছেন NTIA-এর কর্মকর্তারা। তাদের কথায়, ‘শুধু মদ আর মিউজিক নয়, মাইন্ডফুল ফান হবে পরবর্তী প্রজন্মের চাহিদা।’ একটা সময় ছিল, যখন রাতের ব্রিটেনের বাতাসে ভাসতো ‘Mr Brightside’-এর সুর, মাতাল হাসি আর অগোছালো উল্লাস। এখন সেই রাতও যেন প্রয়োজনের কাছে পরাজিত। হয়ত এই পরিবর্তন স্বাস্থ্যকর, হয়ত আর্থিকভাবে বুদ্ধিদীপ্ত। কিন্তু এক অর্থে, ব্রিটেন হারাচ্ছে তার দীর্ঘদিনের এক সাংস্কৃতিক পরিচয়, নিঃসঙ্গ রাতের অন্ধকারে বেজে ওঠা ড্রাম বিট আর রঙিন আলোয় মাতোয়ারা হওয়া মানুষের মিছিল। এই পরিবর্তন জেন জেড বেশি উপভোগ করছে বলেই মনে করছেন সমাজতাত্ত্বিকরা। কারণ ট্রেণ্ড বদলেছে। বললেছে সময়। সেই স্রোতে জেন জেড বদলে নিয়েছে নিজেদের ভাল থাকার দিকগুলিও।
ছবি: প্রতীকী




