সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারতের প্রাণস্রোত গঙ্গা (Ganga) অস্তিত্বের লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে। হিমালয়ের কোলে জন্ম নেওয়া গঙ্গার উৎস গঙ্গোত্রী (Gangotri Glacier) ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে, আর এই বিপর্যয় যেন শুধু এক টুকরো বরফের গলন নয়, এ দেশের ভবিষ্যৎ জলের সঙ্কটেরও পূর্বাভাস। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক দশকে গঙ্গোত্রী হিমবাহ ভয়ঙ্কর হারে গলছে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার কমে যাচ্ছে এর দৈর্ঘ্য। বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming)-এর প্রভাবে হিমবাহের এই দ্রুত ক্ষয় আজ গঙ্গার প্রবাহ, নাব্যতা এবং দূষণ সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নমামি গঙ্গে’ (Namami Gange) প্রকল্প গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও, গঙ্গার উৎসই যদি বিলীন হয়ে যায়, তবে এই প্রচেষ্টা কতটা টিকবে, সেই প্রশ্ন এখন গবেষক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আইআইটি ইনদওরের (IIT Indore) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ মিটার করে সঙ্কুচিত হচ্ছে গঙ্গোত্রী হিমবাহ। গত এক দশকে এই হিমবাহের দৈর্ঘ্য কমেছে অন্তত তিন কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বরফ গলার হার দ্রুত বাড়লেও সেই গলা জল সম্পূর্ণভাবে গঙ্গায় পৌঁছাচ্ছে না। এর বড় অংশ পাশের ক্যাচমেন্ট এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে অনিয়ন্ত্রিত বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।গবেষক ও ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল এক প্রাকৃতিক সংকট নয়, এটি হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালের আবহাওয়া, ভূপ্রকৃতি ও প্রতিবেশব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। হিমবাহ গলার ফলে আশেপাশের অঞ্চল গরম হচ্ছে, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে এবং মাটি ভেসে যাচ্ছে বন্যায়।
ফলো করুন : https://x.com/sasrayanews?s=09
ভূতত্ত্ববিদ (Geologist) ড. অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “গঙ্গোত্রী যদি এই গতিতে গলে যায়, আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে গঙ্গার উজানে জলের সরবরাহ ভয়ঙ্করভাবে কমে যেতে পারে। তখন শুধু উত্তর ভারত নয়, সমগ্র উপমহাদেশের কৃষি ও জলনির্ভর জীবন হুমকির মুখে পড়বে।” একই সুর শোনা যাচ্ছে হাইড্রোলজিস্ট (Hydrologist) ড. মীনাক্ষী সিং -এর গলায়। তিনি বলেন, “গঙ্গোত্রী গলে গেলে শুধু নদীর প্রবাহ কমবে না, গঙ্গার তীরে থাকা অসংখ্য শহর, গ্রাম, কৃষিজমি এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। এটি আসলে এক নীরব বিপর্যয়, যা আমরা এখনও বুঝতে পারছি না।”
পরিসংখ্যান বলছে, গঙ্গা নদী ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গঙ্গার জল কৃষিকাজ, শিল্প, পানীয় জল ও পরিবেশের মূল উৎস। যদি উৎস থেকেই জল কমে যায়, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ভারসাম্য এবং অর্থনীতি, সবকিছুই বড় সংকটে পড়বে। গঙ্গার সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার সম্পর্ক হাজার বছরের। এই নদী শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরও প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু আজ সেই গঙ্গা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে নিজের প্রাণ। উত্তরাখণ্ডের গোমুখ (Gomukh) এলাকা এখন আগের তুলনায় অনেক দূরে সরে গিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক দশকে তারা নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে বরফের পর্বত টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, গলে যাচ্ছে প্রবল রোদে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গোত্রীর এই দ্রুত গলন মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের ফল। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ায় হিমালয়ের তাপমাত্রা গত শতাব্দীর তুলনায় প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর ফলেই বরফের স্তর নরম হয়ে যাচ্ছে, বরফ গলার গতি বেড়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, গঙ্গোত্রী যদি এভাবে সঙ্কুচিত হতে থাকে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে গঙ্গা নদীর উজানের জলপ্রবাহ এতটাই কমে যাবে যে তা দেশের বৃহত্তম নদী হিসেবেও তার অবস্থান হারাতে পারে।
আইআইটি ইন্দোরের গবেষণার এক অংশগ্রহণকারী বলেন, “এখনও সময় আছে। যদি আমরা হিমালয় অঞ্চলে নির্বিচারে পর্যটন, বনধ্বংস, প্লাস্টিক দূষণ ও অতিরিক্ত নির্মাণ রোধ করতে পারি, তবে গঙ্গোত্রীর ক্ষয় কিছুটা রোখা সম্ভব। নইলে এই হিমবাহ কেবল মানচিত্রে ইতিহাস হয়ে যাবে।” প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকও ইতিমধ্যেই হিমবাহ সংরক্ষণে নতুন এক পরিকল্পনা করছে বলে সূত্রের খবর। বিশেষজ্ঞ কমিটির মতে, হিমবাহকে বাঁচাতে হলে স্থানীয় স্তরে বিকল্প জ্বালানি, জল সংরক্ষণ এবং বনবৃদ্ধি অভিযান জোরদার করতে হবে। কিন্তু সময় খুবই সীমিত। গঙ্গোত্রী গলে গেলে শুধু গঙ্গাই হারাবে না, হারাবে ভারতের আত্মা। যে নদীকে কোটি মানুষ মায়ের সমান শ্রদ্ধা করেন, সেই মায়ের উৎস আজ বিপন্ন। গঙ্গোত্রীকে বাঁচানো মানে গঙ্গাকে বাঁচানো, আর গঙ্গাকে বাঁচানো মানে এই দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ আঠেরো-তম কিস্তি)




