সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বিশেষ প্রতিবেদন, কলকাতা : আন্তর্জাতিক যৌন কেলেঙ্কারির ইতিহাসে যে নামটি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, রহস্য আর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে, তিনি জেফ্রি এপস্টিন (Jeffrey Epstein)। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে নিউইয়র্কের কারাগারে তাঁর রহস্যমৃত্যুর পর থেকে একের পর এক গোপন নথি, ইমেল এবং সাক্ষ্য সামনে এসেছে। সেই সব তথ্যের মধ্যেই এবার প্রকাশ্যে এল এমন একটি নাম, যাঁকে মৃত্যুর ঠিক আগে শেষ ফোনটি করেছিলেন এপস্টিন। সেই নারীর নাম কারিয়ানা শুলিয়াক (Karianna Shuliak)। বেলারুশের বাসিন্দা এই তরুণী শুধু এপস্টিনের প্রেমিকাই নন, জীবনের শেষ কয়েকটি বছরে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সঙ্গী ছিলেন বলেই দাবি উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ (The Telegraph) এপস্টিন ফাইল থেকে ফাঁস হওয়া তথ্য খতিয়ে দেখে জানায়, কারিয়ানা শুলিয়াক পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক। বর্তমানে তাঁর বয়স প্রায় ৩৬ বছর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এপস্টিনের জীবনের শেষ পর্যায়ে আইনি চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যে শুলিয়াকই ছিলেন তাঁর প্রধান মানসিক অবলম্বন। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে শেষ ফোন কলটি যে তাঁকেই করা হয়েছিল, সেই তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে।

এপস্টিন ও শুলিয়াকের প্রথম আলাপ হয়েছিল বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে (Minsk)। সময়টা ২০১০ সাল। সেই সময় শুলিয়াকের বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। তাঁদের দুজনেরই পরিচিত একজন রুশ মহিলা তাঁদের আলাপ করিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সম্পর্ক গভীর হয়। এপস্টিন তখনই শুলিয়াককে প্রকাশ্যে নিজের প্রেমিকা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বয়সের ফারাক, সংস্কৃতিগত পার্থক্য, সব কিছুকে ছাপিয়ে তাঁদের সম্পর্ক দ্রুত এগোয়।
প্রেমের শুরুর দিকেই এপস্টিন নিজের উদ্যোগে শুলিয়াককে আমেরিকায় নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (Columbia University) অধীনস্থ একটি ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হন এবং দন্তচিকিৎসার পাঠ সম্পূর্ণ করেন। এপস্টিনের আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব যে শুলিয়াকের জীবনপথকে আমূল বদলে দিয়েছিল, তা এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে শুলিয়াকের কাছে এপস্টিন ছিলেন সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ। ২০১২ সালে যখন এপস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ নতুন করে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, সেই সময়েও শুলিয়াক তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একটি ইমেলে তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি সব পুরুষের মধ্যে বিশুদ্ধতম।’ এই বক্তব্য আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়কর বলেই মনে করছেন অনেকেই।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামনে এসেছে। ফাঁস হওয়া একাধিক ইমেলে এপস্টিনকে প্রেমিকার প্রতি অভিযোগের সুরে কথা বলতে দেখা যায়। একটি ইমেলে তিনি লেখেন, ‘পর্যাপ্ত চুম্বন নেই, পর্যাপ্ত সময় নেই, পর্যাপ্ত যৌনতাও নেই।’ একই সঙ্গে তিনি শুলিয়াককে উপদেশের ভঙ্গিতে সতর্ক করে দেন, ‘অন্য মেয়েদের সঙ্গে আমায় দেখে হিংসা কোরো না।’ এই ইমেলগুলি থেকেই বোঝা যায়, সম্পর্কের ভিতরে ক্ষমতার অসমতা এবং মানসিক চাপ ক্রমশ বেড়ে উঠছিল। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হল, এপস্টিনের মৃত্যুর পর তাঁর বিপুল সম্পত্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুলিয়াকের হাতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ কোটি ডলার অর্থমূল্যের সম্পত্তির মালিকানা বর্তমানে তাঁর দখলে রয়েছে। এই বিষয়টি ঘিরে নতুন করে আইনি এবং নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এপস্টিনের আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং উইলের জটিল কাঠামো বুঝতে গেলে শুলিয়াকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এপস্টিন কাণ্ড এমনিতেই বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার অন্দরের অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। তার মধ্যেই কারিয়ানা শুলিয়াকের নাম প্রকাশ্যে আসা এই কাহিনিকে আরও এক স্তর জটিল করে তুলেছে। তিনি কি শুধুই এক প্রেমিকা, না কি এপস্টিনের ব্যক্তিগত ও আর্থিক জীবনের নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে মৃত্যুর আগে শেষ ফোন কলের তথ্য একথা স্পষ্ট করে দেয়, এপস্টিনের জীবনের শেষ অধ্যায়ে শুলিয়াক ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ। এই সব নতুন তথ্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাগুলির নজর যে ফের এপস্টিন ফাইলের দিকে ঘুরে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। কারিয়ানা শুলিয়াকের ভূমিকা এবং তাঁর হাতে থাকা সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। এপস্টিন রহস্য যে এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Epstein files, Anil Ambani Epstein link | এপস্টিন ফাইলে চাঞ্চল্য: ‘দীর্ঘাঙ্গী সুইডিশ সুন্দরী’র প্রস্তাব থেকে প্যারিস বৈঠকের ছক, অনিল আম্বানীর সঙ্গে যোগাযোগের নথি প্রকাশ্যে




