বসুধা চৌধুরী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ভারতের শিক্ষা ও নারীশক্তি আন্দোলনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। ‘এডুকেট গার্লস’ (Educate Girls) নামের ভারতীয় এনজিও প্রথমবারের মতো মর্যাদাপূর্ণ র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার অর্জন করে ইতিহাস তৈরি করল। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেফিনা হুসেন (Safeena Husain), তিনি সান ফ্রান্সিসকো থেকে ফিরে এসে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন।২০০৭ সালে রাজস্থানে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থার লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক গ্রামে স্কুলছুট মেয়েদের আবারও শিক্ষার মূল স্রোতে ফেরানো। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স (London School of Economics) থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর সেফিনা হুসেন ২০০৫ সালে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার অভাবে সমাজে যে বৈষম্য ও অবহেলা তৈরি হয়, তা দূর করার মূল হাতিয়ার কেবল শিক্ষাই।

প্রায় ১.১ মিলিয়নের বেশি মেয়ে আবার স্কুলে ফিরেছে এই সংস্থার উদ্যোগে, আর প্রায় ১ কোটি ৫৫ লক্ষ মানুষের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এনজিওটি শুধু মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানোই নয়, তা তাদের স্কুলে টিকে থাকার প্রক্রিয়া, সাংস্কৃতিক বাঁধা অতিক্রম, পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন, সবকিছুতে ভূমিকা রাখছে। “ভারতের প্রথম নন-প্রফিট সংগঠন হিসেবে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পাওয়া কেবল ‘এডুকেট গার্লস’-এর নয়, এটি সমগ্র দেশের গর্ব,” সংবাদসংস্থা পিটিআইকে (PTI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন সেফিনা হুসেন। তাঁর কথায়, “এই স্বীকৃতি গোটা বিশ্বকে ভারতের মেয়েদের শিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা জনগণের আন্দোলনের দিকে নজর দিতে বাধ্য করল। এটি শুরু হয়েছিল এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক কিশোরীর স্কুলে ফেরা দিয়ে, আর এখন এটি পুরো সমাজের মানসিকতা বদলে দিচ্ছে।”

সেফিনা হুসেনের ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনায় আসে। তাঁর স্বামী হ্যানসাল মেহতা (Hansal Mehta), খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি সামাজিক বিষয়ক একাধিক ছবির জন্য পরিচিত। র্যামন ম্যাগসেসে ফাউন্ডেশনের (RMAF) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এডুকেট গার্লসকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে “মেয়েদের শিক্ষা ও নারীশক্তির মাধ্যমে সমাজের গভীরে প্রোথিত কুসংস্কার ও ধ্যান-ধারণা ভাঙার অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য। তাদের কাজ কেবল অশিক্ষার শৃঙ্খলই শুধু ভাঙেনি, তা সাহস, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে তুলেছে অসংখ্য নারীকে।” সংস্থার অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল ২০১৫ সালে চালু করা বিশ্বের প্রথম ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্ট বন্ড (Development Impact Bond- DIB)। এই পরিকল্পনায় অর্থায়নকে সরাসরি ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাতে কার্যকর প্রমাণিত হলে তবেই বিনিয়োগকারীরা আয় পান। মাত্র ৫০টি পাইলট স্কুল থেকে শুরু করে আজ এটি ভারতের প্রায় ৩০,০০০ গ্রামে পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে ২০ লক্ষাধিক মেয়ে উপকৃত হয়েছে এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে টিকে আছে।
তাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হল ‘প্রগতি’ (Pragati), যা মূলত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের জন্য খোলা স্কুলিং প্রোগ্রাম। যারা নানা কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি, তারা আবারও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। মাত্র ৩০০ শিক্ষার্থী দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রোগ্রাম আজ ৩১,৫০০-রও বেশি অংশগ্রহণকারীর জীবন পরিবর্তন করেছে।সেফিনা হুসেনের কথায়, “শিক্ষা কেবল বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা হলো সাহস, স্বাধীনতা আর স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা। আমরা চাই প্রতিটি মেয়ে সমাজের বাঁধা পেরিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করুক।”
এই অর্জন ভারতকে বৈশ্বিক মানচিত্রে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। কারণ, এটি প্রমাণ করেছে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণের শক্তিই বড় পরিবর্তনের চালক হতে পারে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল রাজস্থানের অজপাড়াগাঁয়ে, তা আজ রূপ নিয়েছে একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে।
ছবি: সংগৃহীত




