সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ আমতা, হাওড়া: যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। চারিদিকের গ্রাম-গঞ্জ যেন জলমগ্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। আমতার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি আজ তলিয়ে আছে, আর এর জন্য দায়ী অতিবৃষ্টি ও দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের (Damodar Valley Corporation – DVC) জল ছাড়ার ঘটনা। ফলে হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কৃষকদের দাবি, পেটে টান পড়বে, কারণ চাষের জমি ধানসহ নানান সবজি ফসলের জন্য ব্যবহার হলেও তা এখন প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
সূত্রের খবর, আমতার ২ নম্বর ব্লকের খালনা (Khalna), জয়পুর (Joypur), আমড়াগড়ি (Amragari) ও ঝিকিরা (Jhikira)-সহ কয়েকটি গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, এই ব্লকের মোট ৮,৫০০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে প্রায় ৭,২৯০ হেক্টরই এখন জলের নিচে। স্থানীয়রা বলছেন, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে, কিন্তু তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে ডিভিসির জল ছাড়া।
এলাকার বিধায়ক সুকান্ত পাল সংবাদমাধ্যমকে জানান, “গত বছরের তুলনায় এই বছর ৭০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ডিভিসি সাধারণত দিনে ৪-৫ হাজার কিউসেক জল ছাড়ে, কিন্তু গত দু’মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কিউসেক। এর ফলে গ্রামের সুইলিস গেটগুলো খোলা যাচ্ছে না, জমি থেকে জল নামানোর উপায় বন্ধ হয়ে গেছে।” জলবন্দী এই কৃষিজমিতে চাষ হয় মূলত আমন ধান ও বিভিন্ন সবজিপাতি, যা শুধু স্থানীয় চাহিদাই মেটায় না, জেলার বাজারেও সরবরাহ হয়। ফলে দীর্ঘদিন জলবদ্ধ থাকলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে, আর তাতে প্রভাব পড়বে সরাসরি কৃষকদের জীবনে। স্থানীয় কৃষক বিনোদ মাইতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার চার বিঘে জমির সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। চাষ করতে এত খরচ করলাম, কিন্তু এখন সব জলে তলিয়ে আছে। কেউ কি আমাদের ক্ষতিপূরণ দেবে?”
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি দপ্তরের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেচ দপ্তরের তরফে পাম্প বসিয়ে দ্রুত জল নিষ্কাশনের পরিকল্পনা চলছে। বিধায়ক সুকান্ত পাল আরও জানান, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের শস্যবিমার আওতায় আনা হবে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে।” উল্লেখ্য, তবে কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, ক্ষতিপূরণ পেলেও ফসলের ক্ষতির যে পরিমাণ, তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। অনেকেই বলছেন, বারবার একই ঘটনা ঘটলেও এর স্থায়ী সমাধান হয় না। বর্ষাকালে ডিভিসির অতিরিক্ত জল ছাড়া ও সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে প্রায় প্রতি বছরই তাদের এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা থাকলে মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধানগাছ ৭-১০ দিনের বেশি জলে ডুবে থাকলে শিকড় পচে যায় ও গাছ মারা যায়। এছাড়া জল জমে থাকায় সবজি ফসলের ক্ষতি আরও দ্রুত হয়। তাই জরুরি ভিত্তিতে জল নিষ্কাশন না করলে ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। অনুদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় পঞ্চায়েত, ব্লক ও জেলা পর্যায়ের সমন্বয়ে জল সরানোর কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। কিন্তু কৃষকদের একাংশ বলছেন, প্রতিবার এমন প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবে কাজ শেষ হতে দেরি হয়, তখন পর্যন্ত ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
এখন গোটা আমতা ২ নম্বর ব্লকের কৃষকদের একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে যে, কীভাবে তারা এই ক্ষতির ধাক্কা সামলাবে? ডিভিসির জল ছাড়ার নীতি ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষকদের জীবিকা বাঁচাতে এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নইলে আগামী বছরেও একই চিত্র দেখতে হবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :




