শিবাশিস আঢ্য : রাজস্থানের যোধপুর (Jodhpur) শহর শুধু মেহরানগড় ফোর্ট (Mehrangarh Fort) শুধু নীল শহরের জন্য বিখ্যাত নয়, এখানকার অনন্য লোক উৎসবগুলিও বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্যটককে আকর্ষণ করে। সেইসব উৎসবের মধ্যে অন্যতম হল, ঢিঙ্গা গাওর মেলা (Dhinga Gawar Mela)। এই মেলাটি শুধু রঙের উৎসব নয়, নারীশক্তি, স্বাধীনতা ও সামাজিক বার্তারও প্রতীক হিসেবে স্থানীয় সমাজে চিহ্নিত। প্রতি বছর চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত এই মেলা যোধপুরের স্থানীয় নারীদের একটি বিশেষ ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত করে। কী সেই ঐতিহ্য?
এই উৎসবে কোনও পুরুষ দেবীর প্রতিমা বহন করেন না, শুধুমাত্র নারীরাই দেবীর আরাধনা থেকে শুরু করে প্রতিমা স্থাপন পর্যন্ত সব কাজ করেন। এটি ভারতের খুব কম সংখ্যক মেলার মধ্যে অন্যতম যেখানে নারীরাই প্রধান নিয়ামক। আবার ঢিঙ্গা গাওর মেলাকে কেন্দ্র করে আরও একাধিক মজার লোককথা প্রচলিত আছে। অনেকেই বলেন, দেবী গাওর আসলে রাজস্থানের মহারানীদের কাছে প্রেরণার উৎস। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই মেলায় নারীরা পুরুষদের লাঠি দিয়ে আঘাত করার মধ্য দিয়ে সামাজিক কৌতুক প্রকাশ করেন,যা প্রেম, বিয়ে আর সম্পর্ককে ঘিরে মজার ছলে বার্তাও দেওয়া হয়।
ঢিঙ্গা গাওর মেলা আসলে হিন্দু পুরাণের কিংবদন্তীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কথিত আছে, গাওর দেবী (Gawar Devi), তিনি মহাদেবের স্ত্রী পার্বতীর (Parvati) একটি রূপ হিসেবে পূজিত হন, তিনিই রাজস্থানের সমাজে নারীর শৌর্য ও সতীত্বের প্রতীক। কিন্তু এই মেলাকে ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লোককাহিনি হল, ‘ঢিঙ্গা’ শব্দের অর্থ। মারওয়ারি (Marwari) ভাষায় ‘ঢিঙ্গা’ মানে ইয়ার্কি, মজা বা ঠাট্টা। অর্থাৎ এই উৎসবটি দেবীর গাম্ভীর্যের সঙ্গে সঙ্গে হাস্যরস, আনন্দ এবং খেলার ছলকেও ধারণ করে।কেমন সেটি? জানা যায়, মেলার রাতে যোধপুরের নারীরা রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, গয়না আর কখনও পুরুষের সাজে নিজেকে সাজান। হাতে থাকে লাঠি বা বেত। রাতভর নারীরা শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ান। নাচেন। গান করেন এবং তাদের হাতে থাকা বেত দিয়ে পুরুষদের আঘাত করেন। এটিই মেলার মূল আকর্ষণ। মজার বিষয় হল, স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস, যে পুরুষ ওই রাতে বেতের আঘাত খান, তার দ্রুত বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই আচার আসলে বিবাহ-সংক্রান্ত আশীর্বাদের প্রতীকও।

ঢিঙ্গা গাওর মেলার অন্য বিশেষত্ব হল, এখানে নারীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ওঁরা শুধু দেবীর রূপ ধারণ করেন তা-ই না, পুরুষদের বশ করার এক সামাজিক প্রতীকমূলক রূপও ফুটিয়ে তোলেন। গ্রাম থেকে শহরের নারী, সব বয়সের মহিলাই অংশ নেন এই উৎসবে। কেউ রাজার সাজে, কেউ সাধুর সাজে, কেউ আবার ডাকাত বা পুলিশ অফিসারের রূপে হাজির হন। এই রূপবদল শুধু বিনোদন-ই নয়, তা নারীর বহুমুখী শক্তির প্রকাশ হিসেবেই গণ্য রাজস্থানে।
এক্ষেত্রে রাজস্থানের লোককাহিনি বলছে, একদা সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল গৃহকেন্দ্রিক। কিন্তু ঢিঙ্গা গাওর মেলার মতো উৎসব সমাজকে মনে করিয়ে দেয়, নারীরা শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন, তারাও সাহসী, স্বাধীন ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। যোধপুরের মানুষ আজও বিশ্বাস করেন এই মেলা আসলে নারীশক্তির জয় এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।

শুধু তা-ই নয়, মেলার সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় ১১টি প্রতিমা স্থাপন করা হয়, যা গাওর দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপের প্রতীক। নারীরা এই প্রতিমাকে পুজো করেন। এবং রাতভর চলে আনন্দ-উৎসব। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই উৎসবে কোনও পুরুষ দেবীর প্রতিমা বহন করেন না, শুধুমাত্র নারীরাই দেবীর আরাধনা থেকে শুরু করে প্রতিমা স্থাপন পর্যন্ত সব কাজ করেন। এটি ভারতের খুব কম সংখ্যক মেলার মধ্যে অন্যতম যেখানে নারীরাই প্রধান নিয়ামক। আবার ঢিঙ্গা গাওর মেলাকে কেন্দ্র করে আরও একাধিক মজার লোককথা প্রচলিত আছে। অনেকেই বলেন, দেবী গাওর আসলে রাজস্থানের মহারানীদের কাছে প্রেরণার উৎস। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই মেলায় নারীরা পুরুষদের লাঠি দিয়ে আঘাত করার মধ্য দিয়ে সামাজিক কৌতুক প্রকাশ করেন, যা প্রেম, বিয়ে আর সম্পর্ককে ঘিরে মজার ছলে বার্তাও দেওয়া হয়।
বর্তমান সময়ে এই উৎসব রাজস্থানের পর্যটন মানচিত্রে একটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বিশেষভাবে যোধপুর ভ্রমণের সময় মেলার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চান। রাজস্থানের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টও (Rajasthan Tourism Department) এখন ঢিঙ্গা গাওর মেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার করছে। বিশেষ করে যারা নারীসশক্তিকরণ, লোকসংস্কৃতি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় খুঁজে পান, ওঁদের কাছে এই মেলা অনন্য অভিজ্ঞতা। ঢিঙ্গা গাওর মেলা নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সামাজিক সমতার বার্তাও দেয়। এখানে নারী-পুরুষ উভয়েই মজা, হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দের মাধ্যমে সম্পর্ককে নতুনভাবে উপলব্ধি করেন। যদিও অনেক বাইরের মানুষ মেলাটিকে শুধু একটি লোকমেলা হিসেবে দেখেন, যোধপুরের বাসিন্দারা এটিকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই মনে করেন।
মারওয়ার অঞ্চলের প্রবীণরা বলেন, এই মেলার মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা আছে। দেবীকে হাস্যরসের মাধ্যমে পুজো করা হয়, যা অন্যত্র সচরাচর দেখা যায় না। দেবীর সঙ্গে মজার খেলা করেই আসলে নারীরা নিজের শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ভূমিকার বহুমাত্রিকতা তুলে ধরেন। আজকের দিনে যেখানে নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে নানা আলোচনার জন্ম হচ্ছে, সেখানে ঢিঙ্গা গাওর মেলা শতাব্দী প্রাচীন হলেও বারবার মনে করিয়ে দেয়, ভারতীয় সংস্কৃতির ভিতর থেকেই নারীশক্তি আর স্বনির্ভরতার ধারণা জন্ম নিয়েছিল। এটি কেবল যোধপুর নয়, গোটা ভারতের এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে মূল্যবান হয়ে উঠছে।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা




