সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে ফের নতুন করে আলোচনা শুরু হল সর্বোচ্চ আদালতে। ফাঁসির পরিবর্তে অন্য কোনও উপায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত কি না, সেই বিষয়টি বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাল কেন্দ্র। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই আইনি ও নৈতিক বিতর্ক চলছিল। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল কেন্দ্রের অবস্থান। বৃহস্পতিবার বিচারপতি বিক্রম নাথ (Justice Vikram Nath) এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতা-এর (Justice Sandeep Mehta) ডিভিশন বেঞ্চে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়। আদালতে কেন্দ্রের তরফে সওয়াল করেন অ্যাটর্নি জেনারেল আর বেঙ্কটরমণি (Attorney General R. Venkataramani)। তিনি স্পষ্ট জানান, ‘মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসির বদলে অন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় কি না, তা সরকার সর্বোচ্চ স্তরে খতিয়ে দেখছে।’ কেন্দ্রের এই বক্তব্যের পরেই নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে আইন মহলে।
আসলে মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি পরিবর্তনের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন একজন আইনজীবী। তাঁর দাবি, ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা একটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক পদ্ধতি। আদালতে সওয়াল করতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে যে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকারও অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ফাঁসির মতো পদ্ধতি নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।মামলাকারীর আরও বক্তব্য, বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যেই ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ করেছে। কোথাও প্রাণঘাতী ইনজেকশন, কোথাও আবার অন্য মানবিক বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতেও সেই পথ অনুসরণ করা যায় কি না, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি আদালতে জানান। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার অধিকার থাকলেও সেই শাস্তি যেন অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই মামলা নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই সুপ্রিম কোর্টে এর শুনানি চলছে। অতীতে একাধিক বার আদালত জানতে চেয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে কি না। এক পর্যায়ে মামলাকারী আইনজীবী আদালতকে জানান, অ্যাটর্নি জেনারেল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কেন্দ্র একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা ভাবছে। সেই ইঙ্গিতই এখন বাস্তব রূপ নিতে চলেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থান একেবারেই সরল নয়। প্রাণঘাতী ইনজেকশনকে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও অতীতে সংশয় প্রকাশ করেছে সরকার। গত বছরের অক্টোবরে এই সংক্রান্ত এক শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানায়, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ব্যবহার ‘খুব বেশি কার্যকরী’ নাও হতে পারে। প্রশাসনিক জটিলতা, চিকিৎসা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার কথাও তখন তুলে ধরা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি বদল করা শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, এটি গভীর ভাবে নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। এক দিকে যেমন মানবাধিকারের যুক্তি রয়েছে, তেমনই অন্য দিকে রয়েছে অপরাধের ভয়াবহতা ও সমাজে ন্যায়বিচারের বার্তা দেওয়ার বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন রায়ে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র ‘বিরলতম বিরল’ মামলাতেই দেওয়া উচিত। কিন্তু সেই মৃত্যুদণ্ড কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়েই এখন নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, ভারতীয় দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধিতে এখনও পর্যন্ত ফাঁসির মাধ্যমেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলা আছে। সেই আইনি কাঠামো বদলাতে হলে সংসদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ফলে সুপ্রিম কোর্টে চলা এই মামলার রায় বা পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে আইন সংশোধনের পথ প্রশস্ত করতে পারে বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
অন্য দিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশ দীর্ঘ দিন ধরেই মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের মতে, কোনও রাষ্ট্রেরই নাগরিকের প্রাণ নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত নয়। যদিও এই মামলায় সেই চরম অবস্থান নেওয়া হয়নি, তবু মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা ভারতের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে। তবে, ফাঁসির পরিবর্তে বিকল্প মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি নিয়ে কেন্দ্রের এই অবস্থান সুপ্রিম কোর্টে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলেই মনে করা হচ্ছে। সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, এবং আদালত এই বিষয়ে কী দিকনির্দেশ দেয়, তার দিকে তাকিয়ে গোটা দেশ। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু আইন নয়, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ধারণাকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal elections, BJP strategy | বিধানসভা ভোটের আগে আরএসএস-ভিত্তিক বিজেপি কৌশল: রাজ্য ও কেন্দ্রের যৌথ বৈঠক




