সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বঙ্গোপসাগরের ওপর ঘনীভূত নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে চলেছে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (IMD) জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মন্থা’ (Cyclone Mantha)। এটি আগামী ২৮ অক্টোবর রাতের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) উপকূলে আঘাত হানতে পারে। সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার, যা কখনও কখনও ১১০ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শনিবারের (২৫ অক্টোবর) নিম্নচাপটি দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর থেকে পশ্চিম দিকে সরেছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় এটি গভীর নিম্নচাপ ও পরে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে।
হাওয়া অফিস সূত্রে খবর, প্রাথমিকভাবে ২৬ অক্টোবর নাগাদ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে এবং ২৭ অক্টোবর সকাল নাগাদ দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপরে অবস্থান করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ২৮ অক্টোবর রাতে এটি কাকিনাড়া (Kakinada) উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। এদিকে, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা কমিটি (NCMC) জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন (T. V. Somanathan)। তামিলনাড়ু (Tamil Nadu), অন্ধ্রপ্রদেশ, পুদুচেরি (Puducherry) এবং ওড়িশা (Odisha)-এর মুখ্য সচিব ও প্রশাসনিক কর্তারা ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য প্রভাব এবং তার মোকাবিলায় গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করেছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে। উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন ব্লকে ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার ও পানীয় জল মজুত রাখা হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম (Visakhapatnam) জেলার কালেক্টর এম.এন. হরেন্দ্র প্রসাদ (M. N. Harendra Prasad) বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই জেলা কালেক্টরেটে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছি। নাগরিকরা ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত যে কোনও সমস্যায় ০৮৯১-২৫৯০১০২ বা ০৮৯১-২৫৯০১০০ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।” তিনি আরও জানান, “কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা শিফট ভিত্তিতে কাজ করবেন, যাতে মানুষের কোনও অসুবিধা না হয়।”
একইভাবে, এএসআর জেলার কালেক্টর এ.এস. দীনেশ কুমার (A. S. Dinesh Kumar) সমস্ত মন্ডলে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জরুরি প্রতিক্রিয়া সমন্বয় রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনও রাস্তা বা সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে মেরামতির ব্যবস্থা নিতে হবে।” কালেক্টর আরও নির্দেশ দেন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, স্কুল ভবন, খড়ের তৈরি ঘরগুলো বিশেষ নজরে রাখতে হবে, কারণ সেগুলো ঝড়ে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “গর্ভবতী মহিলা, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষ যত্নে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।”
এদিকে, আনাকাপল্লি (Anakapalli) জেলার কালেক্টর বিজয়া কৃষ্ণান (Vijaya Krishnan) চিকিৎসা কর্মীদের সমস্ত ছুটি বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের আগে কোনও রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিক্যাল টিমকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে।” আবহাওয়া দপ্তর নাগরিকদের উপকূলবর্তী এলাকায় মাছ ধরতে নিষেধ করেছে। মৎস্যজীবীদের এখনই গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই বহু নৌকা উপকূলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন উপকূলবর্তী জেলায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। কাকিনাড়া, বিশাখাপত্তনম, গুন্টুর, কৃষ্ণা ও নেল্লোর অঞ্চলে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) ও রাজ্য বিপর্যয় দমন বাহিনী (SDRF) মোতায়েন করা হয়েছে। স্কুল-কলেজগুলিতেও ছুটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে সূত্রে জানা গেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ‘মন্থা’ যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী গতি ধরে রাখে, তবে এটি ২০২৫ সালের প্রথম প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উপকূলে আঘাত হানবে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এই ঘূর্ণিঝড়ের গতি ও বিস্তার দুটোই তুলনামূলকভাবে বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া নতুন নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ঘূর্ণিঝড়গুলির তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধিই এর অন্যতম কারণ।
অন্ধ্রপ্রদেশ প্রশাসন জানিয়েছে, “আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশ মেনে চলার অনুরোধ জানাচ্ছি।” উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে, দক্ষিণ ও মধ্য বঙ্গোপসাগরে বিশাল মেঘের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়া দফতর উপকূলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে, কারণ আগামী ২৪ ঘণ্টায় প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




