Chanchal Kali, Kolkata Mystery Temple | চেতলা কালী মন্দির : দেবীর চঞ্চলতা নাকি ইতিহাসের দাগ?

SHARE:

দক্ষিণ কলকাতার চেতলার রহস্যময় ডাকাত কালী মন্দিরে মা কালীকে লোহার শিকলে বাঁধা হয়। জানুন এই মন্দিরের পিছনের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং রহস্যের কাহিনি।

জয়ন্ত গড়াই : দক্ষিণ কলকাতার চেতলা (Chetla) বাজারের গলি ঘেঁষে হঠাৎই দেখা মেলে এক আশ্চর্য কালী মন্দিরের (Kali Temple)। দেখতে একেবারে সাধারণ, তবে তার ভেতরে রয়েছে এক রহস্যঘন ঐতিহ্য, যাকে ঘিরে লোকের মুখে মুখে গল্প মা কালীকে (Goddess Kali) এখানে মোটা লোহার শিকলে বাঁধা। কারণ? লোকবিশ্বাস বলে, এখানকার মা কালী নাকি চঞ্চল প্রকৃতির। তিনি নাকি মাঝেমধ্যেই মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন ভক্তদের বাড়ি বা অজানা গন্তব্যে। তাই দেবীর গলায় ও শরীর জুড়ে বাঁধা আছে লোহার মোটা শিকল।

চেতলার এই ‘ডাকাত কালী মন্দির’ (Dakat Kali Mandir) ঘিরে যে শুধু ধর্মবিশ্বাস নয়, রয়েছে ইতিহাস আর লোককাহিনির মিশ্র ককটেল। এ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল কিংবা প্রতিষ্ঠাতার নাম আজও অজানা। কিন্তু নামেই তার পরিচয়, ‘ডাকাত কালী’। বহু মানুষ মনে করেন, মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তারকেশ্বর অঞ্চলের কুখ্যাত দুই ডাকাত নীলু ও ভুলু। তাঁরা নাকি এককালে এই মন্দিরে মা কালীর আরাধনা করতেন, আর মা কালী ছিলেন তাঁদের ‘ইষ্টদেবী’। কথিত আছে, তাঁরা নাকি কোনও এক সময় মা-রূপে সারদা দেবীকে (Sarada Devi) বন্দী করেছিলেন, পরে তাঁর মধ্যে দেবীর মহিমা উপলব্ধি করে ছেড়ে দেন।

গল্প অনুযায়ী, সারদা দেবী একবার তারকেশ্বর (Tarakeshwar) যাচ্ছিলেন। পথে তাঁকে অপহরণ করে চেতলায় নিয়ে আসেন নীলু ও ভুলু। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল লুঠ, কিন্তু সারদা দেবীর মুখমণ্ডলে, আচরণে এমন এক দেবীত্বের আভাস মেলে যে তাঁরা বিস্মিত হন। তাঁদের মনে হয়, এ যে মা কালী স্বয়ং। অবশেষে তাঁরা সারদা দেবীকে মুক্তি দেন। এবং সেই ঘটনা থেকেই চেতলার এই স্থানে জন্ম নেয় ‘ডাকাত কালী’ মন্দির। এই কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই ঠিকই, কিন্তু লোককথার এমন ক্ষমতা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশ্বাসকে রূপ দেয় সংস্কৃতিতে। মন্দিরটি আজও প্রাচীন ধাঁচে টিকে আছে। চুনকাম করা দেয়াল, রঙচটা কাঠের দরজা, আর সর্বোপরি দেবীর সেই শিকল বাঁধা রূপ যেন বিংশ শতকের কোনও সিনেমার দৃশ্য।

চেতলার এই কালীমন্দির শুধু রহস্যের কেন্দ্র নয়, এটি স্থানীয় মানুষদের কাছে এক গভীর আবেগের স্থান। বহু ভক্ত নিয়মিত পুজো দিতে আসেন। কেউ আসে পরীক্ষার আগে আশীর্বাদ নিতে, কেউ আসে সংসার সুখের প্রার্থনায়। অনেকেই বলেন, ‘‘মা এখানে খুব জাগ্রত। যে যা চায়, মা তা দেন।’’ এই মন্দিরের চমক শুধু তার রহস্য নয়, তার অবস্থানও খুবই সহজলভ্য। চেতলা হাট সংলগ্ন এই মন্দিরে আসতে চাইলে আপনি কালীঘাট (Kalighat) মেট্রো স্টেশনে নেমে অটোতে পৌঁছে যেতে পারেন। অথবা রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে (Rashbehari Avenue) গড়িয়াগামী বাসে নেমে চেতলা হাট অবধি অটো নিলেই হবে। মন্দিরটি সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য প্রতিদিন খোলা থাকে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

এই জায়গাটি স্থানীয়দের কাছে শুধুই ধর্মীয় স্থান নয়, এটি ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর সাহসী কিছু কল্পনার মিশ্রণে তৈরি এক অলৌকিক জগৎ। বিশেষত নতুন প্রজন্ম, যারা শহরের বুকে আধুনিকতায় ডুবে, তাদের জন্য এই ধরনের লোকগাথা এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।এমন মন্দির যেখানে দেবীকেই বাঁধা হয়, সেখানে প্রশ্ন জাগে, এ কি ঈশ্বরকে ভয়? না ঈশ্বরের উপস্থিতির অতিরিক্ত বিশ্বাস? উত্তর হয়ত লুকিয়ে আছে সময়ের ধুলোয় ঢাকা লোককাহিনিতে, যা আজও চেতলার মাটিতে শিকল দিয়ে বাঁধা পড়ে আছে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shankar Chakraborty, Bengali celebrity news | শঙ্কর চক্রবর্তীর জীবনের লড়াই ও সোনালির ভালবাসা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment