১৯৩১ সালের জনগণনা রিপোর্টে বলা হয়, গর্ভধারণ, শিশু জন্ম ও চিকিৎসার অভাবের কারণে অধিকাংশ মহিলা উচ্চবর্ণ সমাজে প্রজনন বয়সে বেশি মৃত্যুর মুখে পড়তেন। অথচ পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সামাজিক কাঠামো নারীদের তুলনামূলকভাবে বেশি স্বীকৃতি দিয়েছিল। অথবা অন্তত তাঁদের লুকিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল কম।আদিবাসীদের মধ্যে এমনকি ০-১ বছর বয়স পর্যন্ত লিঙ্গ অনুপাত ছিল ১,০৪৫, যা সবার চেয়ে বেশি। আর সার্বিক অনুপাতে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর চিত্রও ছিল চিন্তাজনক। লিখেছেন : দেবব্রত সরকার

১৯৩১ সালের জনগণনার (Census 1931) একটি বিস্ময়কর দিক ছিল হিন্দু সমাজে যত উঁচু জাত, তত কম মেয়ের সংখ্যা। অর্থাৎ সামাজিক কাঠামোয় যারা উচ্চস্থানে, তারা লিঙ্গ অনুপাতে (sex ratio) পিছিয়ে ছিল। আর পিছনের সারিতে থাকা ‘দলিত’ (Dalit) ও ‘আদিবাসী’ (Tribal) সমাজে মেয়েদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।একটি যুগান্তকারী সমীক্ষা জানায়, উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মধ্যে প্রতি ১০০০ পুরুষে মহিলার সংখ্যা ছিল ৮৭৮ (Bombay state)। অন্যদিকে ‘ডিপ্রেসড ক্লাস’ (Depressed Classes) বা দলিতদের মধ্যে এই অনুপাত ছিল ৯৮২। এমনকি ‘আদিবাসীদের’ মধ্যে অনুপাত পৌঁছেছিল ৯৫৬। এই বৈষম্যের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে ‘পর্দা প্রথা’, যা উচ্চবর্ণ হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে নারীগণনার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছিল। তবে জনগণনার আধিকারিকদের মতে, এটি
লিঙ্গ অনুপাতে শুধুমাত্র সামান্য তারতম্য ঘটাতে পারে, বড় পার্থক্যের জন্য দায়ি ছিল সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তৎকালীন বিহার ও উড়িষ্যা (Bihar and Orissa) রাজ্যের ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রতি ১,০০০ পুরুষে নারী ছিল ৯৬৪, কিন্তু হরিজন (Hari caste-scavenger Dalits) সম্প্রদায়ে এই অনুপাত ছিল ১,০০৯। আবার মধ্যপ্রদেশ (Central Provinces) অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের অনুপাত ৮৬৩, অথচ কলার (Kalar) জাতির মধ্যে ছিল ১,০১৭ ও ঘাসিয়া (Ghasia) সম্প্রদায়ে ১,১১৭।
বর্তমানে যখন কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৭ সালে জাতি-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ জনগণনার (Caste Census) পরিকল্পনা করছে, তখন ১৯৩১ সালের এই ইতিহাস আমাদের সামনে এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। জাতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও লিঙ্গ সমতার বাস্তব চিত্র নির্ধারণে এই ধরণের বিশ্লেষণ হতে পারে আগামী দিনের সামাজিক নীতির ভিত্তিপ্রস্তর।
এই অসাম্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৯৩১ সালের জনগণনা রিপোর্টে বলা হয়, গর্ভধারণ, শিশু জন্ম ও চিকিৎসার অভাবের কারণে অধিকাংশ মহিলা উচ্চবর্ণ সমাজে প্রজনন বয়সে বেশি মৃত্যুর মুখে পড়তেন। অথচ পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সামাজিক কাঠামো নারীদের তুলনামূলকভাবে বেশি স্বীকৃতি দিয়েছিল। অথবা অন্তত তাঁদের লুকিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল কম।আদিবাসীদের মধ্যে এমনকি ০-১ বছর বয়স পর্যন্ত লিঙ্গ অনুপাত ছিল ১,০৪৫, যা সবার চেয়ে বেশি। আর সার্বিক অনুপাতে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর চিত্রও ছিল চিন্তাজনক। হিন্দুদের ক্ষেত্রে ৯৪১, মুসলিমদের (Muslims) ৯০৪, শিখদের (Sikhs) ৭৮৪, খ্রিস্টানদের (Christians) ৯৫২, আর আদিবাসীদের ক্ষেত্রে ছিল ১,০০৯। শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, ৫-১০ বছর বয়সে মেয়েদের মৃত্যুহার ছেলেদের তুলনায় বেশি। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, নারী শিশুদের প্রতি যত্নের ঘাটতি, অপুষ্টি ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “শুধু ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সেই মহিলাদের মৃত্যুহার পুরুষদের চেয়ে কিছুটা কম। বাকি সব বয়সে তা বেশি।” চোখে পড়ার মতো এক তথ্য উঠে আসে ছোট নাগপুর (Chhota Nagpur) ও মাদ্রাজ (Madras) অঞ্চলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে। সেখানে মেয়েদের অনুপাত বেশি থাকার কারণ হিসেবে রিপোর্টে অনুমান করা হয়, চা বাগানে কাজ করতে পুরুষরা আসাম (Assam) চলে যাওয়ায় মহিলারা গ্রামে থেকে গিয়েছিলেন। পুরুষ-প্রধান শ্রম অভিবাসনের কারণে এই অঞ্চলে নারীদের অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায় প্রসঙ্গত, বর্তমানে যখন কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৭ সালে জাতি-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ জনগণনার (Caste Census) পরিকল্পনা করছে, তখন ১৯৩১ সালের এই ইতিহাস আমাদের সামনে এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। জাতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও লিঙ্গ সমতার বাস্তব চিত্র নির্ধারণে এই ধরণের বিশ্লেষণ হতে পারে আগামী দিনের সামাজিক নীতির ভিত্তিপ্রস্তর। কারণ, ১৯৩১-এর পর প্রায় এক শতক কেটে গেলেও লিঙ্গবৈষম্য, জাতিবৈষম্য ও নারীর মর্যাদা নিয়ে ভারতের সমাজে আজও বহু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতেই হবে সেই প্রথম ও শেষ ‘জাতি জনগণনার’ পৃষ্ঠাগুলোর দিকে। যেখানে ‘উঁচু’ নয়, ‘নিচু’ তকমা পাওয়া সমাজই দেখিয়েছিল মানবিকতা ও সমতার ব্যতিক্রমী ছবি।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




