সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই: যখন গোটা দেশ হিন্দি ভাষার আগ্রাসন এবং জাতীয় শিক্ষানীতিকে (NEP) ঘিরে দ্বিধাবিভক্ত, ঠিক তখনই একটি শান্ত অথচ শক্তিশালী বার্তা এল দেশের প্রধান বিচারপতি ড. বি আর গাভাই (B R Gavai)-এর কাছ থেকে। মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে তাঁর আবেগঘন বক্তব্য জাতীয় ভাষানীতির বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রবিবার, মুম্বাইয়ের একটি মারাঠি মাধ্যম স্কুল, যেখানে তিনি ছোটবেলায় পড়তেন, সেখানে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে গাভাই বলেন, “মাতৃভাষা জীবনে মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।” তাঁর এই বক্তব্য এখন সামাজিক এবং রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।
গভীর আবেগে ভাসা এই বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি গাভাই তুলে ধরেন তাঁর শৈশবের স্মৃতি, শিক্ষাজীবনের ভিত্তি ও স্কুলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। তাঁর কথায়, “আজ আমি যে পদে রয়েছি, তার নেপথ্যে আমার শিক্ষকদের ও এই স্কুলের অবদান অনস্বীকার্য। স্কুল থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও মূল্যবোধ আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। স্কুল থেকেই শুরু হয়েছিল আমার জীবনের যাত্রা।” তিনি আরও বলেন, “স্কুলের প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে আমি আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছি।” মাতৃভাষায় পড়াশোনা জীবনের গভীর স্তরে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, সে কথাই তিনি ফের মনে করিয়ে দেন। বিচারপতির মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করলে শুধু ধারণাগত স্পষ্টতাই শুধু আসে না, তা নৈতিক চরিত্র গঠনের পথও প্রশস্ত করে। “মাতৃভাষায় পড়াশোনা কেবল ধারণাগত স্বচ্ছতাই বৃদ্ধি করে না, বরং জীবনে মূল্যবোধও গড়ে তুলতে সাহায্য করে,” বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য এমন এক সময় এল, যখন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে হিন্দি ভাষার প্রসারে জোর দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় হিন্দিকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া এবং তা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা দক্ষিণ ভারতের বেশ ক’য়েকটি রাজ্যের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্ণাটকের নেতারা এই উদ্যোগকে ‘ভাষা আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য শুধুই একটি আবেগঘন স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি নীতিগত অবস্থানও বটে। কারণ, দেশের উচ্চতম বিচারপতির কণ্ঠে মাতৃভাষার মাহাত্ম্য জাতীয় ভাষানীতির মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলেও, তা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে আনে।শুধু বিচারপতি গাভাই নন, আগেও বহু বিদ্বজ্জন এবং শিক্ষাবিদ ভারতীয় শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করলে শিশুরা সহজে জ্ঞান আত্মস্থ করতে পারে, এবং সেই শিক্ষা জীবনের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি করে।
সাম্প্রতিককালে ইউনেস্কোও একাধিক প্রতিবেদনে মাতৃভাষার শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার বলে চিহ্নিত করেছে। তাঁদের ভাষায়, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বাহক। গাভাইয়ের (Gavai) বক্তব্য সেই আন্তর্জাতিক বক্তব্যের সঙ্গেও সুর মিলিয়েছে। তাঁর নিজের জীবনেও মাতৃভাষার প্রভাব কতটা গভীর, তা বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, একটি ভাষা শুধু তার ব্যাকরণ দিয়ে নয়, হৃদয়ের ভিতর থেকে ওঠে।আইনজীবী মহলেও প্রধান বিচারপতির মন্তব্যকে স্বাগত জানানো হয়েছে। সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিব্বল (Kapil Sibal) বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভাষা নীতিকে রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে, তার শিকড়ে ফিরে যাওয়াই উচিত।” নাগরিক সমাজ ও শিক্ষানীতির বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, এই মন্তব্য শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন আলোচনার দ্বার খুলে দেবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, তাঁদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের। প্রসঙ্গত, দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির কণ্ঠে মাতৃভাষার এমন প্রশস্তি কেবল একক ব্যক্তি অভিজ্ঞতাই নয়, তা ভারতীয় সমাজের বহুস্তরীয় ভাষাচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Human-Elephant Conflict | ঝাড়গ্রামে ‘রামলাল’-এর সঙ্গে মারাত্মক কাণ্ড!




