পূর্বা মুখোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : পাখির ঝাঁক যখন দিনের শেষে বিদ্যুতের তারে বসে বিশ্রাম নেয়, তখন অনেকেই বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন অথচ কেউ প্রশ্ন করে না, কীভাবে এই পাখিরা হাজার হাজার ভোল্টেজ বইছে এমন তারে বসেও প্রাণে বাঁচে? অন্যদিকে, যদি কোনও মানুষ ভুল করে সেই তার ছোঁয়, মুহূর্তেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাহলে পাখিরা কি কোনও বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়? নাকি এর পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
বৈদ্যুতিক তারের আশেপাশে ছোটবেলা থেকেই ঘোর নিষেধাজ্ঞা থাকে। অভিভাবকরা বারবার সতর্ক করেন, বিদ্যুতের তারে হাত দিস না! কিন্তু একই সঙ্গে একটা চেনা দৃশ্য হল, বৈদ্যুতিক তারে সারি সারি পাখি বসে আছে, আর তাতে কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। এই বিভ্রান্তির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের জানতে হবে “ভোল্টেজ ডিফারেন্স” বা “পটেনশিয়াল ডিফারেন্স” সম্পর্কে। ফিজিক্সের এই মৌলিক ধারণাটিই আসলে ব্যাখ্যা করে দেয় কেন পাখিরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় না।
একটি তারে একই ভোল্টেজে দুই পা রাখলে কী হয়?
পাখিরা যখন একটি মাত্র বিদ্যুতের তারে বসে, তখন তাদের দুই পা একই ভোল্টেজে থাকে। অর্থাৎ, তাদের শরীরের কোনও অংশেই ভোল্টেজের তারতম্য থাকে না। ফলে পাখির শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ বইতে পারে না। এর কারণ হল, বিদ্যুতের প্রবাহ ঘটার জন্য দরকার দুটি আলাদা পয়েন্টের মধ্যে ভোল্টেজ পার্থক্য। যখন সেই পার্থক্য থাকে না, তখন কোনও বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় না, এবং তাই কোনও শক লাগে না।
Read | Sex : নীরব চাহিদা, গভীর প্রভাব : যৌনতা কি শুধুই শারীরিক? না করলে কি থেমে যায় জীবনের এক দিক?
বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী ড. মণিকুণ্ডু ভট্টাচার্য (Dr. Monikundu Bhattacharya) বলছেন, “পাখিরা সাধারণত একটি তারের উপরে বসে থাকে, অর্থাৎ তারা সার্কিট সম্পূর্ণ করে না। তাদের শরীরের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার কোনও রাস্তাই তৈরি হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, তারা মাটির সঙ্গে যুক্ত নয়। মাটি হচ্ছে শূন্য ভোল্টেজের জায়গা। মানুষ যখন বিদ্যুতের তার স্পর্শ করে, তখন উচ্চ ভোল্টেজ থেকে মাটির শূন্য ভোল্টেজের দিকে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়। সেটাই প্রাণঘাতী।” অন্যদিকে, পাখিরা হালকা ওজনের, ছোট শরীরের এবং দুর্বল কন্ডাক্টর। অর্থাৎ, বিদ্যুতের তুলনায় তাদের শরীর দিয়ে খুবই সামান্য বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, যেটা শরীরের কোনও ক্ষতি করে না।
পাখিরা কখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারে?
সবসময় যে পাখিরা নিরাপদ থাকে তা নয়। বিদ্যুৎ প্রকৌশলী রজত নন্দী জানান, “যদি কোনও পাখি একই সঙ্গে দু’টি ভিন্ন ভোল্টেজের তার বা একটি বিদ্যুৎবাহী তার এবং একটি মাটির সংস্পর্শে থাকা বস্তু, যেমন ট্রান্সফরমার বা বৈদ্যুতিক খুঁটি স্পর্শ করে, তখন তারা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে। কারণ তখন সার্কিট সম্পূর্ণ হয়ে যায় ও বিদ্যুৎ তাদের শরীরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।” প্রকৃতপক্ষে, বড় পাখি যেমন শকুন বা পেঁচা, যাদের ডানার ফাঁক অনেক বেশি, তারা যদি ভুল করে একসঙ্গে দু’টি তার স্পর্শ করে ফেলে, তাহলেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে।
মানুষ কেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়?
মানুষের ক্ষেত্রে বিপদ আরও বেশি, কারণ আমরা সাধারণত বিদ্যুতের তার স্পর্শ করি মাটি ছুঁয়ে। ফলে শরীর দিয়ে ভোল্টেজের পার্থক্য তৈরি হয় এবং উচ্চ ভোল্টেজ থেকে নিম্ন ভোল্টেজে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়। আর এতেই মৃত্যু ঘটে। পাখির বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে শুদ্ধ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। অতএব, পাখিরা কোনও জাদু দিয়ে বিদ্যুতের তারে বসে থাকে না, তাদের নিরাপত্তার পিছনে রয়েছে বিশুদ্ধ পদার্থবিদ্যার ব্যাখ্যা। তারা কোনও সার্কিট সম্পূর্ণ করে না, একই ভোল্টেজে থাকে, দুর্বল কন্ডাক্টর, আর মাটি থেকে আলাদা থাকে, এই চারটি কারণই তাদের নিরাপদ রাখে।কিন্তু, এতসব জেনেও যদি কোনও শিশু বৈদ্যুতিক তারে পাখিদের বসে থাকতে দেখে নিজেরাও সাহস পেয়ে সেই তারে হাত দেয়, তবে ঘটনা মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। তাই এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানাও যেমন দরকার, ঠিক তেমনি সতর্কতাও নেওয়া জরুরি।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Why birds fly in a V formation | পাখিরা V-আকৃতিতে কেন ওড়ে? প্রকৃতির এক অপূর্ব রহস্য




