জয়ী বিশ্বাস ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : উপোস আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চার এক অঙ্গ হলেও আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এর রয়েছে একাধিক স্বাস্থ্যকর উপকারিতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুজো বা আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও নিয়মিত উপোস করলে শরীর ও মনের নানা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। একটানা ৭২ ঘণ্টার উপোস শরীরকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে এগোনো।

পুষ্টিবিদ (Nutritionist) অনন্যা ভট্টাচার্য জানান, ‘‘উপোস শুরু করার আগে শরীরকে প্রস্তুত করতে হয়। হঠাৎ করে খাবার বন্ধ করা শরীরের জন্য ধাক্কা হতে পারে। তাই কয়েক দিন আগে থেকেই খাবারের পরিমাণ কমানো উচিত।’’ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, উপোস চলাকালীন শুধুমাত্র জল, নুন-চিনির শরবত বা একেবারে হালকা তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত। এই সময় শরীরচর্চা একেবারেই না করাই ভাল।

৭২ ঘণ্টায় শরীরে কী ঘটে?
শরীর যখন দীর্ঘ সময় খাবার পায় না, তখন প্রথমে গ্লাইকোজেন ভেঙে শক্তি সংগ্রহ করে। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর থেকেই শরীর কিটোন তৈরি করতে শুরু করে। এই কিটোনই তখন মস্তিষ্কের প্রধান শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিটোনের মাত্রা সর্বাধিক হয়, আর সেই সঙ্গে শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট ঝরতে থাকে। চিকিৎসক অরিন্দম সেনগুপ্ত বললেন, ‘‘তিন দিনের উপোসে শরীর নিজের ফ্যাট ভাঙতে শুরু করে। এর ফলে ওজন কমে এবং বিপাকক্রিয়া (Metabolism) আরও সক্রিয় হয়।’’
ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি: উপোস করলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা অনেকের জন্য এটি কার্যকরী হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ উপোস করা উচিত নয়।

প্রদাহ কমে, সুস্থ থাকে হৃদযন্ত্র : দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে উপোসের প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে থাকলে হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও কমে যায়। কার্ডিওলজিস্ট (Cardiologist) ডা. সুমন নন্দী বলেন, ‘‘নিয়মিত উপোস হৃদযন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ। রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমে আসে, যা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।’’

গ্রোথ হরমোন ও শক্তি বৃদ্ধি : উপোসের সময় দেহে গ্রোথ হরমোনের ক্ষরণ প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর ফলে পেশি শক্তিশালী হয়, বিপাকক্রিয়া উন্নত হয় এবং শরীর অতিরিক্ত চর্বি দ্রুত পোড়াতে সক্ষম হয়। খেলোয়াড় ও ফিটনেস সচেতন মানুষদের জন্য উপোস তাই ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কোষ পুনর্গঠন ও দীর্ঘায়ু: উপোসের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো কোষ পুনর্গঠন। যখন শরীর পর্যাপ্ত খাবার পায় না, তখন পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ভেঙে নতুন কোষ তৈরি হয়। এর ফলে বার্ধক্য বিলম্বিত হয় এবং আয়ুও বেড়ে যায়। গবেষকরা বলছেন, নিয়মিত উপোস জীবনকালকে সুস্থ ও দীর্ঘ করার সম্ভাবনা রাখে।

সঠিকভাবে উপোস ভাঙা জরুরি : ৭২ ঘণ্টার উপোস শেষে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবার শুরু করা উচিত। অল্প করে তরল ও হালকা খাবার থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরতে হবে। নাহলে হজমের সমস্যা ও শরীরের উপর চাপ পড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, উপোস শুধুই ধর্মীয় প্রথা নয়, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত জীবনধারার অংশ। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সতর্কতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ। সঠিক নিয়মে করা উপোস শরীরকে শুধু হালকা ও শক্তিশালী করে না, মনকেও করে প্রশান্ত ও সক্রিয়।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Dhakai parota, Kolkata street food | ঢাকাই পরোটা, হারাতে বসা কলকাতার খাবারের সুস্বাদু ঐতিহ্য




