সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ, কলকাতা : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে যখন গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখন এক নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, বিসিসিআই (Board of Control for Cricket in India)। পুরুষ দলের বিশ্বজয়ের পর বোর্ড ঘোষণা করেছিল ১২৫ কোটি টাকার পুরস্কার। কিন্তু নারী দলের একই কৃতিত্বের পর পুরস্কারমূল্য দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরুষদের পুরস্কারের অর্ধেকেরও কম! বিষয়টি সামনে আসতেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। রবিবার বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া (Debajit Saikia) জানান, নারী ক্রিকেটারদের অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ গোটা দলের জন্য ৫১ কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “এই জয় কেবল ক্রিকেটের নয়, নারী শক্তির জয়। আমরা তাঁদের জন্য গর্বিত।” তবে ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে, যখন রোহিত শর্মার দল (Rohit Sharma-led Team India) পেয়েছিল ১২৫ কোটি, তখন হরমনপ্রীত কৌরদের (Harmanpreet Kaur) এত কম পুরস্কার কেন?
২০১৭ সালের লর্ডস ফাইনাল ছিল ভারতের মেয়েদের ক্রিকেটের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তখন ৯ রানে হেরে গিয়েছিল ভারত। সেবার প্রত্যেক ক্রিকেটারকে ৫০ লক্ষ টাকা করে পুরস্কৃত করেছিল বোর্ড। ৮ বছর পর সেই স্বপ্নপূরণ হলো। এবার ঘরের মাঠে বিশ্বজয় করল ভারতীয় নারী দল। কিন্তু পুরস্কারমূল্যের ফারাক যেন সেই পুরনো অসমতা আরও উজ্জ্বল করে তুলল।ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থের নয়, মানসিকতারও প্রতিফলন। নারী ক্রিকেটকে যে এখনও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না, এই ঘোষণা যেন তা প্রমাণ করল আরও একবার। ক্রিকেট বিশ্লেষক বিস্বনাথ মজুমদার (Biswanath Majumdar) বলেন, “বিসিসিআই আজ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। তারা চাইলে সহজেই সমান পুরস্কার দিতে পারত। এটা কেবল অর্থ নয়, সম্মানের বিষয়। নারী ক্রিকেটাররা পুরুষদের মতোই পরিশ্রম করেন, তাঁদের কৃতিত্বও বিশ্বজোড়া।” অন্যদিকে আইসিসি (ICC) এখন নারী ক্রিকেটের পুরস্কারমূল্য ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া (Australia) পেয়েছিল ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আর ২০২৪-এ ভারতীয় দল পেয়েছে ৩৭.৩ কোটি টাকা, যা আগের বার থেকে প্রায় ২৩৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল নারী ক্রিকেটে সমতার পথে হাঁটছে, কিন্তু ভারতীয় বোর্ড এখনও সেখানে পৌঁছয়নি।
প্রাক্তন মহিলা ক্রিকেটার অনজু জৈন (Anju Jain) বলেছেন, “রোহিতদের ১২৫ কোটি, আর হরমনদের ৫১ কোটি, এই পার্থক্য কেবল টাকার নয়, এটি মানসিকতার পার্থক্য। নারী ক্রিকেটারদের এখন সময় এসেছে নিজেদের জন্য সমান মর্যাদা দাবি করার।” বিসিসিআই অবশ্য দাবি করছে, এই পুরস্কার কেবল একটি সূচনা। বোর্ডের তরফে এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে নারী ক্রিকেটের জন্য আলাদা বাজেট ও প্রণোদনা তৈরি করছি। মাঠে তাঁদের সাফল্যই দেখাচ্ছে, তাঁরা পুরুষদের সমান।” তবে সমালোচকদের মতে, শুধুমাত্র মুখের কথায় হবে না, কাজের মধ্যে সমতা দেখাতে হবে। কারণ, বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতেও বৈষম্য স্পষ্ট। যেখানে পুরুষ দলের এ-গ্রেড ক্রিকেটাররা যেমন বিরাট কোহলি (Virat Kohli), রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) বা জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah) বছরে ৭ কোটি টাকা পান, সেখানে মহিলা দলের সর্বোচ্চ গ্রেডে থাকা দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma), স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana) বা হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) পান মাত্র ৫০ লক্ষ টাকা।
অর্থনীতিবিদ অরিন্দম রায় (Arindam Roy) মন্তব্য করেন, “ভারতে নারী ক্রিকেট ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। দর্শক সংখ্যা, ব্র্যান্ড ভ্যালু, সব ক্ষেত্রেই তারা এগোচ্ছে। এই মুহূর্তে যদি বোর্ড সমান পারিশ্রমিক ও পুরস্কার নিশ্চিত করে, তা নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে।” উল্লেখ্য, মাঠে ঘাম ঝরিয়ে হরমনরা দেশের জন্য ইতিহাস গড়লেন। তাঁরা বিশ্বকাপ জিতেছেন ঘরের মাঠে, অগণিত সমর্থকের আবেগকে ছুঁয়ে গিয়েছেন। অথচ পুরস্কারের অঙ্কে আজও তাঁরা পিছিয়ে রইলেন পুরুষদের থেকে অনেকখানি। প্রশ্ন উঠছে, নারী ক্রিকেটের এই অসমতা কবে ঘুচবে? বিশ্বজয়ের পর হরমনপ্রীত কৌর বলেন, “আমরা মাঠে দেশের জন্য খেলি, অর্থের জন্য নয়। কিন্তু যদি পুরস্কারে সমান মর্যাদা পাই, তবে তা কেবল আমাদের নয়, আগামী প্রজন্মের মেয়েদেরও অনুপ্রেরণা হবে।” অন্যদিকে, ক্রিকেটপ্রেমীরা একযোগে দাবি তুলেছেন, পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের কৃতিত্বে সমান মূল্যায়ন হোক। আজ যখন নারী শক্তি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের প্রমাণ করছে, তখন বিসিসিআইয়ের পুরস্কারনীতি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রকৃত সমতা কেবল মাঠে নয়, মনেও আনতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Smriti Mandhana Record CWC 2025 Final | স্মৃতি মান্ধানার রেকর্ড, হরমনপ্রীতের নকআউট ব্যর্থতায় ছায়া: বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই মেরু ভারতের




