সম্পাদকীয়
এই সময় মানুষের মুখ বদলে গিয়েছে, কথার রং বদলে গিয়েছে, চোখের ভেতরের সত্যও যেন অচেনা হয়ে উঠেছে। আমরা এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিদিনের জীবনের চেয়ে খবরের শিরোনাম বড় হয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষের প্রয়োজনকে মাপা হচ্ছে সংখ্যায়, আর সম্পর্ককে মাপা হচ্ছে সুবিধার তুলাদণ্ডে। অথচ এই সময়ই আমাদের শেখাচ্ছে অস্থিরতার মধ্যেও জীবনকে বুঝে নিতে হয়। এ-যেন ছুটে চলা মানুষের মন-মানচিত্র। সবাই দৌড়চ্ছে বেঁচে থাকার তাগিদে, প্রমাণের প্রয়োজনে, সমাজের চোখে সফল হবার দাবিতে। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি, জীবনের আসল মানে আসলে থেমে গেলেই বোঝা যায়। সময়ের স্রোত যেমন বয়ে যায়, তেমনি আমরা বয়ে যাই একদল উদ্বিগ্ন মানুষ হয়ে, যে মানুষ নিজেরই মুখ খুঁজে পায় না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তবু এই সময়ের মধ্যেই আছে অজস্র আলো। অসহিষ্ণুতার ভিড়ে এক মুঠো সহানুভূতির হাত এখনও বাড়ে, বিভেদের অন্ধকারে এখনও কেউ কেউ বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালায়, অশান্তির কেন্দ্রেও কিছু মানুষ ভালবাসতে শেখে নীরবে, নিভৃতে।

এই সময় আমাদের মনে করায় মানুষের উন্নতি শুধু প্রগতির গ্রাফে নেই, আছে হৃদয়ের ভিতরেও। মানুষের শক্তি শুধু মেশিনে নেই, আছে বিশ্বাসের ভাঁজেও। মানুষের ভবিষ্যৎ কেবল যন্ত্র আর নতুন প্রযুক্তির জয়যাত্রায় নয়, রয়েছে মানবিকতার পুনর্জাগরণে। এই সময় আমাদের চোখ খুলে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ার শোরগোল যতই বাড়ুক, একজন মানুষের সত্যিকারের সান্ত্বনা আসে আরেকজন মানুষের কাঁধে মাথা রাখার উষ্ণতায়। যে পৃথিবীকে আমরা প্রতিদিন ভয় পাই,
সেই পৃথিবীকেই বদলাতে পারে আমাদের ভেতরের মমতা, আমাদের নীরব সিদ্ধান্ত। সময়ের অনিশ্চয়তা আমাদের ভেঙে দেয়, আবার তৈরি করে। এই সময় আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতা যতই বড় হোক, মানুষের ভয় ততই গভীর; সম্মান যতই পাওয়া যাক, মানুষের একাকিত্ব ততই তীক্ষ্ণ। এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মানুষের পাশে মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। অথচ আমাদের মন এখনও শিখছে। শিখছে কাউকে শুনতে, শিখছে সহ্য করতে, শিখছে ক্ষমা করতে। এই সময় হতাশার হলেও, এটি একই সঙ্গে নতুন সচেতনতারের সময়। এটি পরীক্ষার সময়, আবার প্রস্তুতির সময়ও। এটি প্রশ্নের সময়, আবার উত্তর খোঁজার সময়ও।আমরা হয়তো এখনই বুঝতে পারছি না, কিন্তু ক’য়েক বছর পর পিছনে তাকালে বুঝব এই সময়ই আমাদের মানুষ করে দিচ্ছে।
এই সময়ই আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে ছোট ছোট মুহূর্তে শান্তি খুঁজে নিতে হয়, কীভাবে ব্যস্ত পৃথিবীর ভিড়ে নিজের জন্য একটু নরম জায়গা তৈরি করতে হয়।সময় কেবল বাহ্যিক নয়, এটি ভেতরেরও। যে মানুষ নিজের ভেতরের সময়কে বুঝতে পারে, সে কোনও অনিশ্চয়তাকেই ভয় পায় না।
এই সময় তাই যতই অস্থির হোক,
এই সময়ের ভেতরেই আছে আগামী দিনের সমস্ত বীজ।
আমাদের শুধু দরকার: একটু ধৈর্য,
একটু মানবতা,
একটু ভালবাসা,
আর বিশ্বাস যে প্রতিটি অন্ধকার পথও একদিন আলোয় ভরে উঠবে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
জন্মলীলা : ব্রজনাথ! চন্দ্রের কিরণ যেমন সমস্ত লোকের আনন্দদায়ক হয়, তেমনি তোমার জন্মদিন সকলের আহ্লাদজনক হয়েছিল৷ দিঙ্মণ্ডল নিরতিশয় নির্ম্মল, সাধুগণ অপরিসীম সন্তোষলাভ করেছিলেন, প্রচণ্ড বায়ু শান্তভাব ধারণ করেছিল, নদীসকল প্রসন্নতাপ্রাপ্ত হয়েছিল, সিন্ধুসমূহ নিজশব্দে মনোহর বাদ্য করেছিল, গন্ধর্ব্বগণ গান এবং অপ্সরাগণ নৃত্য করেছিল, স্বর্গ থেকে দেবগণ পুষ্পবর্ষণ করতে লাগলেন, অগ্নিসমূহ শান্তভাবে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, মেঘসকল পুষ্পবর্ষণসহ মন্দ মন্দ গর্জ্জন করতে লাগলো। ঠিক এমন সময় সহসা তোমার পিতামাতার হস্তপদের শৃঙ্খল ঝনঝন শব্দে খুলে গেল, সেই নিবিড় অন্ধকার কারাগৃহ তোমার রূপের প্রভায় আলোকিত করে শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী তুমি আবির্ভূত হলে৷ তোমাকে দেখে তোমার পিতা বললেন— হে প্রভো,আপনি যে জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কর্ত্তা শ্রীভগবান,আমি তা বুঝেছি। আপনাকে পুত্ররূপে লাভ করবার মত আমার তো কোন তপস্যা নাই। আপনি কৃপা করত পুত্ররূপে দর্শনদান করলেন৷ তুমি আমাদের কাছে আসবে,কংস সে সংবাদ জেনে আমাদের উভয়কে কারাগারে বন্দী করে রেখেছে এবং আমার ছ টি সন্তানকে বিনষ্ট করেছে৷ তুমি অবতীর্ণ হয়েছ, এ সংবাদ শোনামাত্র সে অস্ত্র উত্তোলন করে তোমাকে বিনাশ করবার জন্য আসবে ৷ প্রভো,তুমি আপনাকে আপনি রক্ষা করুন৷

তোমাকে দেখে কংসভয়ে ভীত হয়ে দেবকী মা স্তব করতে লাগলেন ৷
” হে শোকার্ত্তিহরণ! আমি আপনার চরণকমলে শরণ নিলাম ৷ এই কারাগারে বদ্ধ হয়ে বহু পুত্রশোক পেয়েছি,আজ তার অবসান হল,আপনার দর্শনে কৃতার্থ হলাম,আমার গর্ভে আপনি জন্মেছেন যেন দুষ্ট কংস জানতে না পারে, আপনার দিব্যরূপ সম্বরণ করুন৷
ব্রজনাথ! তুমি হাস্য করে বললে, “সতি, তোমরা আদি কল্পে আমাকে পুত্ররূপে লাভ করিবার জন্য পতি-পত্নীতে অতিশয় কঠোর তপস্যা করেছিলে৷ তোমার নাম পৃশ্নি এবং বসুদেবের নাম সুতপা ছিল। তোমাদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে আমি তোমাদের দর্শনদান করত বর প্রার্থনা করতে বলি। তোমরা আমাকে পুত্ররূপে চাওয়ায় আমি তোমাদের পুত্ররূপে উৎপন্ন হই। আমার নাম পৃশ্নিগর্ভ হয়৷
অনন্তর তোমরা কশ্যপ ও অদিতি হয়ে দেহধারণ করত আমাকে পুত্ররূপে লাভ করবার জন্য উগ্র তপস্যা করলে, আমি বামনরূপে অবতীর্ণ হয়ে বলির দ্বারা হৃত দেবরাজ্য বলিকে বঞ্চনা করত গ্রহণপূর্ব্বক দান করি ৷
তারপর তোমরা দশরথ কৌশল্যারূপে ত্রেতাযুগে শরীর ধারণপূর্ব্বক আমাকে পুত্ররূপে পাবার জন্য তপস্যা এবং যজ্ঞ করেছিলে৷ আমি রাম লক্ষ্মণ ভরত শত্রুঘ্নরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। অতঃপর রাজবেশী অসুরগণকে সংহার করবার জন্য আজ আবির্ভূত হলাম৷ তোমাদের পূর্ব্বস্মৃতি উদ্বুদ্ধকরণ উদ্দেশ্যে আমি এই চতুর্ভুজমূর্ত্তিতে অবতীর্ণ হয়েছি ৷
ব্রজনাথ! তুমি এ কথা বলে সুন্দর বালকমূর্ত্তি ধারণ করলে এবং তোমাকে নন্দালয়ে রেখে আসবার জন্য বসুদেবকে প্রেরণা দিলে, তিনি তমাকে বুকে করে বদ্ধ লৌহকপাটের নিকটবর্ত্তী হবামাত্র ঝনঝনশব্দে কপাটসকল আপনা আপনি খুলে গেল, প্রহরীসকল যোগমায়ার প্রভাবে যে যেখানে ছিল নিদ্রিত হয়ে পড়লো, তোমার পিতা তোমাকে নিয়ে গোকুলের দিকে অগ্রসর হলেন৷
আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন,অজস্র বৃষ্টিপাত হচ্ছে,অনন্তদেব ফণার দ্বারা বৃষ্টি নিবারণপূর্ব্বক তোমার পিতার সঙ্গে সঙ্গে চললেন৷ মাঝে মাঝে বিদ্যুৎস্ফুরণে পথ দেখে তিনি অগ্রসর হতে লাগলেন৷ চতুর্দ্দিকে বারিপাত হচ্ছে— আমার উপর বৃষ্টি কেন পড়ছে না,বুঝতে পারলেন না। ক্রমে যমুনার নিকট এসে যমুনার দুকূলপ্লাবিনী মূর্ত্তি দর্শনে হতাশ হয়ে পড়লেন। গোকুল যেতে পারলাম না,মনে করে তোমাকে ডাকতে লাগলেন৷ তুমি যমুনাকে ইঙ্গিত করলে;যেমন সাগর সীতাপতি রামচন্দ্রকে পথ দিয়েছিলেন,আজ যমুনাও তোমার বাহক পিতাকে তদ্রূপ পথ দিলেন ৷
তোমার পিতা যমুনা পার হবার কালে যমুনা একবার তোমাকে বক্ষে ধারণ করবার অত্যন্ত ইচ্ছা হল,তুমি তো কারও ইচ্ছা অপূর্ণ রাখ না,পিতার ক্রোড় হতে যমুনায় ঝম্পপ্রদান করলে,যমুনা তোমাকে বুকে নিয়ে নিশ্চল হয়ে রইলেন৷ তোমার স্পর্শে যমুনা যেন সংজ্ঞাহীনা,তোমার পিতা এই আকস্মিক বিপদে বিষাদিতকণ্ঠে বললেন,হা বিধাতা, এখানেও আমি বঞ্চিত হলাম ৷ তিনি জলমধ্যে তোমায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন৷ পিতার ব্যাকুলতাদর্শনে জলক্রীড়া শেষ করে তুমি পিতার ক্রোড়ে উঠলে,তিনি ধীরে ধীরে নন্দালয়ে উপস্থিত হলেন ৷ তোমার যোগমায়ার প্রভাবে সবাই নিদ্রিত, শয্যা প্রভৃতির প্রয়োজন হয় নাই৷ তোমার জন্মগ্রহণের পরই যোগমায়া আবির্ভূতা হন ৷ যশোদা ঘোর নিদ্রায় সংজ্ঞাশূন্যা হয়ে পড়ে আছেন।
তোমার পিতা দেখলেন, একটি বিদ্যুৎবরণী কন্যা নিদ্রিতা যশোদার পার্শ্বে খেলা করছে৷ তাঁর পার্শ্বে তোমাকে রক্ষা করত কন্যাটি বক্ষে ধারণপূর্ব্বক নন্দালয় ত্যাগ করলেন৷ ক্রমে যমুনা পার হয়ে মথুরায় এসে উপস্থিত হলেন। তিনি যে যে লৌহদ্বার উত্তীর্ণ হতে লাগলেন,সঙ্গে সঙ্গে সেই সেই দ্বার স্বতঃই রুদ্ধ হয়ে গেল৷ তিনি কারাকক্ষে উপস্থিত হয়ে যোগমায়াকে তোমার মাতার ক্রোড়ে দিলেন, কে যেন তাঁকে আবার শৃঙ্খলিত করে দিল৷
তোমার পিতার কারাকক্ষে প্রবেশমাত্রই পহরীগণের নিদ্রাভঙ্গ হল। এমন সময় যোগমায়া কেঁদে উঠলেন৷ তাঁর কান্না শুনেই প্রহরীগণ ছুটে কংসের কাছে গিয়া জানাল,দেবকীর প্রসব হয়েছে৷ দুর্বৃত্ত কংস সে কথায় কর্ণপাত না করে সেই কন্যাকে সবলে গ্রহণ করত প্রস্তরের উপর নিক্ষেপ করলেন৷ জগজ্জননী যোগমায়া তাঁর কর হতেই উর্দ্ধে উত্থিতা হয়ে বললেন— “রে মূঢ়! আমাকে মেরে তোর কি হবে যে কোন স্থানে তোর নিধনকারী পূর্ব্বশত্রু জন্মেছেন বৃথা শিশুগণকে আর হত্যা করিস্ না৷”
🍁শ্রীশ্রীব্রজনাথলীলামৃতলহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂ফিরেপড়া | গল্প
সযত্নে মূর্তিটিকে আবার সিল্কের রুমালে জড়িয়ে সুটকেশের ভিতর তুলে রাখলাম। তারপর সুটকেশটি মাথার কাছে রেখে পুলিশের ফেরারী আসামী সাধারণ একজন চীনেম্যানের হাতে এমন দামী জিনিস কেমন করে এসে পড়েছিল, ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না।
ঘুমের ভিতরে অস্পষ্টভাবে সেই চীনেম্যানকেই যেন স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে অজানা ভাষায় সে যেন কি বলে আমায় শাসাচ্ছে! হঠাৎ আমার মাথাটা ধরে সজোরে সে ঝাঁকুনি দিল। ঘুমটা সহসা ভেঙে গেল।
হাতির দাঁতের কাজ

প্রেমেন্দ্র মিত্র
এ-কাহিনীর যেমন খুশি মানে অবশ্য করা যেতে পারে। প্রতিদিনের সাধারণ বাস্তব ঘটনার সীমা যেখানে শেষ হয়ে আজগুবির কিনারায় গিয়ে পড়েছে, সেইখানে এ-কাহিনীর জন্ম। নিজেদের মনের পাল্লা যেদিকে যেমন ঝুঁকবে, সেই হিসেবেই এ-গল্পের রূপ বদলে যেতে পারে। শুধু ঘটনাগুলো আমি তাই নিরপেক্ষভাবে এখানে বলে যাব।
ব্যাপারটার আরম্ভ যেভাবে হয়েছিল, তা স্মরণ করলে এখনো আমি কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করি। সেই অন্ধকার বাদলার রাত! থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু আকাশের অসহ্য গুমোট আর কাটতে চাইছে না। মোগলসরাই স্টেশনের থার্ড ক্লাসের—ওয়েটিংরুম ঠিক নয়, টিনের চাল দেওয়া বিশাল শেডের তলায়—একেবারে একলা, রাত দুটোয় একটি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি, আর আকাশের মেঘের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চারিধারে ইঞ্জিনের শান্টিং, মালগাড়ির পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা ও বিশাল জংশন স্টেশনের অসংখ্য অস্বাভাবিক অদ্ভুত আওয়াজ শুনছি। বিশাল টিনের শেডের মাঝখানে মিট্মিট্ করে যে একটিমাত্র তেলের আলো জ্বলছে, তাতে সামনের অন্ধকার একটু তরল হয়েছে মাত্র; শেডের কোণে কোণে সে আলো একেবারেই পৌঁছোয়নি।
কথাটা মনে হতেই সমস্ত শরীরটা শিউরে উঠল একবার। না, আর এখানে এক মুহূর্তও নয়। সুটকেশটা নিচে নামিয়ে রেখেছিলাম। সেটা তুলতে গিয়ে মেঝের উপর কী একটা জিনিস পড়ে রয়েছে বলে মনে হল। জিনিসটা তুলে আলোর নিচের নিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখে বেশ অবাক হলাম।
শেডটি শুধ যাত্রীদের অপেক্ষা করার নয়, মাল রাখবারও জায়গা। একধারে টিনের চাল পর্যন্ত বড় বড় কিসের বস্তা স্তূপাকার করে সাজানো। আমি ওজন করবার যন্ত্রটার ওপর বসেছিলাম, সেখানে পরের পর সাজানো পিপের পাহাড় অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আর একপাশে কেরোসিন কাঠের একগাদা বাক্স ভালভাবে ঠাহর করে দেখলে চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে বাইরের উজ্জ্বল বিদ্যুৎ চমকে সমস্ত শেড আলোকিত না হয়ে উঠলে অবশ্য এ-সমস্ত আমি লক্ষ্য করতাম কিনা সন্দেহ! বিদ্যুতের আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবার সমস্ত শেড আরো অন্ধকার হয়ে উঠছে যেন। কেমন একটা অস্বস্তিকর অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে, ঘোরালো অন্ধকারে জায়গাটা লাগছে রহস্যময়।
সখ করে অবশ্য এ জায়গায় আসিনি। স্টেশনের কোন ওয়েটিংরুমে জায়গা না পেয়েই বাধ্য হয়ে এখানে আসতে হয়েছে। সেকেন্ড ক্লাস ওয়েটিংরুমের সব ক’টা আসনই ভর্তি, ইন্টার ক্লাসের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটিতে কে একজন যাত্রী হঠাৎ ভয়ঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভয়ানক গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলেই গাড়ি পাওয়া যাবে জেনে শেষে এইখানেই আশ্রয় নিয়েছি।
কিন্তু শেডের তলায় আর কোন যাত্রী না দেখে প্রথমটা একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা কি আজকাল আর ট্রেনে চাপে না! তবে রাত এখন অনেক; যাত্রী যা দু-একজন আছে, বৃষ্টি সত্ত্বেও স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই হয়তো কোনরকমে আশ্রয় নিয়েছে, এমনও হতে পারে।
নির্জন শেডের ছমছমে অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, আমারও প্ল্যাটফর্মে কোনরকম একটা আশ্রয় খোঁজাই ভাল ছিল। হাত-ঘড়িটার উজ্জ্বল ডায়ালের দিকে চেয়ে দেখলাম, সবে একটা বেজেছে। আরো একঘণ্টা এই শেডের তলায় কাটাতে হবে জেনে মনটা বিশেষ প্রসন্ন হয়ে উঠল না।
ভয়কাতুরে আমি মোটই নয়, অতবড় জংশন স্টেশনের যাত্রীনিবাসে বসে ভয় পাওয়ার কোন কথাও নয়, তবু আবছা অন্ধকারে চারিধারে স্তূপাকার মালের মাঝখানে বসে থাকতে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছিলাম।
বাইরের শান্টিং প্রভৃতির শব্দ ও মেঘের ডাকের ফাঁকে ফাঁকে ঘরের এক কোণ থেকে কেঠো পোকায় কাঠ কুরে ফুটো করবার একঘেয়ে শব্দ শোনা যাচ্ছে। একবার একটা শব্দে চমকে চেয়ে দেখলাম, প্রকাণ্ড একটা ইঁদুর বস্তাগুলোর ওপর থেকে দ্রুতবেগে নেমে অন্ধকারের কোণে চলে। গেল। কিন্তু সে-সব অস্বস্তির কারণ হিসাবে ধর্তব্যের মধ্যেই নয়।
পনেরো মিনিট আরো এইভাবে কেটে যাওয়ার পর কিন্তু সত্যই অস্বস্তিটা যেন অত্যন্ত বেড়ে গেছে মনে হল। বড় রেল-স্টেশনের শব্দের কোন ধরা-বাঁধা নিয়ম নেই, হঠাৎ মাঝে মাঝে সব একেবারে থেমে যায়, তারপর আবার শুরু হয় অতর্কিতে। এখন যেন শব্দের বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেই রকম একটা ফাঁক পড়েছে, আকাশে মেঘের ডাক নেই, কেঠো পোকাটাও যেন ক্লান্ত হয়ে থেমে পড়েছে, অসাধারণ একটা নিস্তব্ধতা।
সে নিস্তব্ধতা আমার পেছন দিকে খুব কাছাকাছি আচমকা একটা প্রচণ্ড ফোঁস-ফোঁসানির শব্দে ভেঙে গেল। এটা যে নিকটের কোন লাইনের ইঞ্জিনের স্টীম ছাড়ার আওয়াজ তা বুঝেও চমকে ফিরে না তাকিয়ে পারলাম না এবং সেই মুহূর্তে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
বিচার করে দেখলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার এমন কোন হেতুই অবশ্য ছিল না; কিন্তু যে-ঘরে এতক্ষণ নিজেকে একা বলে জেনে এসেছি, সেখানে আচম্বিতে ঠিক নিজের পিছনেই অপরিচিত সাদা একটি মূর্তিকে বসে থাকতে দেখলে প্রথমটা একটু বিচলিত হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক বোধ হয় নয়। আশ্চর্যের কথা এই যে, লোকটা আমার ঠিক পিছনে ওজন করবার যন্ত্রের উপরে এসে বসলেও কখন যে এসে ঢুকেছে, টেরও পাইনি। এখনো লোকটা পাথরের মূর্তির মতই নিশ্চল, এতটুকু সাড়া-শব্দও নেই!
আবছা আলোয় অনেকক্ষণ ধরে লোকটাকে নজর করে দেখলাম। দুটো হাঁটুর উপর ভর দিয়ে মাথা নিচু করে সে বসে আছে, পাশে একটা ছোট বোঁচকা। পোশাক ও মুখের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে, তাতেই তাকে সাধারণ দরিদ্র শ্রেণীর একজন চীনেম্যান বলেই সহজে বোঝা যায়।
বুঝে একটু বোকাই হলাম। এ-রকম নির্জন জায়গায় একজন সঙ্গী পেলে খুশি হওয়ারই কথা। দুটো আলাপ করে বাঁচা যায়, কিন্তু চীনেম্যানের সঙ্গে কী আলাপ করব? বাধ্য হয়ে তাই আবার মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। চীনেম্যানও আমার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নির্বিকার বলেই মনে হল। শেডের তলায় আর কেউ আছে বলে তার যেন খেয়ালই নেই।
মিনিট পাঁচেক এইভাবে কাটবার পর আর একবার কৌতূহলভরে তার দিকে ফিরে তাকিয়েছি, এমন সময় বাইরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। মাত্র এক সেকেণ্ডের সেই উজ্জ্বল আলোই আমার পক্ষে যথেষ্ট। চীনেম্যান মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে একবার আধ-বোজা চোখ তুলে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু আমি তখন যা দেখবার, তা দেখতে পেয়েছি। লোকটার গালের বাঁ-ধারে একটা লম্বা কাটা দাগ আর বাঁ ভুরুর কোণ থেকে কানের ধার অবধি টাট্কা ও জমাট রক্তের সঙ্গে মিশে সেটা দগদগে ঘা হয়ে আছে।
হঠাৎ ভয়ঙ্করভাবে চমকে ওঠায় আমার মুখ থেকে অস্ফুট একটা শব্দ নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেছিল, কিন্তু চীনেম্যানের তাতে ভ্রূক্ষেপও দেখা গেল না। হাঁটুর উপর ভর দিয়ে আগেকার মত নিঃশব্দে, নিশ্চল-নিস্পন্দভাবেই সে বসে রইল, মুখের অতবড় কাটাটাও যেন তার কিছুই নয়।
এবারে রীতিমত অস্থির হয়ে উঠলাম। এ-রকম অদ্ভুত সঙ্গীর সঙ্গে এই নির্জনে বসে থাকার মত মনের জোর সত্যিই হারিয়েছি।
বাইরে বৃষ্টি আবার জোরে পড়তে শুরু করেছে, তা সত্ত্বেও উঠে প্ল্যাটফর্মেই চলে যাব, ঠিক করলাম। সঙ্গে ছোট সুটকেশটা তুলে নিয়ে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় বাইরে অনেক লোকের গোলমাল শোনা গেল। গোলমালটা এই দিকেই আসছে। দেখতে দেখতে কয়েকটা টর্চের আলো শেডের ভিতর এসে পড়ল, তার পরেই কয়েকজন রেলওয়ে পুলিশ ও কর্মচারীর আবির্ভাব ঘটল।
টর্চের উজ্জ্বল আলো আমার দিকে ফেলে হিন্দুস্থানী দারোগা সাহেব একটু যেন বিস্মিতভাবেই এগিয়ে এলেন।
‘আপনি—আপনি কতক্ষণ আছেন এখানে?’
অবাক হয়ে বললাম, ‘তা প্রায় দেড় ঘণ্টা।’
‘দেড় ঘণ্টা! আপনি কি একলাই আছেন?’
‘একলা? না….’
আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই দারোগা সাহেব উৎসুভাবে বললেন, ‘আর কে ছিল এখানে? চীনেম্যান, একজন চীনেম্যানকে দেখেছেন?’
পিছনে আঙুল দেখিয়ে বললাম, ‘ওইতো।’ কিন্তু বলার সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে তাকিয়ে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! কোথায় সে চীনেম্যান!
দারোগাবাবু আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করে কৌতূহলভরে বললেন, ‘আপনার পেছনেই ছিল নাকি?’
‘এই তো কয়েক সেকেণ্ড আগেই দেখেছি। মুখের বাঁ দিকে একটা কাটার দাগ।’
পুলিশেরা সবাই মুখ-চাওয়াচাওয়ি করছিল। দারোগাবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক দেখেছেন; কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড আগে কি বলছেন? সে বেরিয়ে যায়নি এখান থেকে?’
‘আমার জ্ঞানত: তো নয়!’
শেডের মধ্যে স্তূপাকার মালের পিছনে কোন জায়গায় চীনেম্যান লুকিয়ে থাকতে পারে মনে করে পুলিশ তারপর তন্ন-তন্ন করে খোঁজার আর কিছু বাকি রাখল না, কিন্তু কোন চিহ্নই তার পাওয়া গেল না। কেমন করে যে সে এক সেকেণ্ডের মধ্যেই এমন অন্তর্হিত হয়েছে, কে জানে!
হয়রাণ হয়ে পুলিশ শেষ পর্যন্ত খোঁজা বন্ধ করে শেড ছেড়ে চলে গেল। আগাগোড়া এই অপ্রত্যাশিত ব্যাপারে আমি তখন স্তম্ভিত হয়ে আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছি।
পুলিশের লোক চলে যাওয়ার পর হঠাৎ খেয়াল হল, এ শেডের ভিতর একলা থাকা মোটেই আর নিরাপদ নয়। লোকটার কোন পরিচয় অবশ্য দারোগার কাছে পাইনি, কিন্তু মুখে অত বড় একটা ক্ষত নিয়ে নেহাত কোন সাধু-পুরুষ যে পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে না, এটুকু বুঝতে পেরেছি। তা ছাড়া তার এই শেড থেকে অন্তর্হিত হওয়ার ব্যাপারটার কোন ব্যাখ্যাই যে পাওয়া যায় না।
কথাটা মনে হতেই সমস্ত শরীরটা শিউরে উঠল একবার। না, আর এখানে এক মুহূর্তও নয়। সুটকেশটা নিচে নামিয়ে রেখেছিলাম। সেটা তুলতে গিয়ে মেঝের উপর কী একটা জিনিস পড়ে রয়েছে বলে মনে হল। জিনিসটা তুলে আলোর নিচের নিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখে বেশ অবাক হলাম।
হাতির দাঁতের খোদাই করা অপরূপ এক মূর্তি। এ-সব জিনিসের সঙ্গে যেটুকু পরিচয় আমাদের আছে, তাতেই বুঝলাম, কোন উঁচুদরের চীনে কারিগর ছাড়া এমন জিনিস কেউ গড়তে পারে না। মাত্র এক বিঘত পরিমাণ মূর্তিটির সমস্ত অঙ্গ, মায় চোখের ভুরু পর্যন্ত অপরূপ কৌশলে খোদাই করা। হাতির দাঁতে তৈরি সাধারণ চীনেমূর্তির কাল্পনিক দৈত্য-দানবের রূপ এটিতে নেই। সাধারণ একজন চীনে মজুর শ্রেণীর লোক পিঠে ঝোলা বেঁধে একটু নুয়ে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত শুধু সেই ক্ষুদে মূর্তির চোখের চাহনি, আর মুখের সূক্ষ্ম বিদ্রূপের রেখা-ফোটানোর কায়দা।
মূর্তিটা যে চীনেম্যানই তাড়াতাড়িতে ফেলে গেছে, এ-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি এখন করি কি? যেখানের জিনিস সেইখানেই রেখে যাব, না জমা দেবো পুলিশের জিম্মায়!
শেষ পর্যন্ত কিন্তু লোভই জয়ী হল। এমন অপরূপ শিল্পকৌশলের নির্দশন চুরি করতেও বুঝি সত্যিকার সমঝদারের বাধে না। আমি তো ঠিক চুরিও করছি না।
মূর্তিটা সুটকেশে ভরে আমি শেড থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
কিন্তু সে মূর্তি আমি বাড়িতে নিয়ে আসতে পারিনি। পথেই সে মূর্তি আমার হাত থেকে খোয়া গেছে। কেমনভাবে আমি তা হারালাম, সেই কথা এবার বলি।
রাত্তির দুটোর ট্রেন আধ ঘন্টা লেট করে যখন স্টেশনে এসে পৌঁছাল, তখন বৃষ্টি মুষলধারে পড়তে আরম্ভ করেছে। সেই বৃষ্টির ভিতর ভাল কামরা খোঁজ করবার উৎসাহ আর ছিল না। সামনে যে কামরা পেলাম, তাইতেই উঠে কিন্তু খুশি হয়ে গেলাম। কামরাটি একেবারে খালি। একটা বাঙ্ক দখল করে শুয়ে পড়লে এরপরে যত লোকই উঠুক না কেন, বাকি রাতটা ঘুমের ব্যাঘাত আর হবে না।
ঘুমোবার আয়োজন করবার আগে কিন্তু আর একবার মূর্তিটি বের করে দেখবার কৌতূহল জয় করতে পারলাম না। ট্রেনের জোরালো আলোয় তার কারুকার্য আরো ভাল করে দেখবার সুবিধা হবে বলে সুটকেশটা খুলে ফেললাম, কিন্তু কোথায় মূর্তি! সব জিনিসের উপরে যে সেটিকে রেখেছিলাম, সে-কথা স্পষ্ট আমার মনে আছে। সুটকেশটি যে-রকম জিনিসে ঠাসা, তাতে নড়াচড়া বা ওলোট-পালোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
তবুও সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য উপরের কাপড়-চোপড়গুলো এক-এক করে তুলে ফেললাম। দেখলাম, সে মূর্তিটা আছে ঠিক, কিন্তু এভাবে সিল্কের রুমালটায় জড়িয়ে সেটাকে সুটকেশের তলায় রেখেছি বলে কোন মতেই স্মরণ করতে পারলাম না। অবশ্য তখন মাথার অবস্থা আমার খুব ভাল ছিল না। হয়তো বিমূঢ়তার মধ্যে এইভাবেই রেখে থাকব মনে করে সিল্কের রুমাল খুলে সেটা বের করলাম।
ট্রেনের জোরালো আলোয় তার অপূর্ব কারুকার্য সত্যই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিন্তু একটা খুঁতও সেই সঙ্গে দেখতে পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। শেডের ম্লান আলোয় এ খুঁতটুকু ধরা পড়েনি। চীনেম্যানের হাত থেকে অসাবধানে মেঝেয় পড়বার সময়েই বোধহয় মূর্তিটির মুখের বাঁ-ধারে একটু চিড় খেয়ে গেছে। সামান্য একটু সূক্ষ্ম দাগ মাত্র, কিন্তু এমন মূল্যবান জিনিসের এইটুকু খুঁত থাকলে মনও ক্ষুণ্ণ হয়।
সযত্নে মূর্তিটিকে আবার সিল্কের রুমালে জড়িয়ে সুটকেশের ভিতর তুলে রাখলাম। তারপর সুটকেশটি মাথার কাছে রেখে পুলিশের ফেরারী আসামী সাধারণ একজন চীনেম্যানের হাতে এমন দামী জিনিস কেমন করে এসে পড়েছিল, ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না।
ঘুমের ভিতরে অস্পষ্টভাবে সেই চীনেম্যানকেই যেন স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে অজানা ভাষায় সে যেন কি বলে আমায় শাসাচ্ছে! হঠাৎ আমার মাথাটা ধরে সজোরে সে ঝাঁকুনি দিল। ঘুমটা সহসা ভেঙে গেল।
সভয়ে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি, চীনেম্যান নয়, একজন ভদ্রলোক আমার গায়ে ঠেলা দিয়ে জাগাচ্ছেন।
বিমূঢ়ভাবে উঠে পড়লাম। ট্রেন একটা স্টেশনে এসে থেমেছে, বাইরে কুলি ও যাত্রীদের হাঁক-ডাক শোনা যাচ্ছে।
এতক্ষণে ভদ্রলোকের কথায় আমার কান গেল ‘কি রকম ঘুমোচ্ছেন, মশাই! ট্রেনে এমন অসাবধানে ঘুমোয়!’
‘কেন, কি হয়েছে?’
‘কি হয়েছে, দেখতে পাচ্ছেন না?’
দেখতে আমি সেই মুহূর্তেই পেলাম। আমার সুটকেশ খোলা! কাপড়-চোপড় জিনিসপত্র তছনছ হয়ে কিছু বাঙ্কের উপরে, কিছু কামরার মেঝেয় পড়ে আছে।
‘টাকাকড়ি ছিল নিশ্চয়, দেখুন কি গেছে?’
টাকাকড়ি নয়, কি যে গেছে, আমি সুটকেশের ওই অবস্থা দেখামাত্র বুঝেছি। তবু দুরাশা করে সমস্ত কামরায় ছড়ানো জিনিসপত্র ও সুটকেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম। না, সে মূর্তিটা ছাড়া আর সব জিনিসই ঠিক আছে।
ভদ্রলোক আমার মুখ দেখে সহানুভূতির স্বরে বললেন, ‘খুব বেশি কিছু ছিল বুঝি? স্টেশন-মাস্টারকে খবর দিন এক্ষুনি।’
তারপর একটু থেমে কি ভেবে বললেন, ‘ঠিক হয়েছে; ট্রেন প্ল্যাটফর্মে থামবার আগেই একজন চীনেম্যান এই কামরাটা থেকেই নেমে গেছে বলে মনে পড়ছে এবার।’
‘চীনেম্যান!’
‘হ্যাঁ, পিঠে একটা বোঁচকা সমেত। তখন খেয়াল করিনি। তারপর কামরায় ঢুকেই দেখলাম, আপনার সুটকেশের এই দশা। ইশ! তখন যদি আমার বুদ্ধি হত! যাই হোক—পুলিশে খবর দিন এইবেলা, স্টেশন-মাস্টারকে বলে।’
কিন্তু আমি সিল্কের রুমালটা হাতে নিয়ে বিমূঢ় হয়ে বসেই রইলাম।
রুমালটার একধারে সামান্য একটুখানি রক্তের দাগ।🍁
🍂কবিতা
স্বপন দত্ত -এর একটি কবিতা

কেন
কেন
তাহলে ভেতরেই আয়
তাহলে ভেতরেই যাই
ফিরফিত্তি কেন
এবার তোমার নীরব হওয়ার পালা
তোমার অথবা— আমি তো—
এখানেই যদি শেষ করি
জানি না বড় অথবা মাঝারি
তবে তাই হোক
কী হোক
তবে হোক
কী তবে
তৈমুর খান -এর একটি কবিতা

ভালো সংবাদ সাঁকো পেরিয়ে চলে যায়
ঘরকন্না পাখির বাসা হয়ে গেলে
মেঘ নামে, শীতল বাউল হেঁটে আসে
গাছের পাতায় পাতায় লেখা হয় ফাগুন মাসের কবিতা
ভালো সংবাদ সাঁকো পেরিয়ে চলে যায়
কেউকে ধরার দরকার হয় না
ছেলেমেয়েরা কোন স্কুলে পড়ছে
তার জন্য আর ব্যঞ্জনাকে ডাকার দরকার কী!
রাত্রি সন্তান বিয়োবে
হাসপাতাল এসে মাথার কাছে দাঁড়ায়
দু একটা শব্দ গড়ে আসে
তারাই তো নার্স!
মন্দ ভাববার দিন শেষ হলে
চাঁদ ওঠে অনন্ত আকাশে
বিহ্বল হাসতে হাসতে চলে যায়…
ছবি ধর -এর একটি কবিতা

শুদ্ধমপাপবিদ্ধং
পাপের ঘড়া পূর্ণ করে ভাবছো কেল্লাফতে!
পুণ্য করে ধন্য হও কথিত আছে শাস্ত্রমতে।
আকাঙ্ক্ষা আর অজ্ঞতাই মানুষের কষ্টের উৎস,
লোভ আর ক্ষমতার অধিকারীর রূপ বীভৎস।
গৌতম বুদ্ধের মতে জ্ঞানার্জন বা নির্বাণই মুক্তি!
হৃদ বলে দুঃখ কষ্ট চিহ্নিত করাই প্রকৃত শক্তি।
অপাপবিদ্ধ নির্মল নয় প্রাণীকূল বিশ্ব চরাচরে,
পুণ্য কর্মে বৈরাগ্য প্রাপ্তি, স্বর্গীয় শান্তি নভশ্চরে।
বাসব রঞ্জন চৌধুরী -এর একটি কবিতা

যদি অনুমতি দাও
একটা রাত দাঁড়িয়ে আছে,
তুমি শুধু বলো, একবার অনুমতি দিলেই
তোমার বুকে আশ্রয় নেব আমি,
শিশুর মতো নিশ্চিন্তে ডুবে যাব ঘুমে।
আমাদের মাঝখানে ঝিলমিল জোনাকি,
তার আলোয় কেঁপে উঠবে নিঃশব্দ সময়।
তোমার ওষ্ঠ ছুঁয়ে আমার কপালে
নেমে আসবে অনন্ত আশ্বাসের স্রোত।
কি অদ্ভুত পরম মুহূর্ত,
যেন পৃথিবী থেমে গেছে কেবল আমাদের জন্য
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি তোমায়,
কাল থেকে কালান্তর অব্দি।
শ্বেতা বসু চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

দৈনন্দিন গণিত
ঘর জুড়ে আলো অন্ধকার জমে
মানুষ হাঁটে, মুখে মুখোশ পরে
স্বপ্নগুলো বিজ্ঞাপনের ভাষায় কথা বলে
খিদে ভদ্রভাবে চুপ থাকে
স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে ভবিষ্যৎ ঝরে
হাসপাতালে সময় ধীরে শ্বাস নেয়
চাকরির ফর্মে বয়স আগে মরে
ভোট আসে, বিশ্বাস ফেরে না
মায়ের চোখে অংক কষা রাত
বাবার নীরবতা বেতনের মতো ভারী
রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ নয়– সংখ্যা
খবরে মৃত্যু হয় শিরোনাম
তবু কেউ একজন প্রশ্ন তোলে
সেই প্রশ্নেই আগামী ভোর
রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

বয়ান
অসুস্থতা – প্রকৃত, অপ্রকৃত
নাকি অতিপ্রাকৃত?
বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে যখন খেলছে
এক অদ্ভুত চিত্রকর
কেউ তখন গভীর নিরালায়
জড়িয়ে পড়ছে একাধিক নিঃশব্দ যুদ্ধে…
এ-যুদ্ধ দেখছে শুধু
দেয়ালের প্রাচীন ঘড়িটি
আর দেখছে অন্ধকারের সুগন্ধ…
শোভন পাল -এর একটি কবিতা

সরল রেখার মোটা দাগ
পালায়নি
পালানো শব্দটা
সমাজ বানিয়েছে
তার হাঁটার ভেতর
আগুন ছিল
কিন্তু মানুষ তাকে বলেছিল ভয়
বন নয়, চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল
কৌতূহলী দৃষ্টি পাতার মতো নড়ছিল
তার শরীর ছিল তার নিজের
নাম তার কেটে দেওয়া হয়েছিল
অনুমতির ঘরে
হাত বাড়েনি, সকলে দেখেছিল
দেখাও একধরনের স্পর্শ
শেষে সে সূর্যের দিকে যায়নি
সূর্যই তার দিকে এগিয়ে এসেছে…
ঈশানের দিকে তাকিয়ে
সে আর
শিকার নয়
সে সাক্ষ্য
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস। ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩১.
শরীরে শব্দের জন্ম
শীতটা এ বছর একটু আগে নেমেছে। ভোরবেলার বাতাসে একটা শুষ্কতা আছে, যেটা চামড়ায় লাগে, আবার ভেতরেও কোথাও গিয়ে ঠেকে। বেল্লা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁচের ওপারে কুয়াশা, দূরের বাড়িগুলো আধো দেখা যাচ্ছে। এই অস্পষ্টতা তার ভালো লাগে—কারণ স্পষ্টতা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
ঘুম ভাঙার পর আয়নায় তাকানোর অভ্যাসটা এখনও বদলায়নি। তবে বদলেছে দৃষ্টির ভঙ্গি। আগে সে তাকাত ভয়ের সঙ্গে, এখন তাকায় দ্বিধার সঙ্গে। যেন নিজেকে বিচার করার আগে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই বোঝা সহজ নয়। নিজের শরীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া এটা সে আগে কখনও শেখেনি। কেউ শেখায়ওনি।
সে ধীরে বলল, “আমি কি সত্যিই এত খারাপ?” এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারে, উত্তরটা খুঁজে পেতে হবে তাকে নিজেকেই।
খাতায় শেষবার লিখল, “আমার শরীর আমার শত্রু নয়, আমার ভয়ই আমার শত্রু। আমি যদি ভয়কে লিখতে পারি, তাহলে হয়ত আমি বাঁচব।”
মা আজ একটু চুপচাপ। রান্নাঘরে কাজ করছেন, কিন্তু গলার স্বরটা আগের মতো তীক্ষ্ণ নয়। গতকালের আত্মীয়দের কথাবার্তা, পিসির মন্তব্য, কাকিমার পরামর্শ, এসব নিয়ে বাড়ির ভেতরে একটা অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই চাপ এখনও পুরো কাটেনি।
—“বেল্লা, তাড়াতাড়ি কর। দেরি হয়ে যাবে।”
এই বাক্যের মধ্যে যতটা তাড়া, তার চেয়ে বেশি ক্লান্তি। শিউলি নিজেও বুঝতে পারেন না, কোন কথাটা কোথায় গিয়ে আঘাত করছে। তিনি শুধু জানেন, মেয়েকে ‘ঠিক’ রাখতে হবে। কিন্তু ‘ঠিক’ বলতে কী বোঝায়, তা তিনি নিজেও পুরো জানেন না।
অরিন্দম আজও চুপচাপ। চায়ের কাপ হাতে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি এমন মানুষ, যিনি নিজের ভেতরের কথাগুলো কাউকে বলেন না। তবু গতরাতে বেল্লার খাতা দেখার পর থেকে তার মধ্যে একটা অদৃশ্য পরিবর্তন এসেছে। তিনি কিছু বলেননি, কিন্তু লক্ষ্য করছেন। বেল্লা স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরোয়। রাস্তার ধুলো, ঠাণ্ডা বাতাস, ভিড় সবকিছুই একই, তবু তার ভেতরে কিছু বদলাচ্ছে। সে এখন নিজেকে শুধু লুকোতে চায় না, বুঝতেও চায়। কিন্তু বোঝার এই পথটা সহজ নয়। স্কুলে ঢুকতেই সেই পরিচিত শব্দ-ঘণ্টা, ছাত্রছাত্রীদের গলা, করিডোরের ধ্বনি। এই শব্দগুলো তার কাছে আগে একরকম চাপের মতো লাগত, এখন সেগুলোর ভেতরে সে একটা দূরত্ব তৈরি করতে শিখছে। যেন শব্দগুলো তাকে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু ভেতরে ঢোকে না পুরোপুরি।
ক্লাসে বসে সে খাতার পাতা খুলে রাখে। অঙ্কের খাতা, বাংলা খাতা, সবই খোলা, কিন্তু তার চোখ অন্য কোথাও। তার মাথার ভেতরে শব্দ তৈরি হচ্ছে। কোনো বাক্য সম্পূর্ণ নয়, কিন্তু ভাঙা ভাঙা কিছু লাইন ঘুরছে।
মিতা পাশে বসে। আজও আগের মতোই।
—“কী রে, আজ আবার চুপ?”
—“না।”
—“না মানে?”
—“কিছু না।”
মিতা হেসে ফেলে।
—“তুই না একদম অদ্ভুত। কখনও মনে হয় তুই খুব কিছু ভাবিস, আবার কখনো মনে হয় কিছুই না।”
বেল্লা উত্তর দেয় না। সে জানে, তার ভাবনাগুলো কথায় ধরার মতো নয়। বললেই ভুল হয়ে যাবে।
তৃতীয় পিরিয়ডে নতুন একজন এলেন, স্কুল কাউন্সেলর, অদিতি সেন।
মাঝারি বয়স, গলায় শান্ত স্বর, চোখে এমন একটা দৃষ্টি যা সরাসরি তাকায়, কিন্তু চাপ সৃষ্টি করে না।
তিনি ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—
—“আজ আমরা পড়ব না। একটু কথা বলব।”
ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে হেসে উঠল। কেউ কেউ ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো ‘মোটিভেশনাল’ কথা হবে।
অদিতি বললেন—
—“তোমরা নিজেদের সম্পর্কে কী ভাবো?”
প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তর নেই।
কেউ হাসল, কেউ চুপ করে রইল।
বেল্লার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন উঠল। এই প্রশ্নটা সে নিজেকে করেছে বহুবার, কিন্তু উত্তর পায়নি।
অদিতি আবার বললেন,
—“আমরা নিজেদের শরীর, নিজের মন সবকিছুকে বিচার করি। কিন্তু সেই বিচার কি সবসময় সত্যি?”
এই কথাটা যেন সরাসরি এসে বেল্লার ভিতরে আঘাত করল।
সে বুঝতে পারল, তার নিজের দৃষ্টিটাই হয়তো বিকৃত হয়ে গেছে।
অদিতি বললেন, “অনেক সময় আমরা অন্যের কথা নিজের সত্যি ভেবে নিই। আর তখন নিজের ভেতরের কণ্ঠটা হারিয়ে ফেলি।” এই ‘নিজের কণ্ঠ’—শব্দটা বেল্লার মনে রয়ে গেল। স্কুল শেষে সে বাড়ি ফিরছিল ধীরে ধীরে।
রাস্তার ভিড়, দোকানের আওয়াজ সবকিছুই একই, তবু তার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটু আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
সে ভাবছিল, যদি তার ভেতরে সত্যিই একটা কণ্ঠ থাকে, তবে সেটা কোথায়? বাড়িতে ঢুকতেই মা বললেন,
—“আজ আবার এত দেরি?”
—“ক্লাস ছিল।” শিউলি আর কিছু বললেন না। তারও ক্লান্তি আছে। অরিন্দম আজ একটু আগে ফিরেছেন।
তিনি বেল্লার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ কী শিখলি?”
প্রশ্নটা সাধারণ, কিন্তু তাতে আগের মতো নিরাসক্তি নেই। বেল্লা একটু থামল- “নিজের সম্পর্কে ভাবতে।” অরিন্দম তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
—“ভালো।” এই একটি শব্দ, কিন্তু বেল্লার কাছে তা অদ্ভুতভাবে বড়। রাতে নিজের ঘরে এসে সে খাতা খুলল। আজ আর দ্বিধা নেই। কলম হাতে নিয়েই লিখতে শুরু করল, “আমি আয়নায় নিজেকে দেখি না, আমি দেখি অন্যদের কথা।
আমি নিজের শরীরকে ছুঁই না, আমি ছুঁই ভয়।” লিখতে লিখতে তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু থামেনি।
শব্দগুলো যেন তার ভেতর থেকেই উঠে আসছিল, কোনও বাধা ছাড়াই। সে লিখল, “আমার ভিতরে একটা অন্ধকার ঘর আছে, যেখানে আমি ঢুকতে ভয় পাই। কারণ সেখানে আমি একা।”
এই লাইনটা লিখে সে থামল। তার মনে হল, এই প্রথম সে নিজের সত্যিটা ছুঁতে পেরেছে। পরদিন স্কুলে সে একটু আলাদা লাগল।
চুপচাপ, কিন্তু আগের মতো গুটিয়ে নয়। সে ক্লাসে প্রশ্ন করল, ছোট, কিন্তু স্পষ্ট। মিতা অবাক হয়ে তাকাল।
“আজ তুই কথা বলছিস?” বেল্লা হেসে ফেলল অল্প। এই হাসি নতুন।
সোমদত্তা ক্লাসে ঢুকলেন। তিনি বেল্লার দিকে তাকিয়ে একটু থামলেন। মেয়েটার মধ্যে বদল এসেছে, তিনি বুঝতে পারেন।
ক্লাসে তিনি বললেন, “যখন আমরা নিজের কথা বলতে পারি না, তখন আমরা ভেঙে যাই। আর যখন বলতে পারি, তখন আমরা বদলাই।”
বেল্লা অনুভব করল, এই কথাটা তার জন্যই। বাড়ি ফিরে সে আবার লিখল। আজ তার লেখা আরও স্পষ্ট,
“আমার শরীর আমাকে বহন করে,
আমি তাকে নয়।
তবু কেন আমি তাকে বিচার করি?” এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু এখন সে প্রশ্ন করতে শিখেছে।
রাতে অরিন্দম আবার তার ঘরে এলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন— “ঘুমাসনি?”
—“না।”
—“লিখছিস?”
—“হ্যাঁ।”
অরিন্দম ভেতরে এলেন না। শুধু বললেন, “ভালো করে লিখিস। সবকিছু লিখে ফেল।”
এই ‘সবকিছু’ শব্দটা বেল্লার ভেতরে গিয়ে রইল।
সে বুঝল, এই প্রথম কেউ তাকে থামাতে বলছে না, বরং খুলে যেতে বলছে। মা এখনও বোঝেন না।
“এইসব লিখে কী হবে?”
—“জানি না।” এই ‘জানি না’—এর ভেতরেই তার নতুন পথ। একদিন পাড়ার নন্দিতা দিদি তাকে বলল,
—“তুই খুব অন্যরকম। তোর চোখে ভয় আছে, আবার জেদও আছে।”
বেল্লা অবাক হয়েছিল। এই প্রথম কেউ তার ভেতরের দ্বৈততাকে চিনল। রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে আবার নিজেকে দেখল।
আজ তার চোখে আগের মতো ঘৃণা নেই। অস্বস্তি আছে, কিন্তু সেই অস্বস্তির ভেতরেই একধরনের কৌতূহল জন্মেছে।
সে ধীরে বলল, “আমি কি সত্যিই এত খারাপ?” এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারে, উত্তরটা খুঁজে পেতে হবে তাকে নিজেকেই।
খাতায় শেষবার লিখল, “আমার শরীর আমার শত্রু নয়, আমার ভয়ই আমার শত্রু। আমি যদি ভয়কে লিখতে পারি, তাহলে হয়ত আমি বাঁচব।”
কলম থামল। কিন্তু তার ভিতরে যে শব্দের জন্ম হয়েছে, তা আর থামবে না।
রাত গভীর। জানালার বাইরে কুয়াশা। ঘরের ভেতরে আলো নরম। বেল্লা খাতাটা বন্ধ করে বুকে চেপে ধরে।
তার চোখে জল নেই, কিন্তু বুকের ভেতরটা হালকা।
এই প্রথম সে বুঝতে পারল,
যন্ত্রণা শেষ হয়নি, কিন্তু সে আর একা নয়। তার সঙ্গে আছে শব্দ। আর শব্দ মানেই, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা।🍁 (ক্রমশঃ)
🍂গদ্য
বর্তমান সময়ে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে, তখন শেইজাকু এক সহজ, প্রাকৃতিক ও খরচবিহীন সমাধান হিসেবে উঠে আসছে। প্রযুক্তি আর গতিময় জীবনের মাঝে কিছু সময় নিজের জন্য আলাদা করে নেওয়াই এই পদ্ধতির মূল কথা।
জাপানের ‘শেইজাকু’ পদ্ধতিতে ফিরবে প্রশান্তি, বাড়বে স্মৃতিশক্তি ও মনঃসংযোগ

শোভনা মাইতি
ব্যস্ত জীবনে দুশ্চিন্তা যেন নিত্যসঙ্গী। সকালবেলা ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার ভিতরে ভিড় করে অগুনতি ভাবনা, অফিসের চাপ, কাজের ডেডলাইন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যজনিত ভয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপড়েন। দিন যত এগোয়, ততই যেন মানসিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়। রাতে বিছানায় শুয়েও চোখে ঘুম আসে না। বারবার একই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে মনে। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চললে শুধু মন নয়, প্রভাব পড়ে শরীরের উপরেও। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, মনঃসংযোগ কমে যায়, কাজের দক্ষতা নষ্ট হয়। এই অবস্থায় ওষুধ ছাড়া কি কোনও স্বাভাবিক উপায় নেই? বিশেষজ্ঞদের মতে, আছে। আর সেই পথ দেখাচ্ছে জাপানের একটি প্রাচীন মানসিক অনুশীলন পদ্ধতি। এই জাপানি পদ্ধতির নাম ‘শেইজ়াকু’ (Seijaku)। জাপানি ভাষায় ‘শেইজ়াকু’ শব্দের অর্থ হল নিঃস্তব্ধতা বা গভীর স্তব্ধতা। তবে এই নিঃস্তব্ধতা বাইরের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত নয়, এটি মনের ভিতরের এক শান্ত অবস্থা। চারপাশে কোলাহল থাকলেও, মনের ভিতরে প্রশান্তি বজায় রাখার কৌশলই শেখায় শেইজ়াকু। আধুনিক জীবনের চাপে যখন মন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন এই পদ্ধতি মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বিশেষভাবে কার্যকর বলে মনে করছেন মনোবিদরা।
পাখির ডাক, বাতাসে পাতার খসখসানি, দূরের কোনও মৃদু শব্দ, এই সব কিছু কল্পনায় টেনে আনতে হবে। মনে মনে ভাবতে হবে, আপনি এমন এক জায়গায় বসে আছেন, যেখানে প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই কল্পনাই ধীরে ধীরে মনকে নিঃস্তব্ধতার দিকে নিয়ে যাবে। মনোবিদদের মতে, নিয়মিত শেইজাকু অনুশীলন করলে মস্তিষ্কের উপর চাপ কমে। দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মাত্রা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
শেইজাকু কোনও কঠিন যোগাসন বা জটিল ধ্যানপদ্ধতি নয়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এটি করতে কোনও বিশেষ জায়গা, যন্ত্রপাতি বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। ঘরের এক কোণে, বারান্দায়, ছাদে কিংবা খোলামেলা কোনও জায়গায় বসেই এটি করা যায়। মূল বিষয় হল, নিজেকে কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করা। শেইজ়াকু অনুশীলনের জন্য প্রথমে আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসতে হয়। জাপানে সাধারণত হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর বসে, অর্থাৎ বজ্রাসনে বসে এই অনুশীলন করা হয়। তবে যাঁদের বজ্রাসনে বসতে অসুবিধা হয়, তাঁরা সুখাসন বা চেয়ারে সোজা হয়ে বসেও শুরু করতে পারেন। আসন ঠিক করার পর চোখ বন্ধ করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে এবং স্বাভাবিক গতিতে তা ছাড়তে হবে। শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর কোনও জোর দেওয়া যাবে না। শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে শিথিল হতে দিতে হবে।
এই পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শব্দের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। চারপাশে যে সব শব্দ হচ্ছে, গাড়ির আওয়াজ, মানুষের কথা, মোবাইলের রিং সেগুলি কানে এলেও তাতে মন দেওয়া যাবে না। চেষ্টা করতে হবে প্রাকৃতিক শব্দের দিকে মনোযোগ দিতে। পাখির ডাক, বাতাসে পাতার খসখসানি, দূরের কোনও মৃদু শব্দ, এই সব কিছু কল্পনায় টেনে আনতে হবে। মনে মনে ভাবতে হবে, আপনি এমন এক জায়গায় বসে আছেন, যেখানে প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই কল্পনাই ধীরে ধীরে মনকে নিঃস্তব্ধতার দিকে নিয়ে যাবে। মনোবিদদের মতে, নিয়মিত শেইজাকু অনুশীলন করলে মস্তিষ্কের উপর চাপ কমে। দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মাত্রা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাংজ়াইটি বা প্যানিক অ্যাটাকে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ উপকারী হতে পারে। শেইজাকু মস্তিষ্কের সেই অংশকে সক্রিয় করে, যা স্মৃতিশক্তি ও মনঃসংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নিয়মিত অভ্যাস করলে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
শুধু মানসিক চাপই নয়, অতিরিক্ত রাগ, অস্থিরতা বা হতাশা কমাতেও এই জাপানি পদ্ধতি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট শেইজাকু করলে তার সুফল ধীরে ধীরে টের পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ওষুধের উপর নির্ভরশীল না হয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করা সম্ভব এই পদ্ধতিতে। উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে, তখন শেইজাকু এক সহজ, প্রাকৃতিক ও খরচবিহীন সমাধান হিসেবে উঠে আসছে। প্রযুক্তি আর গতিময় জীবনের মাঝে কিছু সময় নিজের জন্য আলাদা করে নেওয়াই এই পদ্ধতির মূল কথা। দুশ্চিন্তার মেঘ সরিয়ে মনকে হালকা করতে চাইলে, জাপানের এই প্রাচীন নিস্তব্ধতার পথই হতে পারে আধুনিক মানুষের নতুন আশ্রয়।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
১৮.
সুনয়নাদি
প্রতিনিয়ত মানুষের মনে চলে ভাঙ্গা গড়ার খেলা ভাঙা গড়ার খেলায় কত মানুষ তার মন কখনো খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে কখনো বা ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া মনটা তাকিয়ে থাকে তার অক্ষয়ত্ব লাভের জন্য কোন এক জাদুকরের স্পর্শে। মানুষের মনের এই হিসেব রাখা খুব মুশকিল। সুনয়নার থেকে ফোনটা আসার পর থেকে তিথি এ কথাই ভেবে চলেছে। বাচ্চাটা পেটে থাকাকালীন সুনয়নাকে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে ওর শাশুড়ি মা আর জা মেন্টালি ফিজিক্যালি দুটোই টর্চার করেছে।তবুও সে ভেঙ্গে পড়েনি উঠে দাঁড়িয়েছে মেরুদন্ড সোজা করতে চেয়েছে ।তার পাশে ছায়া সঙ্গী হিসেবে ছিল তার স্বামী বারবার চেষ্টা করেছে বিপরীত শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে যাতে তার কোমরটাকে ভেঙে না দেয় যাতে আর কোনদিন সে উঠে দাঁড়াতে না পারে সে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কিন্তু কখনও সেই অশ্ব শক্তির কাছে সে মাথা নত করেনি সে নিজেকে বুঝিয়েছিল একদিন ঠিক তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবেন। কি অদ্ভুত চমৎকার কিছু মানুষ বোধহয় এরকমই হয় সময় থাকতে বোঝেন না। এত বড় একটা সর্বনাশ হয়ে গেল মেয়েটার মাতৃত্বের ভালবাসার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হলো। এভাবে আমাদের বাঙলার ঘরে ঘরে কত মেয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছে কেবা তার হিসেব রাখে কেবা তার খবর রাখে।
—এই যে পুচু দুধ খেয়েছে দেখো ও লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেছে।তোমাকেও দুধ খেতে হবে।
—দুধ!
—দুধ না খেলে শক্তি হবে কি করে আমার বুবুন সোনা বড় হবে কি করে?
—ঠিক আছে দাও। খাব।
—এই তো আমার সোনা বাবা।
—মাম মাম কালকে কিন্তু ম্যাগি খাব।
—ঠিক আছে তাই হবে।
আচ্ছা মাম মাম পুচু আমার কে হয়?
—কেন পুচু তোমার বুনু হয়।
—তাহলে মাম মাম ওর হ্যাপি বার্থডে হয় না কেন?
কিগো, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এত কি ভাবছো বলতো?
পবিত্র ভাবল সাড়া দিল না কেন
ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো তিথিকে একটু ধাক্কা দিল ঠিক আছো তো কার কথা এত ভাবছো তোমার মনে কি অন্য কেউ দখল নিয়েছে?
তিথি অবাক হয়ে বলে
—ও তুমি!
—কেন অন্য কাউকে প্রত্যাশা করেছিলে?
—কি সব বল না।
—তা ম্যাডাম কটা বাজে দেখেছ আমার যে চায়ের নেশা পেয়েছে আজকে কি চা হবে না?
—এ বাবা ক’টা বাজে গো?
—পাঁচটা বাজে।
—এই যা কি করো না আমাকে আগে ডাকবে তো?
—মটর চালানো হয়নি।
আমি পাম্প চালিয়ে জল ভরে নিয়েছি।
—তাই!
—বা রে সংসারটা কি শুধু তোমার আমারও তো।
—হ্যাঁ এখন বুঝছি।
—কিন্তু মাও একবারও ডাকলো না কেন আজকে।
—মাকে তো আমি দেখে আসলাম ঘুমোচ্ছে।
—না না যাই বাবা আজকে শ্বেতাম্বরী ও আসেনি গো কাছে।
—বেটা ঘুমোচ্ছে।
—বুবুন।
—ও ঘুমোচ্ছে।
—এসি চলছে না।
—ঠিক আছে ওরা ওঠার আগে আগে আমি রান্নাঘরে যাই।
চলো আমি তোমাকে সাহায্য করি।
—তুমি আমাকে সাহায্য করবে।
কেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমি চা বানাতে পারি না।
—না সে তো পারো এতক্ষণ বসাওনি কেন চায়ের জল।
—আসলে তোমার হাতের চা খেতে আমি খুব ভালবাসি।
—তাহলে আর কি বসো ঘরে গিয়ে আমি চা করে দিচ্ছি।
সে তো বুঝলাম কিন্তু কি ভাবছিলে এত বলত?
—ভাবছিলাম তো অবশ্যই।
—সেটাই তো জানতে চেয়েছি। —এত গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলে।
আরে সুনয়নাদির কথা ভাবছিলাম।
—কেন ওর আবার কি হয়েছে?
—এবাবা ওর বাচ্চা তো মারা গেছে, তিথি রান্নাঘর থেকে বলল।
—কিগো, পুচুকে তুলে দাও তো ওর দুধটা দিয়ে দিচ্ছি।
—ও বাবা তোমার আওয়াজ পেয়ে নিজেই উঠে গেছে।
ও মা এসো এসো তোমার দোদন হয়ে গেছে।
—এই নাও বিকু দিলাম।
—দেখো কেমন লেজ নাড়তে নাড়তে আসছে।
—দুধটা খেয়ে নাও।
—ওরে বাবারে এখন আদর, আচ্ছা আদর করে দিচ্ছি। ওলে আমার মা রে।
—কিন্তু ওকে তো আমি ডাঙ্গাপড়ার দিকে কাজে যেতে দেখেছি।
—কাজে!
—হ্যাঁ গো তাহলে ওই দিক থেকে ফিরল একটা বাড়ি থেকে বেরতে দেখলাম যতদূর সম্ভব দাসদের বাড়িতে।
—এই নাও চা ধরো।
—বৌমা ও বৌমা।
—হ্যাঁ যাই মা।
শাশুড়ি মাকে গিয়ে চা টা ধরিয়ে দিল।
—কত বেলা গড়িয়ে গেছে গো।
—হ্যাঁ আমিও আজকে টাইমটা বুঝে উঠতে পারিনি। অসুবিধে হয়েছে।
—সে ঠিক আছে কি আর করা যাবে।
—সব দিন কি আর সমান হয়।
তিথি মনে মনে ভাবছে বাবা আগের মত হলে কি মহাভারতটাই না করতেন আপনি।
—পবিত্র আছে না বেরিয়েছে।
—না বেরবে।
—কি বলছিলে’ সু’র কথা।
—হ্যাঁ আপনাকে বলেছি কিনা মনে নেই ওর বাচ্চাটা মারা গেছে।
—সেকি গো!
—হ্যাঁ।
সোমাও একবার বলল না।
—আমিও তো অবাক হয়ে গেলাম।
—ওরা তো এক পাড়াতেই থাকে।
তাছাড়া আমাদের বাড়িতে কাজটা তো ওই ঠিক করে দিয়েছে।
—কি ব্যাপার কে জানে।
—আমি বেরচ্ছি।
—এই আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরো।
কেন?
—একটু বেরোবো।
—কোথায় যাবে?
—যাব একটু পারোদের বাড়ি।
—আরে ওর অপারেশন হয়েছে গলব্লাডার। একবার দেখতে যাওয়াটা উচিত না বলো।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
—আচ্ছা বৌমা বাচ্চাটা নষ্ট হল কেন?
—আপনাকে কি বলি ওর পেটে বাচ্চা আসার আগে থেকেই ওর ওপর ওর শাশুড়ি মা জা অত্যাচার করত।
—কি বলছো এসব।
—শুধু তাই নয় ফিজিক্যালি মেন্টালি।
—সে কি!
—হ্যাঁ মা এখন জানি না সেই কারণেই নাকি।
—দেখো মেয়েটা কাজ করতে না পারলে হবে তোমাকে তো একটা কাজের মেয়ে দিয়ে গেল।
মাঝে একবার ফোন করে কিছু বলতে চেয়েছিল এখন কি কাজটা ফেরত চাইছিল নাকি বুঝে উঠতে পারছি না।
—এখন সোমা যদি কাজ না ছাড়ে, তুমি তো আর ওকে কাজে বহাল রাখতে পারবে না।
—হ্যাঁ সেটাই তো।
—তাও যদি একবার জানাত না হলে সুইটির জায়গায় নেওয়া যেতে পারে।
—হ্যাঁ সুইটি তো এত কামাই করে। তবে কামাই করলেও সুইটির মতো ও এতটা সময় দিতে পারবে নাকি।
—সেটাও তো একটা ব্যাপার। —ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা মা, সুইটি কি আপনাকে কিছু —বলেছিল?
—কি ব্যাপারে ?
—ও যে আসছে না।
—একবার কথায় কথায় বলেছিল কোথায় যাবে?
কিন্তু তাই বলে চার-পাঁচ দিন হয়ে গেল।
—আমি তো ওকে বলেছি যা বলার বৌমার সঙ্গে কথা বলবে।
তারপরেও কেন তোমাকে জানায়নি আমি বুঝতে পারছি না।
—দেখুন ওর সঙ্গে একটু ভাল করে কথা বলবেন ওর যদি কাজের ইচ্ছে না থাকে সেটা যেন স্পষ্ট করে বলে দেয়।
—ঠিক আছে, আগে আসুক জিজ্ঞেস করব।
—মাম মাম।
—হ্যাঁ যাই বাবা।
—আমার ম্যাগি।
—না আজকে তোমার ম্যাগি করিনি।
—তাহলে আমি কি খাব?
—এই যে পুচু দুধ খেয়েছে দেখো ও লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেছে।তোমাকেও দুধ খেতে হবে।
—দুধ!
—দুধ না খেলে শক্তি হবে কি করে আমার বুবুন সোনা বড় হবে কি করে?
—ঠিক আছে দাও। খাব।
—এই তো আমার সোনা বাবা।
—মাম মাম কালকে কিন্তু ম্যাগি খাব।
—ঠিক আছে তাই হবে।
আচ্ছা মাম মাম পুচু আমার কে হয়?
—কেন পুচু তোমার বুনু হয়।
—তাহলে মাম মাম ওর হ্যাপি বার্থডে হয় না কেন?
—হবে তো এই যে প্রচুর দাদাভাই বলে দিয়েছে এবার প্রচুর হ্যাপি বার্থডে হবে। মাম মাম আমার পুচুগুলোকে সাইকেল কিনে দেব।
—ওমা তাই তুমি সাইকেল কিনে দেবে।
—সাইকেল কি প্রচুর চালাতে পারবে?
—মাম মাম আমি ওকে শিখিয়ে দেব।
—ওলে বাবালে, ঠিক আছে তাই হবে।
—পুচু চল আমার সাথে।
—কি সুন্দর পুচুটাও চলে গেল ওর সাথে। ওরা ভাল থাকুক আমার সব সোনা বাচ্চারা।
—ইস! সুনয়নার বাচ্চাটাও যদি বেঁচে থাকত। ঈশ্বর করুন খুব শিগগির যেন ওর মনের ইচ্ছেটা পূরণ হয়।
তিথি বুবুনের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে থাকে পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা যেন উজাড় করে দিয়েছে।
সমস্ত দুঃখ কষ্ট ক্লান্তি সন্তানের মুখের দিকে তাকালেই এক নিমিষে ভ্যানিশ হয়ে যায়। একরাশ মায়ামাখা মুগ্ধতা সারাদিন যেন মায়েদের ভেতরে পজিটিভ এক্সট্রা এনার্জি তৈরি করে দেয়।🍁 (ক্রমশঃ)
🍂গল্প
অথচ তোমার সেই দেহখানি আজ সারাক্ষণ সাধারণ কাপড়ের তৈরি সেমিজের স্পর্শে থাকতেই বেশি ভালোবাসে, আর তার আড়ালে নিঃসঙ্গ বক্ষযুগল, ভারি নিতম্ব, ঢিলেঢালা ত্বক, কাশফুলের মতো সাদা চুল এঁরা মাঝে মাঝে যখন তোমার ধুলোপরা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে পারে উপেক্ষার পাত্র কাকে বলে! আমি আগের কথা তুলছি না। এটাকে তুমি কী বলবে? আসলে কেউই আমরা জানি না, আমাদের কখন কী রকম হতে পারে।
উপেক্ষা

পারিজাত মজুমদার
অনেকদিন পর অবশেষে এক ঝকঝকে সন্ধেয় তোমার সঙ্গে আমার দেখা হল একটা অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটা ছিল বাগানের মধ্যে একটা হল ঘরে। আমি হল ঘরের বাইরে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, বড়োদের মধ্যে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা একদিক থেকে আরেক দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম কে আগে কার বাবা মায়ের হাত ধরবে তার প্রতিযোগিতার দৌড়। পরে বুঝলাম ওরা খেলা করছে। বাইরে দাঁড়ানো অনেকেই গল্পগুজবে ব্যাস্ত। তাদের গা থেকে নানা রকম পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছিল। হাসি ঠাট্টায় তারা খুবই মশগুল দেখলাম । ছেলে- মেয়েরা ওদেরই হবে। আমি তাদের আগে কখনো দেখিনি। এই না-দেখাগুলোকে দেখতে বেশ লাগে।
এইভাবে আমি যখন সময়ের সঙ্গে নিজের না-দেখাটাও খুঁজে দেখছিলাম সেই সময় হঠাৎ তুমি আমার খুঁজতে থাকা না-দেখাটা সরিয়ে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালে। তখন আর না বলে থাকতে পারিনি যে, “তোমার চোখ দুটো যত নষ্টের কারণ”- দেখলাম কথাটির গুরুত্ব না দিয়ে তুমি মুখ ফিরিয়ে রাখলে অন্যদিকে। মানে পরিষ্কার করে আমাকে বুঝিয়ে দিলে যে “ তুমি আকাঙ্ক্ষাশূন্য উদ্দামহীন মানুষ, আমাকে নিয়ে তুমি অতো ভেবো না। তার চেয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবো। কারণ তোমার ললাট প্রশস্ত নয়, নাসিকা অনার্যদের মতো ভোঁতা। গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ, কণ্ঠস্বর অতি কর্কশ, মুখের মধ্যে চোখ দুটো অতিশয় ক্ষুদ্র এবং কোঠারাগত। এছাড়াও মাথার চুলগুলো রুক্ষ, অবিন্যস্ত যা কখনোই আকর্ষনীয় নয় ”- এইরকম কিছু কথা বলে যখন তুমি আমাকে প্রত্যাখান করলে, তখন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত অন্ধকার চুপ করে থাকল।
এখন তো কারো দিক থেকে মুখ ফেরানোর পরিস্থিতিতেও কেউ নেই। এবার সত্যি আমাদের এসব ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু আমরা আমাদের ভুলে যাওয়ার সত্যিটা কবে স্বাভাবিক করে নেব কেউ সেটা জানি না।
এবার আমি বলতে বাধ্য হলাম যে “ তুমিও এমন কোনো আহামরি সুন্দরী নও যে আর পাঁচজনের থেকে তোমাকে আলাদা করা যায়। এমনও নয় যে তুমি খুব বিলাস জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, অজস্র জুয়েলারি তোমার, দামি স্নানগ্লাসের ভেতরে লুকোনো চোখ, সোনার চেন দিয়ে বাঁধা হাতের ঘড়ি, না আছে সেরকম একটি হৃদয়, যেখানে কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে, এসব কিছুই নেই তোমার। তবু আমি শুধু তোমার দুটো চোখ নির্বাচন করেছিলাম এই ভেবে যে সারাজীবন ওই দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবো, যাতে আর কিছু দেখতে না হয়”- স্রেফ এইটুকুর জন্যে। এছাড়া এরমধ্যে আমার আর কোনো মতলব বা ছলনা ছিল না। কিন্তু যে সময় কথাগুলি বলবার ছিল সেই সময় অভাবনীয়ভাবে তোমার চোখ তুমি অন্য চোখের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলে। আসলে তুমি নিজেকে একজন অসাধারণ বিদুষী বলে ভাবলেও তুমি তা মোটেও ছিলে না। তা না হলে এমন আচরণে কেউ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে না। তুমি হয়তো ভেবে নিয়েছিলে এভাবেই চলতে থাকবে জীবনের খেলাগুলো।
এখন তোমার অন্তর্বাস ছিঁড়ে উপচে পড়ছে অভিমান। চোখে হাই পাওয়ার লেন্সের চশমা। যেটা মাঝে মাঝেই পাল্টাতে হয়। ঊরুর সন্ধিস্থল আদি নদীর মতো শীর্ণ, সেখানে স্রোত নেই। অথচ একদিন এই তুমি ফিনফিনে সিফনের শাড়ি পড়ে পুজোর মণ্ডপে গিয়ে যখন দাঁড়াতে, তখন তোমাকে দেখে সকলেই কেমন হা করে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকত, নাকি সমীহ করত, কে জানে! তবে তারা কিছুতেই বাড়ি ফিরতে পারত না, যতক্ষণ তুমি সেখানে উপস্থিত থাকতে। আর এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব ভালোভাবেই উপভোগ করতে দেখা গিয়েছে তোমাকে।
অথচ তোমার সেই দেহখানি আজ সারাক্ষণ সাধারণ কাপড়ের তৈরি সেমিজের স্পর্শে থাকতেই বেশি ভালোবাসে, আর তার আড়ালে নিঃসঙ্গ বক্ষযুগল, ভারি নিতম্ব, ঢিলেঢালা ত্বক, কাশফুলের মতো সাদা চুল এঁরা মাঝে মাঝে যখন তোমার ধুলোপরা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে পারে উপেক্ষার পাত্র কাকে বলে! আমি আগের কথা তুলছি না। এটাকে তুমি কী বলবে? আসলে কেউই আমরা জানি না, আমাদের কখন কী রকম হতে পারে। যদিও এসব নিয়ে কারোরই কোনো মাথা ব্যাথার কারণ নেই। হয়তো এনিয়ে ভাবছেও না কেউ।
তবে এটা ঠিক, আমরা অনেকেই আগের মতো আমাদের কাছে নেই। আবার দূরেরও সরে যাইনি। কিন্তু দূরে দূরে হাঁটছি আমরা। এখন তো কারো দিক থেকে মুখ ফেরানোর পরিস্থিতিতেও কেউ নেই। এবার সত্যি আমাদের এসব ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু আমরা আমাদের ভুলে যাওয়ার সত্যিটা কবে স্বাভাবিক করে নেব কেউ সেটা জানি না। স্রেফ একটাই জার্নি ছিল, ইতিমধ্যে সেও আমরা প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছি। সূর্যও তো সারা আকাশ ভ্রমণ করে একসময় ঘরে ফেরে। তাহলে আমাদেরও কি এবার যে-যার মতো ঘরে ফিরে যাওয়ার সাজগোজ সেরে ফেলা উচিৎ নয়? কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার যে, এটা নিয়ে আমরা কখনো কিছু ভাবতে শিখিনি।
কারণ আমাদের তা কেউ শেখায়নি।
আমি এতক্ষণ ধরে এসবই ভাবছিলাম। তুমি এসে বললে, তাহলে ঠিক আছে আমরা এখন একসঙ্গে একটু হাঁটতে পারি, তাতে অসুবিধা নেই। মনে হল তারাদের দেশে আছি। কিন্তু আমার বড্ড একা লাগল। আর তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। তুমিও চলে গেলে। আমি আর কিছুতেই ঘুমোতে পারলাম না, শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, উঠে বসলাম আমার বিছানায়।

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




