সম্পাদকীয়
শরৎ মানেই বাংলার প্রাণের ঋতু। নীল – আকাশজোড়া সাদা মেঘের মেলা, মৃদু রোদের মায়া, মাঠের ধারে হেলে পড়া কাশফুলের সারি এই সবকিছু যেন মিলেমিশে এক অনুপম আবহ তৈরি করে। প্রকৃতির এই অনিন্দ্য রূপকে কেন্দ্র করেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, দুর্গোৎসব, এসে হাজির হয়। এ যেন কেবল দেবী দুর্গার আবাহন নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মিলনোৎসবের আবাহন।

এই কয়েকটা দিনে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের সব ভেদাভেদ মুছে গিয়ে মানুষ মেতে ওঠে আনন্দে। প্রতিটি পাড়ার মণ্ডপ যেন হয়ে ওঠে একেকটা শিল্পকলাকেন্দ্র – মূর্তি, প্যান্ডেল, আলো, সজ্জা সবকিছুতেই ফুটে ওঠে বাঙালির সৃজনশক্তি। কাশফুলের সাদা ঢেউয়ের মতোই মানুষের হৃদয় ভরে ওঠে এক অদ্ভুত আনন্দে। নতুন জামা-কাপড়, ভিড় জমে ওঠা মণ্ডপে ঠাকুর দেখা, আলোর ঝলকানি, একসাথে খাওয়াদাওয়া আর অন্তহীন আড্ডা সব মিলিয়ে এই সময় যেন জীবনকে এক নতুন রঙে রাঙিয়ে তোলে। দুর্গাপুজো তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক সামাজিক উৎসব। এখানে শিশুদের উল্লাস, তরুণ-তরুণীর উচ্ছ্বাস আর বয়স্কদের স্মৃতিমধুর আনন্দ একসাথে মিলে যায়। শরতের আকাশ যেমন নির্মল, তেমনি এই কয়েকদিনের মনও হয়ে ওঠে অমলিন। দূর্গোৎসব মানেই হিংসা ও অহংকারের বলি আর খুশির আবহে ছয় রিপু জয় করে আনন্দে মত্ত হয়ে ওঠা। এই দূর্গোৎসবের আবহে আমরা যেন মনে রাখি ঐক্যের আলোয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আর সংস্কৃতির শক্তিতে বাঙালি তার প্রাণকে চিরকাল নবীন রাখবে। সত্যিই যেন শারদ উৎসব মানেই বাঙালির মহা আনন্দের সময়। এখানে ধর্ম বর্ণ সব মুছে গিয়ে বাঙালি ষোলো আনায় মিলে মিশে বাংলা ভাষার ঐতিহ্য বাহিত উৎসব এই মহা দূর্গাপুজো। এই পুজো ঘিরে শিশু কিশোর কিশোরী-দের উন্মাদনা হৈ-হুল্লোড় এবং পরিবারের একে অপরের মধ্যে খুশি ভাগ করে নেওয়ার দিন। এই পাঁচ দিন নানান ধরণের রকমারি নতুন নতুন জামা কাপড় পড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে দূর্গা পুজোর মূর্তি ও প্যান্ডেলের সজ্যা সহ আলোর ঝলকে উজ্জ্বল দৃষ্টি মনকে এক নতুন আবরণে বেঁধে দেয়।
মায়ের বিসর্জন শেষে বুকে বুক ঠেকিয়ে বন্ধুদের মধ্যে ভালোবাসা, শুভেচ্ছা বিনিময় ও প্রীতি শ্রদ্ধার আদান প্রদান। গুরুজনেদের শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রণাম এ এক অলৌকিক অনুভূতির দৃশ্যকল্প। মহিলাদের সিঁদুর খেলা এক মহা আনন্দের বার্তা বহন করে। বলতেই হয় শরতের মেঘ, আকাশ আর কাশফুল আমাদের চিরন্তন বার্তা দেয় অশুভকে জয় করে শুভের জয়ধ্বনি উচ্চারণই জীবনের আসল উৎসব।🍁
এবারের শারদীয়া’য় যাঁরা লিখেছেন

🍁সম্পূর্ণ সূচীপত্র
সম্পাদকীয়
মহামিলনের কথা | সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ দেব
ফিরেপড়া প্রবন্ধ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রবন্ধ | মুন চক্রবর্তী
কবিতা : মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত বসু, স্বপন দত্ত, অংশুমান কর, তৈমুর খান, বিশ্বজিৎ মণ্ডল, রেহানা বীথি, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, আমিনা তাবাসসুম, গীতা চক্রবর্তী, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
গল্প | বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, তাহমিনা শিল্পী
কবিতা | স্বপন কুমার ধর, উম্মে হাবীবা, বৃন্দাবন দাস, মিতা নূর
গদ্য | মমতা রায় চৌধুরী
লিমেরিক | রণজিৎ সরকার
চিঠি-সাহিত্য | সোমপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা | দেবাশিস সাহা, রোকসানা রহমান, রনি রেজা, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, গোলাম কবির, মোফাক হোসেন, পরাণ মাঝি, সোমা বিশ্বাস, মুন চক্রবর্তী, ছবি ধর, আবদুস সালাম, প্রিয়াঙ্কা নিয়োগী, কপিল কুমার ভট্টাচার্য্য, হান্নান বিশ্বাস, তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়
গল্প | প্রিয়তোষ ঘোষ
লোক-কথা | রাখী নাথ কর্মকার
গদ্য | দুর্গাদাস মিদ্যা
রম্য রচনা | পার্থসারথি মহাপাত্র
কণাগদ্য | অমিত পাল
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
কিরে,ঘুমাচ্ছিস না কি?
বেশ! এই ছুটাছুটি ও কত কাজ করছি— কি করে ঘুমাব?
ছুটাছুটি করলেই কি জেগে থাকা হয় ? বিষয় নিয়ে ছুটাছুটি করাটাই ত নিদ্রার লক্ষণ৷
কাকে জেগে থাকা বল?
যার জিহ্বা সর্বদা আমার নাম করে,একটি শ্বাসও যার বৃথা যায় না— সেই যথার্থ জাগ্রত। যার অব্যর্থকালত্ব আসে নাই, সে নিদ্রিত। শুধু নিদ্রিত বলি কেন —মহানিদ্রিত অর্থাৎ মৃত; জাগ্ —জেগে উঠে নাম কর্ ৷
নাম কর্, নাম কর্ — এ কথা তুমি ত বল, কিন্তু নাম ছাড়া কি অন্য উপায় নাই?
হ্যাঁ— কর্ম্ম, যোগ ও জ্ঞানের দ্বারাও আমায় লাভ করতে পারা যায় ৷ কিন্তু এ কলিযুগ— এ যুগে বিশুদ্ধ দ্রব্য,শুদ্ধ মন্ত্র ও বিত্ত -শাঠ্যহীন কর্ম্মী না থাকায়, যজ্ঞাদি কর্ম্ম হবে না। ত্যাগের সামর্থ্য -হীনতায় যোগে ফল লাভ করাও সুদুষ্কর। যতি না হলে বেদান্তজ্ঞানের অধিকারী হয় না৷ সেইজন্য জিহ্বোপস্হপরায়ণ তোর মত ক্ষুদ্র জীবের নাম ভিন্ন আর অন্য গতি নাই। তুই উচৈঃস্বরে দিগ্ দিগন্ত প্রতিধ্বনিত করে নাম কর্। বৈখরী সিদ্ধ হক৷
উচ্চৈঃস্বরে নাম না করলে কি নাম করা হয় না?
উচ্চৈঃস্বরে নাম করলে সর্ব্বভূতের বন্ধুর কাজ করা হয়৷

ও! তাই বুঝি নৃসিংহপুরাণে বলেছ :–
তে সন্তঃ সর্ব্বভূতানাং নিরুপাধিকবান্ধবাঃ৷
যে নৃসিংহ ভবন্নাম গায়ন্ত্ত্যচ্চৈর্মুদান্বিতাঃ।।
হে নৃসিংহ! সেই সাধুগণই সর্ব্বভূতের অকৃত্রিম বন্ধু, যাঁরা তোমার নাম আনন্দচিত্তে উচ্চৈঃস্বরে গান করেন।
দেখ্, যে গৃহে অথবা বনে, মনে মনে আমার নাম করে সে নিজেই কৃতার্থ হয়, পবিত্র হয়, তার কর্ম্মবন্ধন দূর হয়; কিন্তু—
ন চৈবমেকং বক্তারং জিহ্বা রক্ষতি বৈষ্ণবী।
আশ্রাব্য ভগবৎখ্যাতিং জগৎ কৃৃৎস্নং পুনাতি হি।
—হরিভক্তিসুধোদয়
—বিষ্ণুনামকারিণী জিহ্বা একমাত্র হরিকীর্ত্তনকারীকেই রক্ষা করে— তা নয়; শ্রীভগবানের খ্যাতি জগদবাসীকে শ্রবণ করিয়ে সমস্ত জগৎকে পবিত্র করে —বুঝলি? বিশেষতঃ এই কলিযুগ —এ যুগে নাম ভিন্ন অন্য কোন উপায় নাই ৷ নাম সাধনা— অতি সহজ সাধনা। জিহ্বাযন্ত্রে আমার নামরূপ মহামন্ত্র ঘোষণা করাই সাধনা।
যোগী বা জ্ঞানী হতে হলে ত্যাগ করতে হয়, সংযম অভ্যাস করতে হয়। কিন্তু এই নাম -সাধনায় কিছুই করতে হয় না, শুধু অনিবার নাম করলেই আমি সেই ভক্তের হাত ধরে ভাবরাজ্যে নিয়ে যাই। ত্যাগ ত্যাগ করে তাকে ছুটতে হয় না; ত্যাগই তার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটতে থাকে। মেঘের দিকে চেয়ে চেয়ে যেমন চাতকের সমস্ত ইন্দ্রিয় নিরুদ্ধ হয়ে যায়, সেইরূপ অবিরাম নাম করতে করতে ভক্ত বাহ্যজগৎ বিস্মৃত হয়ে যায়; আমি তাকে বুকে টেনে নিই। আমার ভক্ত আমার বুকে মুখ রেখে ঘুমিয়ে পড়ে— সে শান্ত হয়। তার সর্ব্বদুঃখ নিবৃত্তি হয় ৷ কি রে, চুপ করে রয়েছিস্! বিশ্বাস করতে পারলি না?
না না, তা নয়। তুমি যখন বলছ —সে কথায় কি অবিশ্বাস করতে পারি? এখন আমি ভাবছি —হায়, আমি কত সময় বৃথা নষ্ট করেছি! কখন যশের জন্য, কখন অর্থের আশায়, কখন রমণী সঙ্গে এ অমূল্য সময় হেলায় হারিয়েছি —তাই বড় দুঃখ হচ্ছে। এখন তোমার পা দুটি ধরে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। চোখের জলে তোমার পা দুখানি ধুইয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।
আহা কাঁদ্! হৃদয়ের মালিন্য চোখের জল ভিন্ন আর কিছুতে নষ্ট হয় না। ভক্ত প্রথমে চোখের জলের দ্বারা হৃদয় কোমল করে তার পর আমার আসন বিছিয়ে দেয় ৷ দেখ্, আমার অন্তর ও বাহ্যপূজার প্রধান উপাচার চোখের জল।
ঐ উপাচারের দ্বারা যে আমার পূজা করতে পারে তার পূজার ফল শান্তি— আমি তৎক্ষণাৎ দিই। কাঁদ —কাঁদ —খুব কাঁদ৷ হরি হরি বলে কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে ফেল্। আমি চোখের জল বড় ভালোবাসি। আমার নাম করে যে কাঁদে আমি তার দ্বারা ক্রীত হই।
গীত্বা চ মম নামানি রুদন্তি মম সন্নিধৌ।
তেষামেব পরিক্রীতো নান্যক্রীত্যে জনার্দ্দনঃ।।
—-আদিপুরাণ ৷
দ্যাখো, অহরহঃ বিষয়বিষপানে হৃদয়টা মরুভূমি হয়ে গেছে ৷ চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে ৷ কত হরি হরি করি— চোখে এক ফোঁটা জল আসে না ৷
না আসুক, তথাপি তোকে বলছি— যে আমার নাম করে সে যদি পাষাণ, কাষ্ঠসদৃশ হয়, তথাপি তাকে অভীষ্ট দান করি।’ পাষাণকাষ্ঠসদৃশায় দদাম্যভীষ্টম্।’
তুই জগতে কি করতে এসেছিস্, মনে আছে ত? আবার বলি— নাম করতে। জগতে নাম প্রচার করতে এসেছিস। নাম কর্ —নাম কর্ —নাম কর্।
রসনা রে! আর নিরব থাকিস্ না। ঐ শোন্ মহামিলনের আহ্বান— অনিবার বল জিহ্বা—
জয় রঘুনন্দন জয় সীতারাম।
জানকিবল্লভ সীতারাম।।
[পুরনো বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ]
🍁 মহারসায়ন | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
🍂ফিরেপড়া | প্রবন্ধ
বর্তমান কাল ভবিষ্যৎ ও অতীত কালের সীমান্তে অবস্থান করে, এই নিত্যচলনশীল সীমারেখার উপর দাঁড়িয়ে কে কোন্ দিকে মুখ ফেরায় আসলে সেইটাই লক্ষ্য করবার জিনিস। যারা বর্তমান কালের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পিছন দিকেই ফিরে থাকে, তারা কখনো অগ্রগামী হতে পারে না, তাদের পক্ষে মানবজীবনের পুরোবর্তী হবার পথ মিথ্যা হয়ে গেছে। তারা অতীতকেই নিয়ত দেখে বলে তার মধ্যেই সম্পূর্ণ নিবিষ্ট হয়ে থাকাতেই তাদের একান্ত আস্থা। তারা পথে চলাকে মানে না। তারা বলে যে সত্য সুদূর অতীতের মধ্যেই তার সমস্ত ফসল ফলিয়ে শেষ করে ফেলেছে; তারা বলে যে তাদের ধর্ম-কর্ম বিষয়-ব্যাপারের যা-কিছু তত্ত্ব তা ঋষিচিত্ত থেকে পরিপূর্ণ আকারে উদ্ভূত হয়ে চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে, তারা প্রাণের নিয়ম অনুসারে ক্রমশ বিকাশ লাভ করে নি, সুতরাং তাদের পক্ষে ভাবী বিকাশ নেই, অর্থাৎ ভবিষ্যৎকাল বলে জিনিসটাই তাদের নয়।
বিদ্যাসাগর দুঃসহ আঘাত পেয়েছিলেন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্মরণ-সভা বছর বছর হয় কিন্তু তাতে বক্তারা মন খুলে সব কথা বলেন না, এই ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশের লোকেরা একদিক দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন না করে থাকতে পারেন নি বটে কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁর চরিত্রের যে মহত্ত্বগুণে দেশাচারের দুর্গ নির্ভয়ে আক্রমণ করতে পেরেছিলেন সেটাকে কেবলমাত্র তাঁর দয়াদাক্ষিণ্যের খ্যাতির দ্বারা তাঁকে ঢেকে রাখতে চান। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের যেটি সকলের চেয়ে বড়ো পরিচয় সেইটিই তাঁর দেশবাসীরা তিরস্করণীর দ্বারা লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করছেন।
এর থেকে একটি কথার প্রমাণ হয় যে তাঁর দেশের লোক যে যুগে বদ্ধ হয়ে আছেন বিদ্যাসাগর সেই যুগকে ছাড়িয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ সেই বড়ো যুগে তাঁর জন্ম, যার মধ্যে আধুনিক কালেরও স্থান আছে, যা ভাবী কালকে প্রত্যাখ্যান করে না। যে গঙ্গা মরে গেছে তার মধ্যে স্রোত নেই, কিন্তু ডোবা আছে; বহমান গঙ্গা তার থেকে সরে এসেছে, সমুদ্রের সঙ্গে তার যোগ। এই গঙ্গাকেই বলি আধুনিক। বহমান কালগঙ্গার সঙ্গেই বিদ্যাসাগরের জীবনধারার মিলন ছিল, এইজন্য বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিক।
বিদ্যাসাগর আচারের দুর্গকে আক্রমণ করেছিলেন, এই তাঁর আধুনিকতার একমাত্র পরিচয় নয়। যেখানে তিনি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য বিদ্যার মধ্যে সম্মিলনের সেতুস্বরূপ হয়েছিলেন সেখানেও তাঁর বুদ্ধির ঔদার্য প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যা-কিছু পাশ্চাত্য তাকে অশুচি বলে অপমান করেন নি। তিনি জানতেন, বিদ্যার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের দিগ্বিরোধ নেই। তিনি নিজে সংস্কৃতশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন অথচ তিনিই বর্তমান য়ুরোপীয় বিদ্যার অভিমুখে ছাত্রদের অগ্রসর করবার প্রধান উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং নিজের উৎসাহ ও চেষ্টায় পাশ্চাত্য বিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি অতীতের প্রথা ও বিশ্বাসের মধ্যে মানুষ হয়েছিলেন। –এমন দেশে তাঁর জন্ম হয়েছিল, যেখানে জীবন ও মনের যে প্রবাহ মানুষের সংসারকে নিয়ত অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের অভিমুখে নিয়ে যেতে চায় সেই প্রবাহকে লোকেরা বিশ্বাস করেনি, এবং তাকে বিপজ্জনক মনে করে তার পথে সহস্র বাঁধ বেঁধে সমাজকে নিরাপদ করবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তৎসত্ত্বে তিনি পুরাতনের বেড়ার মধ্যে জড়ভাবে আবদ্ধ থাকতে পারেননি। এতেই তাঁর চরিত্রের অসামান্যতা ব্যক্ত হয়েছে। দয়া প্রভৃতি গুণ অনেকের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় কিন্তু চারিত্র-বল আমাদের দেশে সর্বত্র দৃষ্টিগোচর হয় না। যারা সবলচরিত্র, যাদের চারিত্র-বল কেবলমাত্র ধর্মবুদ্ধিগত নয় কিন্তু মানসিক-বুদ্ধি-গত সেই প্রবলেরা অতীতের বিধিনিষেধে অবরুদ্ধ হয়ে নিঃশব্দে নিস্তব্ধ হয়ে থাকেন না। তাঁদের বুদ্ধির চারিত্র-বল প্রথার বিচারহীন অনুশাসনকে শান্তশিষ্ট হয়ে মানতে পারে না। মানসিক চারিত্র-বলের এইরূপ দৃষ্টান্ত আমাদের দেশের পক্ষে অতিশয় মূল্যবান। যাঁরা অতীতের জড় বাধা লঙ্ঘন করে দেশের চিত্তকে ভবিষ্যতের পরম সার্থকতার দিকে বহন করে নিয়ে যাবার সারথি স্বরূপ, বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই মহারথীগণের একজন অগ্রগণ্য ছিলেন, আমার মনে এই সত্যটিই সব চেয়ে বড়ো হয়ে লেগেছে।
বর্তমান কাল ভবিষ্যৎ ও অতীত কালের সীমান্তে অবস্থান করে, এই নিত্যচলনশীল সীমারেখার উপর দাঁড়িয়ে কে কোন্ দিকে মুখ ফেরায় আসলে সেইটাই লক্ষ্য করবার জিনিস। যারা বর্তমান কালের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পিছন দিকেই ফিরে থাকে, তারা কখনো অগ্রগামী হতে পারে না, তাদের পক্ষে মানবজীবনের পুরোবর্তী হবার পথ মিথ্যা হয়ে গেছে। তারা অতীতকেই নিয়ত দেখে বলে তার মধ্যেই সম্পূর্ণ নিবিষ্ট হয়ে থাকাতেই তাদের একান্ত আস্থা। তারা পথে চলাকে মানে না। তারা বলে যে সত্য সুদূর অতীতের মধ্যেই তার সমস্ত ফসল ফলিয়ে শেষ করে ফেলেছে; তারা বলে যে তাদের ধর্ম-কর্ম বিষয়-ব্যাপারের যা-কিছু তত্ত্ব তা ঋষিচিত্ত থেকে পরিপূর্ণ আকারে উদ্ভূত হয়ে চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে, তারা প্রাণের নিয়ম অনুসারে ক্রমশ বিকাশ লাভ করেনি, সুতরাং তাদের পক্ষে ভাবী বিকাশ নেই, অর্থাৎ ভবিষ্যৎকাল বলে জিনিসটাই তাদের নয়।
এইরূপে সুসম্পূর্ণ সত্যের মধ্যে অর্থাৎ মৃত পদার্থের মধ্যে চিত্তকে অবরুদ্ধ করে তার মধ্যে বিরাজ করা আমাদের দেশের লোকদের মধ্যে সর্বত্র লক্ষ্যগোচর হয়, এমন-কি আমাদের দেশের যুবকদের মুখেও এর সমর্থন শোনা যায়। প্রত্যেক দেশের যুবকদের উপর ভার রয়েছে সংসারের সত্যকে নূতন করে যাচাই করে নেওয়া, সংসারকে নূতন পথে বহন করে নিয়ে যাওয়া, অসত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। প্রবীণ ও বিজ্ঞ যাঁরা তাঁরা সত্যের নিত্যনবীন বিকাশের অনুকূলতা করতে ভয় পান, কিন্তু যুবকদের প্রতি ভার আছে তারা সত্যকে পরখ করে নেবে।
সত্য যুগে যুগে নূতন করে আত্মপরীক্ষা দেবার জন্যে যুবকদের মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন। সেই-সকল নবযুগের বীরদের কাছে সত্যের ছদ্মবেশধারী পুরাতন মিথ্যা পরাস্ত হয়। সব চেয়ে দুঃখের কথা এই যে, আমাদের দেশের যুবকেরা এই আহ্বানকে অস্বীকার করেছে। সকল প্রকার প্রথাকেই চিরন্তন বলে কল্পনা করে কোনো রকমে শান্তিতে ও আরামে মনকে অলস করে রাখতে তাদের মনের মধ্যে পীড়া বোধ হয় না, দেশের পক্ষে এইটেই সকলের চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়। সেইজন্যেই আশ্চর্যের কথা এই যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ঘরে জন্মগ্রহণ করেও, এই দেশেরই একজন এই নবীনের বিদ্রোহ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি আপনার মধ্যে সত্যের তেজ, কর্তব্যের সাহস অনুভব করে ধর্মবুদ্ধিকে জয়ী করবার জন্যে দাঁড়িয়েছিলেন। এখানেই তাঁর যথার্থ মহত্ত্ব। সেদিন সমস্ত সমাজ এই ব্রাহ্মণ-তনয়কে কীরূপে আঘাত ও অপমান করেছিল, তার ইতিহাস আজকার দিনে ম্লান হয়ে গেছে, কিন্তু যাঁরা সেই সময়ের কথা জানেন তাঁরা জানেন যে তিনি কত বড়ো সংগ্রামের মধ্যে একাকী সত্যের জোরে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জয়ী হয়েছিলেন বলে গৌরব করতে পারি নে। কারণ সত্যের জয়ে দুই প্রতিকূল পক্ষেরই যোগ্যতা থাকা দরকার। কিন্তু ধর্মযুদ্ধে যাঁরা বাহিরে পরাভব পান তাঁরাও অন্তরে জয়ী হন, এই কথাটি জেনে আজ আমরা তাঁর জয়কীর্তন করব।
বিদ্যাসাগর আচারের দুর্গকে আক্রমণ করেছিলেন, এই তাঁর আধুনিকতার একমাত্র পরিচয় নয়। যেখানে তিনি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য বিদ্যার মধ্যে সম্মিলনের সেতুস্বরূপ হয়েছিলেন সেখানেও তাঁর বুদ্ধির ঔদার্য প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যা-কিছু পাশ্চাত্য তাকে অশুচি বলে অপমান করেন নি। তিনি জানতেন, বিদ্যার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের দিগ্বিরোধ নেই। তিনি নিজে সংস্কৃতশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন অথচ তিনিই বর্তমান য়ুরোপীয় বিদ্যার অভিমুখে ছাত্রদের অগ্রসর করবার প্রধান উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং নিজের উৎসাহ ও চেষ্টায় পাশ্চাত্য বিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন।
এই বিদ্যাসম্মিলনের ভার নিয়েছিলেন এমন এক ব্যক্তি যাঁর বাইরের ব্যবহার বেশভূষা প্রাচীন কিন্তু যাঁর অন্তর চির-নবীন। স্বদেশের পরিচ্ছদ গ্রহণ করে তিনি বিদেশের বিদ্যাকে আতিথ্যে বরণ করতে পেরেছিলেন এইটেই বড়ো রমণীয় হয়েছিল। তিনি অনেক বেশি বয়সে বিদেশী বিদ্যায় প্রবেশলাভ করেন এবং তাঁর গৃহে বাল্যকালে ও পুরুষানুক্রমে সংস্কৃত-বিদ্যারই চর্চা হয়েছে। অথচ তিনি কোনো বিরুদ্ধ মনোভাব না নিয়ে অতি প্রসন্নচিত্তে পাশ্চাত্য বিদ্যাকে গ্রহণ করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই আধুনিকতার গৌরবকে স্বীকার করতে হবে। তিনি নবীন ছিলেন এবং চির-যৌবনের অভিষেক লাভ করে বলশালী হয়েছিলেন। তাঁর এই নবীনতাই আমার কাছে সব চেয়ে পূজনীয় কারণ তিনি আমাদের দেশে চলবার পথ প্রস্তুত করে গেছেন। প্রত্যেক দেশের মহাপুরুষদের কাজই হচ্ছে এইভাবে বাধা অপসারিত করে ভাবী যুগে যাত্রা করবার পথকে মুক্ত করে দেওয়া। তাঁরা মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের সত্য সম্বন্ধের বাধা মোচন করে দেন। কিন্তু বাধাই যে-দেশের দেবতা সে দেশ এই মহাপুরুষদের সম্মান করতে জানে না। বিদ্যাসাগরের পক্ষে এই প্রত্যাখ্যানই তাঁর চরিত্রের সব চেয়ে বড়ো পরিচয় হয়ে থাকবে। এই ব্রাহ্মণতনয় যদি তাঁর মানসিক শক্তি নিয়ে কেবলমাত্র দেশের মনোরঞ্জন করতেন, তা হলে অনায়াসে আজ তিনি অবতারের পদ পেয়ে বসতেন এবং যে নৈরাশ্যের আঘাত তিনি পেয়েছিলেন তা তাঁকে সহ্য করতে হত না। কিন্তু যাঁরা বড়ো, জনসাধারণের চাটুবৃত্তি করবার জন্যে সংসারে তাঁদের জন্ম নয়। এইজন্যে জনসাধারণও সকল সময় স্তুতিবাক্যের মজুরি দিয়ে তাঁদের বিদায় করে না।
এ কথা মানতেই হবে যে বিদ্যাসাগর দুঃসহ আঘাত পেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই বেদনা বহন করেছিলেন। তিনি নৈরাশ্যগ্রস্ত pessimist ছিলেন বলে অখ্যাতি লাভ করেছেন, তার কারণ হচ্ছে যে যেখানে তাঁর বেদনা ছিল দেশের কাছ থেকে সেখানে তিনি শান্তি পান নি। তিনি যদিও তাতে কর্তব্যভ্রষ্ট হন নি, তবুও তাঁর জীবন যে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়েছিল তা অনেকের কাছে অবিদিত নেই। তিনি তাঁর বড়ো তপস্যার দিকে স্বদেশীয়ের কাছে অভ্যর্থনা পান নি, কিন্তু সকল মহাপুরুষেরাই এই না-পাওয়ার গৌরবের দ্বারাই ভূষিত হন। বিধাতা তাঁদের যে দুঃসাধ্য সাধন করতে সংসারে পাঠান, তাঁরা সেই দেবদত্ত দৌত্যের দ্বারাই অন্তরের মধ্যে সম্মান গ্রহণ করেই আসেন। বাহিরের অগৌরব তাঁদের অন্তরের সেই সম্মানের টিকাকেই উজ্জ্বল করে তোলে – অসম্মানই তাঁদের পুরস্কার।🍁
প্রবাসী, ভাদ্র, ১৩২৯
[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদ্যাসাগর’ প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশ। বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ]
🍂প্রবন্ধ
শরতের আকাশে বাতাসে মায়ের আগমন বার্তা পৌঁছে যায়। আনন্দে মৃন্ময়ী প্রতিমাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে চিন্ময়ী রূপে আহ্বান করা হয়। সারাবছর ধরে হিন্দু বাঙালিরা মাতৃ বন্দনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
শিউলি সুবাসে শারদীয়ার মাহাত্ম্য

মুন চক্রবর্তী
বাঙালি জাতির ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে দুর্গা পূজাতে। এই পূজোতে জাতির লোক সংস্কৃতি ভাবনা,নাটক, সাহিত্য আরও অনেক কিছু পরিচয় নিয়ে আসে। দুর্গা পূজা মানেই বাঙালির প্রাণ প্রিয় উৎসব। বর্তমানে দাঁড়িয়ে দুর্গা পূজা বাঙালির উৎসব বলা যায় না। প্রত্যেক হিন্দু জাতির মধ্যে এই পূজার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে বারোয়াড়ি পূজার এত বাড় বাড়ন্ত ছিল না। ঘরের চৌকাঠ পার করে দুর্গা পূজা মণ্ডপে মণ্ডপে আলোক সজ্জায় জনজোয়ারে ভাসতে থাকে। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানাবিধ ব্যবসা বাণিজ্য ও ভাললাগা। কর্ম সংস্কৃতি থেকে ধর্ম সংস্কৃতি সব কিছুতেই শারদীয়ার পরশে মূখরিত হয়ে উঠে। প্রতিটি ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা উৎসবের রীতিতে রয়েছে। মা আসছেন নিজের ঘরে। তাই প্রতিটি বাঙালি হৃদয় উৎফুল্লিত। কিন্ত সমাজ জীবনের দিকে তাকালে কলম ব্যতিক্রমী হয়ে উঠে।
মন দশভূজার আগমনে উৎফুল্লিত। চারিধারের প্রকৃতির আয়োজন।নব কলরবে প্রতিবছর জগত মাতার পূজায় মন ভরে থাকে। দুর্গা পূজা ঢাকের আওয়াজ মনোরম পরিবেশ গড়ে উঠুক। মাইকে ভক্তি গীতির মাধ্যমে অন্ততঃ তিনটে দিন কাটাতেই পারি। যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি দিতেই হয়ত কাশফুল, শিউলি।
আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই মা রয়েছেন। মা ছাড়া জীবন সম্ভব নয়। এই সম্ভাবনার লড়াইয়ে এই প্রযুক্তির যুগ অনেকটাই পিছিয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে একটি ধারনা ঘুনের মত বিস্তারিত হচ্ছে।বৃদ্ধ মা বাবাদের অতি সহজেই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া।প্রকৃতির নিয়মে বার্দ্ধক্য আসবেই। বার্দ্ধক্য জীবনের বেনারস। এই পথ সবাইকে পাড়ি দিতে হবে।একটু আত্মিক হলে হয়ত এ-পথ পাড়ি দেওয়া দুসাধ্য হয় না। হ্যাঁ মাতৃবন্দনায় শারদোৎসব। শুধু আনন্দ উল্লাস মার্কেটিং করার নাম দুর্গা পূজা নয়। শারদীয়া শরতকালে প্রকৃতি নানান ফুল ফল রসে সমৃদ্ধ হয়ে আসে। দুর্গা পূজার আগে আগমনী বা মহালয়ার পুন্য তিথিতে দেবীকে আহ্বান করা হয়। আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করার জন্য শ্রী রাম চন্দ্রের এই অকাল বোধন। শরতের আকাশে বাতাসে মায়ের আগমন বার্তা পৌঁছে যায়। আনন্দে মৃন্ময়ী প্রতিমাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে চিন্ময়ী রূপে আহ্বান করা হয়। সারাবছর ধরে হিন্দু বাঙালিরা মাতৃ বন্দনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
শরত ঋতুর আগমন সর্ব প্রথম আকাশ জানান দেয়। কালো মেঘগুলো সাদা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আকাশ নীল বর্ণে সুসজ্জিত হয়ে উঠে।বৃষ্টির দাপট কমে আসে।প্রকৃতির চারিধার লতা গুল্ম ফুল রাজিতে মধুর আয়োজন। ব্যাতিক্রমী স্থল পদ্মে গোলাপি বাহার ফোটে উঠে। নদীর ধারে স্থরে স্থরে কাশফুলের দোলা। এক বিরাট সম্ভাবনার আয়োজন।শিউলি ফুলের সুবাসে পুজো পুজো গন্ধ। মায়ের পূজা প্রকৃতি লাবণ্য রূপ।অসুরমর্দিনী দশভূজার তিনদিনের মর্ত্যে আসা সপরিবারে। চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। জীব জগতে এই পূজার মাহাত্ম্য অনেক দিকে। এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যবসা বাণিজ্য।বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে প্রসাদ বিতরণে সমস্ত জনগন তিনদিন মায়ের প্রসাদ পান। মঠ মন্দির বিভিন্ন সংস্থা এই সময়ে বস্ত্রদান করেন। বহুর মধ্যে একের সংযোগ বা সংস্থাপনে পূজার সমাবেশ।কিন্ত বাহ্যিক আড়ম্বরে পূজার মাহাত্ম্য কমে যাচ্ছে। মানুষ পূজাকে এক আড়ম্বর যজ্ঞে পরিণত করেছে। এই যজ্ঞে যাকজমক এতই বেশি প্যান্ডেল বাজেটে জনগন দিশেহারা। চোখ ধাঁধানো আলোক সজ্জা মাইকে যথেচ্ছা গানে সাত্ত্বিকতা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দুর্গাপূজার বিশালত্ব হারিয়ে যাচ্ছে বাণিজ্যে।কে কত চড়া দামে নিজেকে সাজাতে পারে সেই উদ্দেশ্য। সাহিত্য সংস্কৃতির এক বিরাট সম্ভাবনার প্রাপ্তি দুর্গা পূজা। যদিও বইয়ের ব্যবহার অনেকটাই কমে গিয়েছে তারপরও শারদোৎসবের লেখনি অন্য মাত্রা পায়। শারদীয়া বাঙালির ঐতিহ্যের নবজাগরণ।বেশ ভূষা থেকে খাওয়া দাওয়ার পর্বে শারদীয়া নববেশে নবরাগে ধরায় আসে।
এই নব জীবনকে আধ্যাত্মিক সাধনার উৎস বলা যেতে পারে। মায়ের চরণে যে স্বর্গের অবস্থান বলার অপেক্ষা রাখে না। মাতৃ বন্দনায় মৃন্ময়ীকে চিন্ময়ী রূপে আহ্বান করা হয় ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে।সপরিবারে উমা তিনদিন বাবার বাড়িতে আসেন। সমাজে এই রীতি বহু পুরাতন। মেয়েরা পূজোর সময় বাবার বাড়ি যাওয়ার।কিন্ত এই রীতি নীতি গুলো বদলে যাচ্ছে। চলন বলন খান পান সব কিছুতেই পশ্চিমী আবহাওয়া। রেষ্টুরেন্টে চাউমিন পিৎজা বার্গা চিকেন মোগলাই ইত্যাদি। ঘরের নাড়িকেলের সন্দেশ উঠেই গিয়েছে। পরিবার প্রথা ভেঙে এখন ঘরে অনলাইন অর্ডারে মন খুশি রাখতে হয়।প্রচুর আর্থিক লেনদেন হয় পূজোর সময়।সবটাই প্রাণহীন।যুগ বদলে গেছে। না আমাদের মন মানসিকতা তলানিতে ঠেকেছে। ভাববার বিষয়। প্রযুক্তি প্রগতির অবস্থানে দাঁড়িয়ে ইষ্ট নামে মিষ্টতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ। তবুও মন দশভূজার আগমনে উৎফুল্লিত। চারিধারের প্রকৃতির আয়োজন।নব কলরবে প্রতিবছর জগত মাতার পূজায় মন ভরে থাকে। দুর্গা পূজা ঢাকের আওয়াজ মনোরম পরিবেশ গড়ে উঠুক। মাইকে ভক্তি গীতির মাধ্যমে অন্ততঃ তিনটে দিন কাটাতেই পারি। যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি দিতেই হয়ত কাশফুল, শিউলি। সবশেষে শারদীয়ার শুভেচ্ছা রেখে মন গুণ গুণ করে— এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাব না। আসুক শিউলি দোলা দিয়ে যাক কাশফুল উত্তরণে থাকুক মানব সভ্যতা।
🍂কবিতা
মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়

কোজাগরী
চুপচাপ ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ল হাওয়া
হাওয়ার কোন লজ্জা নেই
ধানের যৌবনে চক্কর দেয় ধানশীষে ঢেউ তুলে
স্পর্শে তার রোমাঞ্চিত সুখ ।
কৃষক দাঁড়িয়ে দেখে ধানক্ষেতে খুশির মহড়া ।
কৃষাণীর চোখে মুখে নাচছে পূর্ণিমা
তাঁতে বোনা লাল ডুরে শাড়ি পরে হাসে
কপালে সিঁদুর ফোঁটা নাকে নাকছাবি
চোখের কাজলে ভাসে চাঁদ ।
সমস্ত উঠোন জুড়ে মা লক্ষ্মীর পা
পিঠুলি বাটার আল্পনা
আলোয় আলোয় ভর্তি খড়কুটোর ছোট্ট সংসার।
গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

জলের সারল্য
জলের সারল্য
তোমাকে বহুমূল্য দিয়েও
কাছে রাখতে পারিনি
আমার মনে পড়ছে শেষ বিকেলের কথা
মনে পড়ছে সময় ও অসময়ের মাঝখানে
এসেছিল শেষ টেলিফোন
মনে পড়ছে সেদিন একবুক অন্ধকারেও
আকাশে ছিল ধনুক চাঁদ
যেন আজ শেষ হবে
নিদ্রাহীন রাতের সড়ক
সামান্য সুন্দর নিয়ে এই যে বেঁচে থাকা
এই জলোচ্ছ্বাসে পা ডুবিয়ে
এক সঙ্গে হাঁটা
এরই মধ্যে সাক্ষী ছিল
অন্তরীক্ষ্যের কিছু আলোড়ন
আজ সেই জলের সারল্যেই যেন সব সরে গেল
সৌমিত বসু

আদিম
পায়ের নখ দিয়ে মাটি তুলতে তুলতে
আমি একটা পাহাড় বানিয়ে ফেলেছি
যেখানে প্রতিদিন সূর্যোদয় সূর্যাস্ত হয়;
যেখানে চা দিতে এসে কখনো কখনো
দাঁড়িয়ে পড়ে চৌকাঠ ।
সেখানে কেমন চুপিসারে একটা একটা করে ঝাঁ চকচকে ভোর হয়
পালকগুলি খসে পড়ে তোমার শরীর থেকে । তুমি টের পাও?
তবুও সাহস করে আমি চোখ তুলতে পারি না তোমার দিকে
এক পৃথিবী লজ্জা আমার সামনে
ছেলেমানুষের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
নখ দিয়ে মাটি তুলতে তুলতে
তুমি আলগোছে কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে
একদিন যে পাহাড় হয়ে যেতে চেয়েছিলে
সেকথা
কখনো কি লিখেছিলে খাতার পাতায়?
© সৌমিত বসু
স্বপন দত্ত

জন্মান্তর অথবা
আকাশের কাছে পৌঁছতে চাই
আকাশ হয়ে যাই
আকাশ কী কাশেদের সম্পর্কিত ভাই
আচ্ছা, ভাই কেন বললাম
বোন কেন নয়
পাছে, নারী ভাবলে-ই গলে যাই
ওই যে আকাশ হয়ে যাই
তাহলে, মানুষ বলে কিছু নাই
আমি কী, কে বলে দেবে?
আমি ছাড়া আমি নাই
অংশুমান কর

দেবদূত
গাছেদের কাছে মৌমাছি,
জনসন পার্কের ঝিলের হাঁসগুলির কাছে
সেই ফুটফুটে আমেরিকান মেয়ে যে
ওদের ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছিল পাউরুটির টুকরো,
ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকা ভিখিরিটির কাছে ওর বন্ধু ভুলু কুকুর,
শিউলি ফুলের কাছে সাজি হাতে তেরো বছরের কিশোরী,
আর
চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে আমাদের ভাই-বোনদের কাছে জেঠু
কাগজের ওপর পা রাখিয়ে, প্রত্যেকের পায়ের মাপ নিয়ে গিয়ে
যিনি ষষ্ঠীর দিন সন্ধেবেলা ঠিক কিনে আনতেন
পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়ার মতো শক্ত নতুন জুতো।
তৈমুর খান

ছোবল
কতযে ছোবল আসে!
ছোবলে ছোবলে ক্ষত গণনার নয়
তবু কোনো কোনো বৃষ্টির রাতে
ক্ষত ধুয়ে ফেলি
শুধু দাগ থেকে যায়
দাগে দাগে বেদনাপ্রহর
ওহে আমার ধূসর নম্র বধূ,
আলো জ্বালিয়ো না আর
থাকুক আঁধারে সব অস্পষ্ট যাতনা
চন্দ্রাহত একাকী বিষণ্ণ প্রহরগুলি
নিরুচ্চার শব্দে শব্দে লিখি;
শব্দেরা এসে ভিক্ষা চায়
এই ক্ষয় আয়ু, চাপা দীর্ঘশ্বাস
নির্বাক স্তব্ধতায় ভাঙা চুরমার
আত্মক্ষরণের বিপন্ন বিস্ময়
ভিক্ষা দিতে দিতে কেবলই ফতুর হই
জীবনের কাঁধে চেপে চলে যাই
নির্জীবনের অবসিত লাশ…
বিশ্বজিৎ মণ্ডল

বেহুলা লখিন্দর
পুবদুয়ারি ঘর ছেড়েছি, মুছেছি আপন গাঁ
দক্ষিণ মুখো দাঁড়িয়ে ছিলে, দিলে নাকো রা।
দূর্বা চাঁছা কোদাল ঘাড়ে, আমি চাষার পুত,
গন্ধ পেয়ে চিনে নিলে, বললে গেঁয়ো ভূত।
পাল পরবে আবার ডেকো, সাজাবো তোমার শহর
নিপাট হাতে ম্যাজিসিয়ান, গড়বো প্রানের বহর।
নদী তোমার শুদ্ধ জলে, আমি জাত শ্যাওলা
আমি হলাম চাঁদের বেটা, তুমি হলে বেহুলা।
রেহানা বীথি

আমরা হারিয়ে গেছি
এতটা নির্লিপ্ত আমাদের দেহহীন প্রাণ!
কোথাও বেজে চলেছে
হিম হিম সাইরেনের শব্দ
দুপুর রোদে কুয়াশার ঘোর
যেন মধ্যরাতে ঢেকে গেছে পূর্ণ চাঁদ
এতটা নির্লিপ্ত কেন আমাদের প্রাণ?
সাড়া ফেলে দিচ্ছি শীতের
সর্ষের ভূঁই মাড়িয়ে বনভোজনে যাব
তারপর অন্তত একটি রাত
বেহুঁশ কাটাব পানশালায়
কী নির্লিপ্ত প্রাণ আমাদের!
পৃথিবী ভেসে গেছে পাহাড়ি ঢলে
আর আমরা দেহহীন প্রাণ নিয়ে
ভেসে চলেছি আগুনের হলকায়…
রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ

চুমু
১.
প্রতিবছর পুজো আসে
পুজো শেষে কখনও আঁকতে পারিনি
সন্তানের ঠোঁটে চুমু…
২.
ঘুম ভেঙে প্রতিদিন
বিছানায় জড়িয়ে ধরি
কবিতার চিহ্ন
প্রেয়সীর ঠোঁট চিরকাল
উহ্য থেকে গেল
জীবন ভগ্নাংশে…
আমিনা তাবাসসুম

হারানো তল্লাটে
যতটা ভালোবাসা লেগে থাকে ঠোঁটের গভীরে
মন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়
সেই ছোট খাটো প্রেম।
তারপর চাঁদ ওঠে,
সাগর হয়ে ওঠো তুমি
বিষন্ন রাতের কিনারে নেচে ওঠে জীবনের সুর।
যেটুকু অন্যায় চিরে সাইরেন লেখে বুকের জমিন
তারই পায়ে চলা পথে হিরোশিমা,
হারানো তল্লাটে
তবুও—
আগুন আঁচলে লিখি রোদ্দুর আর ঝাউ পাতা
প্রিয়তম! দূরের সেই পারে দুজনের ঘর
যেখানে বুকের ভাষা মেঘ হয়, মাটির শিকড়।
গীতা চক্রবর্তী

নিয়তি
প্রতিনিয়ত সময়কে কিনে চলেছি
অজানা আশঙ্কায়
মহাশূন্যের দিকে চেয়ে।
প্রতিবারই মনকে শুদ্ধ করে নিয়েছি
দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা
আগুনে পুড়িয়ে।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছি
হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বড়ই ক্ষীণ
অবিরাম লোকাল ট্রেনে চড়িয়ে।
অনবরত শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি
অভ্যাসের কারণে শূন্যতা
বলিনি কিছুই রঙ চড়িয়ে।
ধীরে ধীরে শেষ বিন্দুতে চলে এসেছি
বোবা হয়ে যাবে কি কলম?
মূর্তিকে দেবো গুড়িয়ে।
প্রতিনিয়ত সময়কে কিনে চলছি।
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়

শিকার
ম্যাজিক আলোয় তাকে দেখেছিলাম।
কিছুটা আলো, আর কিছু আধো অন্ধকার।
নিয়ত ঘুরে চলা ভৌগলিক শোক
গোলাকার কুয়া,
তার ভেতর থেকে পাক খেয়ে উঠে আসে সুর,
আমি তার চান দেখছিলাম।
পিঠে ফলা দাগ, জঙ্ঘায় ট্যাটু,
ভেজা চুল আগলে রেখেছে বুক।
জল নেমে আসছে পূর্বপাহাড়ের দেশ থেকে।
ধুয়ে দিচ্ছে দীর্ঘ সে সব ঘুম।
জঙ্গলের তাবু।
কুয়াশায় হারিয়ে ফেলেছি বৃত্ত এবং বন্ধসুখ।
ইদানিং শিকারের আগে বুঝে নিতে হয়,
বন্দুকের মাছি ক্ষতদাগ থেকে যেন
ট্যাটুতে সরে না যায়।
🍂গল্প
কাকুর বাড়ির সামনে তুলসী মঞ্চ। গাঁদা-শিউলি-চন্দ্রমল্লিকার মিশ্র কুসুম। সেই তুলসীর গোড়ায় সারাদিন বাতাসী প্রদীপ জ্বলে—ঝড়-বৃষ্টি-ধুলোকে উপেক্ষা করে। মধ্যাহ্নে কাকু এক হাত সম্বল দিয়ে খুব আলগোছে জল ঢালেন, “মা তুলসী, আশীর্বাদ দাও”—এই বলে। পাশে একটা ছোট্ট কুয়ো; তার ঠাণ্ডা জল দিয়ে কাকু প্রতিদিন মন্দিরে ফুল ধুয়ে আনেন। আমরা ছেলেপিলে কুয়োয় ডোব-ডোব খেলতে গেলে কাকু রাগারাগি করেন না, কেবল বলেন, “আগে ‘হরি বল’ বলো, তারপর লাফ দাও।”
নন্দকাকু

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
নন্দলাল কাকু মারা গেছেন—খবরটা যেমন হঠাৎ, তেমনই অসম্ভব। ভোরের দিকে ঘুমের মধ্যে। কোনো তাম-ঝাম নেই, কোনো আত্মীয়ের জন্য অপেক্ষা নেই। যেন কেউ তাঁকে নরম করে ডেকে বলেছে—“চলুন, ভক্তরা অপেক্ষায়।” আর তিনি চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেছেন। গ্রামের শিবমন্দিরের ঘণ্টা সেদিন ঠিক আটটায় বাজেনি, বাজেছিল সাতটা বেয়াল্লিশে; শ্যামল কুমোর বলে—ওই মিনিটটা নাকি কাকুর নিজের—যে মিনিটে তিনি উঠোনের সিঁড়িতে বসে প্রথম গাইতেন, “হরি বল, হরি বল।” সেই সুরে গলাঘষা ধোঁয়া-ধোঁয়া সকালটা কেমন ডুবে গেল।
কাকুকে আমরা নন্দলাল বলতাম না—সবাই নন্দু কাকু বা কাকাই। বয়স কারও ঠিক জানা নেই। দাড়ি-গোঁফ ঘেঁটে মুখে একটা মেয়েলি কোমলতা, চোখদুটোয় সদা হাসিমাখা জল, কপালে সিঁদুরের টিপ। বাম কানে শঙ্খফুল, ডান কানে ছোটো সোনার দুল। উজ্জ্বল সাদা ধুতি, লালপাড় ওড়না গলায়। গ্রামের যেকোনো উৎসবে তিনি থাকতেন—বিয়ের উত্তেজনা, অন্নপ্রাশনের কোলাহল, শ্রাদ্ধের শোক—সবখানে তাঁর সুর, তাঁর হাত, তাঁর ঠান্ডা ভরসা।
গুইসাপটি মাথা নামিয়ে যেন প্রণাম করল। আমার পিঠের সব আঁশ দাঁড়িয়ে গেল। তারপর আমি হাঁটতে লাগলাম—মন্দিরের ঘণ্টা থেমে গেছে, খাল গুনগুন করছে। দূরে কোথাও দোলের আবিরের গন্ধ, কাছাকাছি বৃষ্টির জল। আকাশে হালকা এক ফালি রংধনু। মনে হল, নন্দলাল কাকু ওই রংধনুর এক প্রান্ত ধরে বসে বলছেন—“আনন্দ, আনন্দ।”
আমাদের গ্রাম—কল্যাণপুর—দুই দিক দিয়ে খেজুরবন, একদিকে শাল-সেগুনের পাহাড়ি আঁচ, আর মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে আদি-কালীর খাল—বর্ষায় নদী, শীতে নুড়ি-ঝিল। শিবমন্দিরটা খালের ধারে, বটের শেকড় ঝুলে পড়ে, তারই নিচে ঘাট। সকালবেলা কুয়াশার মধ্যে খালের জল নীল-ধূসর, কাকু তখন সাজাতে ব্যস্ত—ঘণ্টা গামছায় মুছে চকচকে, ঘণ্টাধ্বনির কুণ্ডলী ওঠে, ধূপের গন্ধে বাতাসে একটা মিষ্টি ঝিমুনি।
কাকুর সংসার নেই—এই কথা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। শোনা যায়, যৌবনে তিনি বিয়ে করতে চেয়েছিলেন; কনে পক্ষের সঙ্গে কথাও এগিয়েছিল, কিন্তু বাড়ির জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে একখানা মনোমালিন্য নাকি এমন জায়গায় গিয়েছিল যে বিয়েটা ভেস্তে যায়। কাকু সেই দিন থেকেই সংসারের মাঝখানে থেকেও একটু বাইরে চলে যান। সন্ন্যাস নেননি—গ্রামের অনুষ্টান, উপবাস, কীর্তন, সবের তত্ত্বাবধায়ক হয়ে ওঠেন—কিন্তু দিগন্তের দিকে তাকালে বোঝা যেত, তাঁর হেঁটে চলা অন্য রকম। যেন তিনি জানেন, একদিন তাঁকে অন্য একটি উঠোনে বসতে হবে।
কাকুর বাড়ির সামনে তুলসী মঞ্চ। গাঁদা-শিউলি-চন্দ্রমল্লিকার মিশ্র কুসুম। সেই তুলসীর গোড়ায় সারাদিন বাতাসী প্রদীপ জ্বলে—ঝড়-বৃষ্টি-ধুলোকে উপেক্ষা করে। মধ্যাহ্নে কাকু এক হাত সম্বল দিয়ে খুব আলগোছে জল ঢালেন, “মা তুলসী, আশীর্বাদ দাও”—এই বলে। পাশে একটা ছোট্ট কুয়ো; তার ঠাণ্ডা জল দিয়ে কাকু প্রতিদিন মন্দিরে ফুল ধুয়ে আনেন। আমরা ছেলেপিলে কুয়োয় ডোব-ডোব খেলতে গেলে কাকু রাগারাগি করেন না, কেবল বলেন, “আগে ‘হরি বল’ বলো, তারপর লাফ দাও।” আমরা হরি বল বলে লাফাতাম, অতএব কুয়োর জল কখনও রাগ করেনি।
এই কাকুকে দেখতাম, আশ্বিনের একেকটা বিকেলে মন্দিরের চাতালে বসে রামায়ণের কীর্তন গাইছেন আর হাতে তাল। কোথা থেকে যে জেগে উঠত ডালপালার শাদা-সবুজ গন্ধ, ভেড়ার গলাঝোঁকা শব্দ, দূরের কলমিলের শোঁ শোঁ—সবকিছু মিশে যেত কাকুর কণ্ঠে। আমরা তখন অষ্টম শ্রেণিতে; চৌধুরীবাড়ির দোল থাকলে কাকু আমাদের নিয়ে যেতেন চকে, বলতেন—“রং লাগাও, কিন্তু হাত জোড়ে প্রণাম করবে আগে।” কাকুর সঙ্গে থাকা মানে ভদ্রতা শেখা। কীর্তনের ফাঁকে তিনি গল্প বলতেন—“ভাগবত শুনলে মন কেমন মাখনের মতো নরম হয়। মাখনে একটু চিনির গুঁড়ো দিলেই হয়ে যায় মিষ্টি। মানুষও তেমনই। রাগ কমাও, হাসি বাড়াও।” আমরা বুঝতাম না, তবু কেমন শান্তি লাগত।
কাকুকে ঘিরে গ্রামের মজার ঘটনাও কম নেই। যেমন—একবার কাকুর গলায় ঝোলানো ছোট্ট বাঁশির জন্য গ্রামের বাঁদর দলের মাথায় খেয়াল হল। খড়ার মধ্যে তেঁতুলগাছ থেকে এক দুষ্টু বাঁদর হুড়মুড় করে নেমে এসে কাকুর পেছনে পড়ল। কাকু হাঁটছেন, বাঁদর লেজ নাচিয়ে লাফাচ্ছে, আর আমরা পিছু-পিছু। কাকু ভয় পেলেন না; হঠাৎ বাঁশি ঠোঁটে দিয়ে গুনগুন করে এক সুর তুললেন—“ভজে গোপাল, ভজে গোপাল।” বাঁদরটা থমকে তাকিয়ে থাকল, তারপর কাকুর কাঁধে উঠে বসল। কাকু তখন মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ওরে গোপাল, নাম করলে পশু-পাখিও সজন হয়।” আমরা হেসে গড়াগড়ি, বাঁদরও লেজ দুলিয়ে খুশি। ওই দিন থেকে বাঁদরটা কাকুর নাম শুনলেই শূন্যে দু-বার উল্টে যেত—গ্রামজুড়ে সে দৃশ্য দেখার জন্য দু’পয়সা করে বাজি লাগত।
আরেকবার কালীপুজোর আগের রাতে কাকু মন্দিরে খেজুরগুড়ের পায়েস দিচ্ছেন। ছোঁয়াছুঁয়ি দেখে রাখার লোক নেই—পাড়ার ছেলেরা টিপে-টিপে গরম পায়েস তুলে খাচ্ছে। কাকু দূর থেকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ বললেন—“যে যে চেখেছিস, ওরা এখন ‘শিব-নামে’ তিন ফোঁটা জল খাবে। দেবতার ভোগ চুরি করলে তাঁরই নামে প্রায়শ্চিত্ত।” আমরা সবাই গামছায় হাত মুছে লাইনে দাঁড়ালাম। কাকু হাসতে হাসতে তিন ফোঁটা জল দিলেন। তারপর বললেন—“এখন বাকিটা আমি ভাগ করে দিচ্ছি। দেবতা রাগ করেন না, তফাৎ শুধু—ডাক না দিয়ে ঢুকে পড়া ঠিক হয় না।” সেই দিন থেকে ভোগের পাত্রে হাত দেওয়ার আগে আমরা “ডাকছি” বলে উঠতাম; ভোগ চুরি বন্ধ হলো।
কাকুর আঙিনাতে বজ্রপাতের মতো ঘটেছিল এক গ্রীষ্মে। বজরার ছইভাঙা বাজারে কাকু বাজার করতে গেছেন—জিরে, মৌরি, কুমড়োফুল, পটল। ফেরার পথে দেখে, গুজুব—লোক বলছে, খালে নাকি এক কুমির দেখা গেছে। গ্রাম-সুদ্ধ লোক খালের পাড়ে। কাকু সোজা গিয়ে পাড়ে দাঁড়ালেন। সত্যি—জলের মধ্যে ডোরা-কাটা একটা ছায়া। কাকু শঙ্খ বাজিয়ে এক টান দিলেন—“হরি হরি।” ছায়াটা উঠে এলো—কুমির নয়, বড়সড় গুইসাপ। লোকজন চেঁচামেচি, “মারো মারো।” কাকু বললেন, “কেন মারবে? ওরও তো ঘর আছে।” একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে আলতো ঠেলে জল থেকে ওপরে তুলে নিলেন, তারপর শালবনের দিকে ছেড়ে দিলেন। সবাই হাঁ। কাকু বললেন, “ভয়কে নাম দিয়ে ডাকলে ভয় কমে—ওর নাম গোপাল না হয়।” তারপর থেকে গুইসাপটা মাঝে মাঝে উঠোনে এসে রোদ পোহাত; নাম হলো ‘গোপাল দা’। পোয়াতি ভেড়া তাড়া করলে কাকু বলতেন, “চলো, কীর্তনে বসি,” আর গোপাল দা লজ্জিত ছাত্রের মতো দৌড়ে সরে যেত। কীর্তনের সময়ে সে আবার এসে একেবারে সিঁড়ির নিচে শুয়ে থাকত—সেই দৃশ্য গ্রামের লোক দূর থেকে নিঃশব্দে দেখে যেত।
কাকুর সবচেয়ে বড়ো গুণ ছিল—সামলে দেওয়া। যে যার ঝগড়া নিয়ে কাকুর কাছে এসেছে, কাকু কাউকে ফিরিয়ে দেননি। বাজারে পাঁঠার দাম নিয়ে একবার বড়োসাহেব ও নিতাইয়ের ঝগড়া। হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে। কাকু এসে বললেন, “অতগুলো শক্তি থাকলে কীর্তনের ঢাকটা ধরো।” দুইজন ঢাকে বোল তুলল, কোপ-রাগ নরম হয়ে গেল। শেষে কাকু হিসেব করে দিলেন—“বড়োসাহেব, আপনার পাঁঠা দশ সেরের কম। নিতাই, বেশি দরাদরি করলে দেবী রুষ্ট হবেন। যা, তোমাদের দুজনের টাকাই আমার হাতে রাখো, আমি দেবীর পায়ের কাছে রেখে দিচ্ছি—পুজোর দিন ভোগ কেনা হবে। পাঁঠা? তোমরা একসঙ্গে কাটবে। খাবে গ্রাম।” সেদিন গ্রামের পাঁঠার মাংস ভোগে উঠেছিল—দুজনের হাসি দেখে মনে হয়েছিল, দেবীও খুশি।
আমাদের ছোট দলে কাকু ছিলেন গোপন সহচর—বিশেষ করে, ঘুড়ি লুটের সময়। মাঘের দুপুরে ঝিরিঝিরি উত্তর হাওয়া। আমরা ছাদে উঠেছি। কাকু উঠোন থেকে তাকিয়ে ডাকলেন, “ঢিল দিও না, নাভির বাতাস ধরো।” আমরা বুঝলাম না, কাকু বললেন, “যেখানে সুতোটার সুর কাঁপে, ওটাই নাভি।” আমি ‘নাভির বাতাস’ বুঝে যখন ‘প্যাঁচ’ দিলাম, সামনে থাকা বিরাট লাল ঘুড়িটা “ভোঁক্” করে কেটে গেল। পাড়ার লোক চেঁচাতে লাগল—“দ্যা-উউউউ!” কাকু হাতে গামছা নিয়ে খালের পাড়ে ছুটলেন, আমরা পেছনে। কাকু গামছা উড়িয়ে এমনভাবে ধরলেন যে ঘুড়িটা এসে গামছায় জড়িয়ে গেল। তারপর তিনি মাথায় তুলে বললেন, “যে কাটে, সে ধরবে না; যে কেটে দেওয়ায় আনন্দ পায়, সে ধরবে!” আমরা একে-অপরকে দেখলাম; কাকু ঘুড়িটা দিলেন মুকুন্দকে—কারণ সে সারাক্ষণ ‘চেটা’ ছুঁড়ছিল, একটাও কাটতে পারেনি।
শরৎ আসলেই কাকুর হাঁটাপথ পাল্টাত। সকালে কাশফুলের বনে হারিয়ে যেতেন। ঝোপঝাড় এক পাশে সরিয়ে একটা গাছতলায় বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেন। বলতেন, “এ ফুলের ভিতরে মা দুর্গার শ্বাস আছে।” আমরা হাসতাম। তিনি যোগ করতেন, “হাসো, তাতে মা বেশি খুশি হন।” নবরাত্রিতে মন্দিরের সামনে প্যান্ডেল। কাকু থরথর কাঁপা হাতে কুমোরদের বাজে সময়ে পাঁচটা কুমড়ো কিনে দিতেন—“মা বসবে, তোমরা চিন্তা কোরো না।” ভোরে ‘বোধন’-এ তাঁর গলা স্বচ্ছ—“জাগো দুর্গা, জাগো!” মনে হত, যেন ইঁট-চাপা সময়টা একটু উঠতে চায়।
এতসবের ভেতরে কাকুর ভিতরে ছিল নিঃশব্দ একটা খাদের মতো নীরবতা। সেটা ভাঙত কেবল সন্ধ্যার সময়, যখন খালের জল ধীরে ধীরে কালো হয়, আর কাকু আস্তে করে সুর তোলেন—“ভবসাগর তরিবারে হে নাথ, দাও গো ভেলা।” কারো কারো চোখে জল চলে আসত; কাকু দেখলে হাসতেন—“জল না এলেই বিপদ—শুকনো জমিতে ফসল হয় না।”
আমার জীবনে কাকুর সবচেয়ে বড়ো ছোঁয়া নন্দোৎসবের রাতে। কাকু বললেন, “চলো, নামকীর্তন করে আষাঢ়ের বৃষ্টিকে ডাকব।” খোলা আকাশে ঢোল-খোল। হঠাৎ এক দফা ঝমঝম ধারা। আমরা দৌড়—প্যান্ডেলের তলায়। কাকু ভিজে ধুতি মুঠোয় চেপে হাসতে হাসতে বললেন, “বৃষ্টি আসে যখন নাম ডাকা হয়। তোমরা নাম ডাকতে ডাকতে বড়ো হয়ো—মুখ বাঁচে, প্রাণ বাঁচে।” সেই রাতেই প্রথম আমি শুনেছিলাম তাঁর নিজের জীবনকথার গোপন ছায়া। কাকু বললেন, “কখনও মনে হয়, আমারও কেউ থাকত—ভোরবেলা হাত ধরত, বলত, ‘চা রেডি।’ আবার মনে হয়, থাক না—যতসব হালকা কথা, ওসব থাক। মানুষ যাকে ভালোবাসতে পারে, তাকেই তো আপন করে নেয়—আমার ‘আপন’ হল এই গ্রাম, এই মন্দির, খালের পানি, তোমরা।” তিনি কথা থামালেন, গলায় একটু কাঁপুনি—“তারপরও মাঝে মাঝে একখানা শূন্যতা পেটের ভিতর আঁক করে ওঠে, ওইটাকে আমি বলি—শিবের ডমরু।” আমরা চুপ করে ছিলাম। গামছাটা মাথায় চাপিয়ে তিনি হাসলেন, “ডমরু যখন বাজে, তখন কীর্তন করা ভাল।”
কাকুকে নিয়ে সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটেছিল কুমারীপুজোর দিনে। গ্রামের প্রথা—ন’বছরের এক কিশোরীকে মা হিসাবে পূজা। বছরটা ছিল দারুণ আষাঢ়ি বৃষ্টি, মাঠে কাদা। নির্বাচিত কুমারী মণিদীপা চুপটি করে বসে আছে, গায়ে হলুদ, কপালে সিঁদুর। কাকু মন্ত্র পড়ছেন। ঠিক তখনই পেছনের ঝোপ থেকে একটা শুকনো ছাগলছানা ছুটে এসে মঞ্চে লাফ! মণিদীপা ‘মা’ হয়েও ভয় পেয়ে চিৎকার—“ছাগল!” কাকু প্রথমে থমকালেন, তারপর ছাগলটাকে কোলে তুলে বললেন, “মায়ের বাহন সিংহ, কিন্তু আজ মা কৃপা করে ছাগলকেও বাহন মানলেন।” সবাই হেসে উঠল; মণিদীপার ভয় কেটে গেল, সে মিষ্টি হেসে বসে থাকল। ওই বছরটা নাকি গ্রামের ধান ভালো হয়েছিল—লোকের মধ্যে গুজব ছড়াল, “ছাগল-বাহনে মা খুশি।”
বছর ঘুরল। পুজোর পর শীত। ‘ভোগের ভেল’ বলে একটা রীতি আছে—খালের ওপার মচকা গ্রামে কাকু নিজে হাতে উৎকট সুস্বাদু খিচুড়ি ভোগ নিয়ে যেতেন। নৌকার মাঝি ধোপা হরু। নৌকায় ওঠার আগে কাকু ‘হরি বল’ বলে ভোগের হাঁড়ি কোলে নিতেন। সেবার হরু ভুলে নৌকায় বেঁধে রাখা দড়িটা খোলেনি। কাকু মাঝজলে গিয়ে দেখে নৌকা নড়ছে না, খালের ধারে লোকজন হাসাহাসি। কাকু হাঁড়ি নামিয়ে দুই হাত তুলে বললেন, “দড়িকে কেউ মন্ত্র পড়েছে বোধহয়—এই শুনছিস, দড়ু, এবার চল।” হরু ততক্ষণে দড়ি খুলে দিয়েছে। নৌকা ভেসে চলল, কাকু বললেন, “এই হলো, প্রার্থনা করলে দড়িও ছাড়ে।” আমরা পেটে খিল ধরে হাসছিলাম। কাকুও হাসলেন—“হাসো, হাসো। হাসি ভোগের স্বাদ বাড়ায়।”
কাকুর মৃত্যু যে আসছে, তার কোনো পূর্বাভাস ছিল না। কেবল কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁকে দেখেছিলাম বেশি চুপচাপ। মন্দির সাফ করে বসে থাকতেন, তারপর খালপাড়ে গিয়ে বটগাছের সঙ্গে কথা বলতেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কাকু, শরীর খারাপ?” তিনি বলেছিলেন, “না রে, শরীর তো বেশ। কেবল একটু ভিতরের ভিতর শুনি—ডাকে। কার ডাকে? যাকে ডাকি, সেই ডাকে।” আমি বোঝাতে পারিনি। তিনি মাথায় হাত রেখেছিলেন—“বেলপাতা কুড়িয়ে আনবি? আজ ‘মহামৃত্যুঞ্জয়’ জপ করব।”
সেদিন ভোরে, যখন তিনি চলে গেলেন, মন্দিরের সামনে আলতা পড়ে থাকা একটা দাগ দেখেছিলাম—খেয়াল করে দেখি, ওটা আলতা নয়, শিউলির মুঠো ফোঁটা। রাতের বৃষ্টিতে ঝরে পড়েছে। কাকুর চাটাইয়ের পাশে তাঁর রামনাম খাতা খোলা—শেষ পাতায় লেখা, “আজো নীল, আজো ধূসর, আজো ঢেউ।” তার নিচে ছোট্ট একটা শব্দ—“যাই।”
শ্মশানযাত্রা ছিল শান্ত। কাকুর ইচ্ছে—ঢাক বাজবে না, কীর্তন হবে। আমরা ঢাক নিয়ে গেলাম না। খালের ধারে পিঠ শুকনো এক টিলায় চিতা। গঙ্গাজল বালতি করে এল মুকুন্দ। মহাজন খোকন কুণ্ডলী করে আগুন দিল। আগুন ধরতে দেরি। হঠাৎ আকাশের ভিতর দিয়ে এক ঝাঁক কাশফুল ফড়ফড় করে নুয়ে পড়ল। আগুনটাও যেন অন্যমনস্কতা কাটিয়ে একবারে উঠল। আমরা একই সঙ্গে ‘হরি হরি’ বলে উঠলাম। কেউ কাঁদল, কেউ গলা খাকরাল। আমার মনে হল, খালের জল ধীরে-ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে—শুধু কাকুর কণ্ঠটা বাতাসে থেকে গেল—“রাগ কমাও, হাসি বাড়াও।”
কাকু চলে যাওয়ার পর প্রথম বড়ো উৎসব—দোল। আমরা কাকুকে ছাড়া দোল মানতে পারছিলাম না। গ্রামশালা মাঠে প্যান্ডেল; চৌধুরীমশাই বললেন, “নামকীর্তনের আগে কাকুর স্মরণ হবে।” সবাই চুপচাপ। তখন মুকুন্দ—যে সেই দিন ঘুড়ি লুটেছিল—হঠাৎ বলল, “কাকুর হাসি ছাড়া নামকীর্তন হবে?” সে পকেট থেকে একটা বাঁশি বার করল—কাকুর পুরনো বাঁশি। জানলাম, মৃত্যুর রাতে কাকুর পাশে পাওয়া গেছে। সে বাঁশিতে ‘ভজে গোপাল’ সুর বাজতেই কাকু-শিক্ষিত সেই বাঁদর—এইবার বৃদ্ধ—বটগাছের শেকড় থেকে নেমে এসে মঞ্চের পিলারের ওপরে বসে পড়ল। লোক হাসল, হাততালি। বাচ্চারা চেঁচাল—“গোপাল দা!” আমি তখন স্পষ্ট শুনছিলাম—কাকু বলছেন, “দেখছিস, হাসি আছে।”
কৃষ্ণজন্মাষ্টমীর রাতে আমরা কীর্তন করতে গিয়েছিলাম পালবাড়িতে। সারা গ্রাম মন্দিরের উঠোনে এক সাথে। গর্ভগৃহে ছোট কৃষ্ণ, মাখন-চোর, একমাথা মোরপাখা। কাকু না থাকলেও তাঁর তালটা আমাদের হাতে লেগে আছে। আমরা দোল তুলতেই দেখি, আকাশে হঠাৎ টুক করে একটা নক্ষত্র নড়ে উঠল। মাহুত গোপালদা (মানুষটা, গুইসাপ নয়) বলে উঠল, “নক্ষত্র টলেছে—পুণ্য।” আমি জানি না, পুণ্য কিনা, কিন্তু সেই মুহূর্তে কাকুকে কেমন ভীষণ কাছেই মনে হল, যেন কীর্তনের করতালে তাঁর হাতটাও উঠছে।
গাঁয়ের মজাটি আবার ফুটে উঠেছিল বৌ-ভাতের রাতে। হরেন পাল যখন তার ছেলের বৌভাত করছেন, আমরা কীর্তন শেষে ভোগ খেতে বসেছি। চচ্চড়িতে ঝাল বেশি, লোকে হাঁ করে পানি খাচ্ছে। কাকুর শিক্ষায় উৎসর্গ-মনোভাব আমাদের মাথায় ঢুকে গেছে—আমরা কেউ ‘ঝাল’ বলছি না, কেবল শিবের নাম করে জল খাচ্ছি। হরেন পাল বুঝে ফেলল—ঝাল বেশি। সে এসে বলল, “আরে কাকুরে ডাকলে সব ঠিক হত।” আমরা হেসে বললাম, “কাকু নেই, কিন্তু তাঁর কায়দা আছে।” অমনি বৌভাতের মাঝখানে হরেন পাল মাইক হাতে বলল, “যে যে জল খাচ্ছো, তিনফোঁটা করে ‘শিব নাম’ বলেই খাবে। কুকুড়-বিরিয়ানি নয়, এ ভোগ।” পুরো আসর হেসে কুটোপাটি। সেই রাতে টেবিল-গাল্পে কাকুর নকল করতে গিয়ে মুকুন্দ এমন ভঙ্গি করল যে তার ধুতি খসে পড়ে। বউরা ফিকফিক করে হেসে উঠল, মুকুন্দ লজ্জায় লাল। কাকু থাকলে বলতেন, “লজ্জা থাকলে অর্ধেক পুণ্য।”
বছর খানেক পর মন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ হল। কাকুর স্মৃতিতে তুলসীমঞ্চ থেকে শুরু করে শিব-মন্দির—সবই পাকা হবে। তহবিল উঠছে—কে পাঁচশো, কে একশো, কে হাত লাগিয়ে কাজ। আমি কাজের ফাঁকে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে রোদে কারুকাজ করা ঢেউগুলো দেখি। মনে হয়, ঢেউগুলোর গায়ে কাকুর হাসি। আমরা ঠিক করলাম—মন্দিরের ঘন্টার পাশে একটা ছোটো ফলক বসবে—“নন্দলাল চক্রবর্তী স্মৃতি-ঘণ্টা: ‘রাগ কমাও, হাসি বাড়াও’।” সদরে উদ্বোধন হবে—শ্রাবণ মাসে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে, বেলপাতা ভেজা বাতাসে।
উদ্বোধনের দিনটাও হয়ে উঠল ঘটনাভারী। সকালে দেখি, ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া দড়ি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে। পুজারি রামবৃদ্ধা তটস্থ। এমন সময় কে যেন চেঁচিয়ে বলল—“দড়ি তো বাঁধা, শুধু গিঁটটা খোলা নেই!” সবাই ঘেঁষে দেখে—দড়ির এক মাথা বটগাছের শেকড়ে জট পাকিয়ে আছে। কে খোলার সাহস করবে? বটের শেকড় ছোঁয়া মানে ‘ভূত ধরবে’—এমন ভুলভুলে ভয় লোকের মধ্যে। অবশেষে মুকুন্দ গামছা দিয়ে শেকড় ধরে টান দিল। গিঁট খুলে গেল। ঘণ্টা বাজল—“কননননং!”—একবার, দু’বার, তিনবার। আমরা একযোগে বললাম, “নন্দলাল কাকু, শুনেছেন তো?” ঠিক তখনই খালপাড় থেকে একটা বাঁদর লাফ দিল—আমরাই সেই পুরোনো অভিযাত্রীকে চিনলাম। সে একচিলতে হেসে, সত্যিই—বাঁদরের হাসি, মন্দিরের ধাপে বসে পড়ল। ঘণ্টাধ্বনি থামতেই সে লেজ নাচিয়ে তিনবার মাথা নোয়াল। গায়ে কাঁটা দিল। কেউ একজন বলল, “কাকু এসেছে।” আরেকজন বলল, “হাসছে।”
মন্দিরের কাজ শেষ হলে আমরা ঠিক করলাম, গ্রামে একটি ‘হাসি-মেলা’ হবে—কাকুর স্মৃতিতে। সেখানে হাসির গল্প, মজার কীর্তি, কৌতুক-নকশা—সব হবে। শর্ত দুইটি—(এক) কাউকে খোঁচা দেওয়া যাবে না, (দুই) শেষে সবাই ‘হরি বল’ বলবে। মেলার দিন মাঠ জমে গেল। গোপালদা গল্প বলল—“একদিন কাকু আমাকে বললেন, ‘গো-মাংস খাস তো?’ আমি তো আঁতকে উঠলাম। কাকু হেসে বললেন, ‘আমি বলব—‘গো-মানুষ’ খাস না। পশুর মাংস খেলে চলে, মানুষের মন খেলে রইল কই?’” মাঠ রসালো হেসে উঠল। আবার বউ-ঝিদের দল নাচল ‘সনাই ডাকে’। শেষে ভোগ বিলিও হচ্ছে—সিঁদুর-দেওয়া নারকেল লাড্ডু। আমি লাড্ডু হাতে নিয়ে মনে-মনে বললাম—“কাকু, দেখছেন?” মনে হল, তিনি তুলসীমঞ্চের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, বলছেন, “আনন্দ, আনন্দ। হাসো।”
এই-সবের ভিড়ে কখন যে আমার ব্যক্তিগত জীবনেও কাকু সেঁধিয়ে গেছেন, টের পাইনি। চাকরির বদলি, শহরে থাকা—সব তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে কাকুর একখানা কথা চিন্তা করলে। যখন কাজের চাপ তীব্র, সম্পর্কের দড়ি টানটান, মন কেমন কাঁটাতারের বেড়া, তখনই ভেতরে ভেসে ওঠে—“রাগ কমাও, হাসি বাড়াও।” বউ মন খারাপ করলে আমি হেসে বলি—“হরি বল,” বউও হেসে বলে—“এই নাম কইছো আবার?” আমরা নাম নিয়ে ঝগড়া না করে হাসি তুলে নিই। কাকুর শিক্ষা এমনই—ভাঙা জিনিস জোড়া লাগানোর চেয়ে কঠিন কিছু নেই, তবে হাসি আঠা, নাম সুতো।
শেষে একটা কথা—কাকুর মৃত্যুর বছর ঘোরার দিনে মন্দিরে ‘শ্রাবণী শিবরাত্রি’ ছিল। আমরা সবাই আছি। বৃষ্টি পড়ে থামে, থেমে পড়ে। আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি—তুলসী পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা কেমন নেচে উঠছে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় ধূপের গন্ধ। ঘণ্টা বাজল, কীর্তন শুরু। আমি চোখ বন্ধ করলাম। সে-সময়ে কানে এল—কার যেন খুব পরিচিত সুর—“ভজে গোপাল, ভজে গোপাল।” চোখ খুলে দেখি, কেউ নেই। কিন্তু বটগাছের শেকড়ের নিচে সেই বৃদ্ধ বাঁদর বসে, ধীরে ধীরে লেজ নড়াচ্ছে। খালের জল হঠাৎ একচিলতে বেড়ে উঠল। মনে হল, দূর থেকে কেউ হাঁটছে—তাঁর ধুতি নড়ছে বাতাসে, কপালে টিপ, গলায় ওড়না। তিনি চলে যাচ্ছেন, আবার ফিরে তাকাচ্ছেন, যেমন আলো নিভতে-জ্বলে, ঠিক তেমন। আমি মাথা নোয়ালাম—হয়তো তিনি নয়, হয়তো তাঁর স্মৃতি। তবু মনে হল, তিনি হাসছেন—“ভয় কোরো না। আমি তো আছি—ঘণ্টায়, কাশফুলে, বাঁশির সুরে। নাম করো, হাসি রেখো।”
ফেরার পথে বৃষ্টি থেমে গেল। কাশবনের ভিতর বাতাসে সাদা ঢেউ উঠল। আমি মন্দিরের দরজা টেনে বন্ধ করলাম—ধুপে পোকা না ঢুকে। তারপর ধীরে হাঁটলাম খালের পাড় ধরে। পিছন থেকে কেউ ডাকল কি? মনে হল—“এই যে রাজার ছেলে, প্রসাদ নিয়ে যা!” আমি পেছনে তাকালাম—কেউ নেই। কেবল ঘণ্টার কাঁপুনি গলার কাছে এসে ঠেকল। পকেটে হাত দিলাম—একটা ছোট্ট বাঁশি। কবে যে রাখলাম, মনে নেই। ঠোঁটে তুলে সুর তুললাম—“ভজে গোপাল।” খালের ধারে অদ্ভুত এক প্রতিধ্বনি—সুরটি ঘুরপাক খেয়ে ফিরে এলো—“ভজে গোপাল, ভজে গোপাল।” মনে হল—কাকু বলছেন, “এই তো, ঠিক। রাগ কমাও, হাসি বাড়াও।”
কিছুদূরে এগোতেই দেখি, গোপাল দা—না, গুইসাপটা—রোদের বিচ্ছুরণে আধশোয়া। আমি থামলাম। সে ধীরে ধীরে চোখ তুলল। আমি নাম করে বললাম—“হরি বল।” গুইসাপটি মাথা নামিয়ে যেন প্রণাম করল। আমার পিঠের সব আঁশ দাঁড়িয়ে গেল। তারপর আমি হাঁটতে লাগলাম—মন্দিরের ঘণ্টা থেমে গেছে, খাল গুনগুন করছে। দূরে কোথাও দোলের আবিরের গন্ধ, কাছাকাছি বৃষ্টির জল। আকাশে হালকা এক ফালি রংধনু। মনে হল, নন্দলাল কাকু ওই রংধনুর এক প্রান্ত ধরে বসে বলছেন—“আনন্দ, আনন্দ।”
গ্রাম তার মানুষকে মনে রাখে। আর কিছু মানুষ আছে—যারা গ্রামকে মনে রাখতে শেখায়। নন্দলাল কাকু সেই দ্বিতীয় দলের। তিনি আমাদের সাধারণ দিন-রাতের ভেতর লুকোনো দেবালয় দেখিয়ে গেছেন—তুলসীর পাতায়, খালের ঢেউয়ে, বাঁশির সুরে, আর আমাদের হাসির মধ্যে। তিনি নেই—কিন্তু প্রতিটি উৎসবে, ঝগড়ার মাঝে, বৌভাতে ঝাল বেশি হলে, বা দড়ি খুলতে ভুলে গেলে—আমরা তাঁর কায়দা ভুলে যাই না।
এখনও কোনো নতুন ছেলে যদি জিজ্ঞেস করে—“কাকু কে?” আমরা বলি—“যিনি আছেন, না থাকলেও। মন্দিরের ঘণ্টার পাশে যাঁর নাম লেখা—‘রাগ কমাও, হাসি বাড়াও।’”
আর আমরা যখনই একসাথে “হরি বল” বলি, কোথা থেকে এক আস্তে হাসির আওয়াজ এসে আমাদের কানে বাজে—এই গ্রাম জানে, সেটা নন্দলাল কাকুর হাসি।🍁
🍁গল্প
মনে মনে জানে, আজ মাছ কিনতে পারবে না। বাড়ি ফিরে বউকে বলতে হবে, যেভাবেই হোক, শুধু সবজি দিয়ে চালিয়ে নিতে। বাচ্চারা হয়ত মন খারাপ করবে, তবু ওদেরকে বোঝাবে, একজন মানুষকে অন্তত একদিনের জন্য ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি।
আরমান ধীর পায়ে হেঁটে চলল বাড়ির পথে।
হরেকরঙের বাজার

তাহমিনা শিল্পী
লাউ লইয়া যান, লাউ… এই লাউ, তাজা লাউ!
চিৎকার করছে সবজির দোকানদার।
-এই লাউটার দাম কত? ক্লান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন বৃদ্ধা।
দোকানি তার দিকে তাকিয়ে উদাসভাবে বলল, ষাট টাকা।
বৃদ্ধা আঁচলের গিঁট খুলে কয়েন বের করলেন।
দশ টাকা, পাঁচ টাকা, কয়েকটা দুই টাকা ও এক টাকার নোট গুনলেন, তারপর কয়েন গুনলেন। সর্বসাকুল্যে পঁয়তাল্লিশ টাকা হল।
-বাবা, একটু কম নেন না? পঁয়তাল্লিশ টাকাই আছে। এরবেশি দিতে পারব না। অল্প কিছু চিংড়ি কিনেছি। আজ বাচ্চাদের জন্য কিছু রান্না করতে হবে। বাপ-মা মরা নাতিগুলারে ভালো কিছু খাওয়াইতে পারি না।
দোকানি বিরক্ত হয়ে হাত ঝেড়ে বলল, আমরা কি মাগনা পাই? ষাটের কমে হলে লস হবে।
বৃদ্ধার হাত কাঁপতে লাগল। চোখে জল চিকচিক করল। মুখে কষ্টের রেখা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি লাউটা আস্তে করে আগের জায়গায় রেখে দিলেন। তারপর মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন।
মস্তিষ্কে একের পর এক রীলে চলতে থাকল-
কাঁচাবাজারে বৃদ্ধার অপমান, শ্রমবাজারে আসমা,রাজু আর বৃদ্ধ শ্রমিকদের হাহাকার, পার্কে মীরার ভাঙা স্বপ্ন, হাসপাতালের করিডোরে অঙ্গ বিক্রির নির্মম দৃশ্য…
তার কেবলই মনে হতে লাগলো, এই শহর এক বিরাট বাজার। যেখানে সবকিছু বেচাকেনা হয়, এমনকী মানুষের জীবনও।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল আরমান। অফিস যাওয়ার আগে সে প্রতিদিন ভোরে কাঁচাবাজারে আসে। আজও হাতে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে হিসেব করছে, কী নেবে।
এমন সময় তার চোখ আটকে গেল বৃদ্ধার দিকে।
বয়স প্রায় সত্তরের কোঠায়। শাড়ির আঁচল মলিন, পায়ের স্যান্ডেলের ফিতে ছেঁড়া। হাতে পুরোনো কাপড়ের থলি।
আরমানের বুকটা কেঁপে উঠল। বাজার ভর্তি শাকসবজি, কিন্তু একজন বৃদ্ধা ষাট টাকার লাউ কিনতে পারলেন না। আরমানের হাতে থাকা টাটকা সবজির ব্যাগ হঠাৎই ভারী হয়ে গেল।
সেও মাথা নিচু করে এগিয়ে গেলো।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বাজারের রাস্তা ভিজে আছে গত রাতের বৃষ্টির পানিতে। নর্দমা থেকে কাঁদামাটি গড়িয়ে এসে রাস্তার ধারে জমে আছে।
রাস্তার শেষ মাথার মোড়ে প্রতিদিনের মতো আজও জমে উঠেছে আরেক বাজার।
শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে ঝুড়ি, কাঁধে কোদাল, কারও কাছে শাবল। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায়ও তাদের গায়ের কাপড় ভিজে যাচ্ছে ঘামে। তবু তারা দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এক ধরনের অস্থিরতা।
রাজু নামের এক কিশোর দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে। বয়স ষোল-সতের হবে। গ্রামের অষ্টম শ্রেণির পড়ালেখার পর আর এগোতে পারেনি। বাবার অসুখ, জমিজমা নাই, সংসারের টানাটানি, তাই শহরে এসে কাজ খুঁজতে হয়েছে।
তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আসমা। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। স্বামী দীর্ঘদিন অসুস্থ, শয্যাশায়ী। সংসারের বোঝা তার কাঁধেই। ভিক্ষার থালা হাতে বাচ্চাদের রেখে আসে বড় রাস্তার পাশে। তারপর দাঁড়ায় শ্রমবাজারে।
শুধু তরুণ-তরুণীরাই নয়, এখানে দাঁড়িয়ে আছে বয়স্করাও। কারও মাথা পাকা চুলে ভরা, কারও মুখে গভীর রেখা। কারও পা ফেটে আছে,হালকা রক্ত পড়ছে। কিন্তু চোখে একটাই আশা,কেউ এসে হয়তো বলবে,চল, কাজ করবি।
সাড়ে ছয়টার দিকে ঠিকাদাররা আসতে শুরু করল। কেউ সাইকেলে, কেউ রিকশায়। তারা মাঝামাঝি একটি জায়গায় দাড়িয়ে একবার সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিল।
-এই ছেলে, এদিকে আয়।
-এই মাইয়া তুইও আয়।
-ওই পোলা ওই, তোরেও লাগবে।
রাজু এগিয়ে যায়।
-আরে, তুই না, ওই যে ওই পোলাডা। ঠিকাদার চোখ রাঙিয়ে বলে।
রাজু সামনে গিয়ে হাতজোড় করে বলে,
-স্যার, আমারে নেন। আমি সব কাজ পারমু।
-না, আজকে লাগবে না। আরেকদিন দেখুমনে। ঠিকাদার মাথা নেড়ে বলল।
ঠিকাদাররা অপেক্ষাকৃত তরুণদের ডাকে। শক্ত শরীর, তরতাজা বয়স যাদের, তাদের দরকার হয়।
আসমাকে ডেকে নিল এক ঠিকাদার। বলল,
-ইট টানতে হবে, মজুরি অর্ধেক। রাজি থাকলে চল।
আসমার বুক ধকধক করে উঠল। এত অল্প টাকায় সংসারের খরচ সামলাতে পারবে না, কিন্তু ফিরেও যেতে পারবে না। মাথা নিচু করে রাজি হয়ে গেল।
কিন্তু যারা বয়স্ক, তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।
বৃদ্ধ রফিক দাঁড়িয়ে ছিল সকাল থেকে। ফাটা কণ্ঠে কয়েকজন ঠিকাদারকে বলল,
-স্যার, আমারেও নেন। কাম না করলে খামু কেমনে? পেটের ক্ষিদা তো মরে না।
একজন ঠিকাদার একবার দেখে নিল। তারপর চোখ সরিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,
-না,তুমি পারবা না। আজাইরা ঘ্যানঘ্যান কইরো না।
সূর্য উঠতেই বাজার ফাঁকা হয়ে গেল।
রফিকের চোখ ভিজে উঠল। বুকের ভেতর ক্ষুধা চেপে ধরল। কাজ না পেয়ে সে হেঁটে গেল পাশের গলিতে। সেখানে ফুটপাথের কোণে কিছু ভিক্ষুক রোজ বসে। আজ রফিকও তাদের সঙ্গে বসে গেল।
যারা আগে থেকে বসে ছিল তারা ক্ষেপে গেলো। বলল,
-পুরান পাগলরা ভাত পাই না। তুমি আইছো ভাগ বসাইতে। বিদায় হও, বুড়া।
বৃদ্ধ রফিক চোখ নামিয়ে করুণ গলায় ফিসফিস করে বলল,
-ভাই, আমিও আইজকা বসি তোমাগো লগে। তিনদিন ধইরা পানি ছাড়া আর কিছু খাই নাই। গরিব যদি গরিবের কষ্ট না বোঝে ভাই,তাইলে কারা বোঝবে? একটা পাউরুটি আর চায়ের দাম হইলেই আমি চইলা যামু।
বসতে দেয়ে তো দূর, উল্টে সবাই মিলে রফিকের দিকে তেড়ে আসলো।
মাঝে দাঁড়িয়ে গেল আরমান। সবাই থামিয়ে রফিককে সরিয়ে নিল।
আরমানের দিকে তাকিয়ে করুণ চোকে রফিক বলল,
বোঝলেন বাবা,মানুষের শরীর যখন আর কাজে লাগে না, তখন তার একমাত্র ভরসা হয় ভিক্ষার বাজার। আমার কপালে তাও নাই।
আরমানের বুকের ভেতর ব্যথা জমাট বাঁধল।
গরিব মানুষ দেখলে আরমান সাহায্য করতে চায়, কিন্তু পকেটের সীমাবদ্ধতা তাকে আঁকড়ে ধরে। সেই অপারগতা তাকে কুড়েকুড়ে খায়। তবু আজ বৃদ্ধ রফিকের দিকে তাকিয়ে আরমান নিজেকে আটকাতে পারল না। সে পঞ্চাশ টাকা বের করে দিলো রফিকের হাতে।
মনে মনে জানে, আজ মাছ কিনতে পারবে না। বাড়ি ফিরে বউকে বলতে হবে, যেভাবেই হোক, শুধু সবজি দিয়ে চালিয়ে নিতে। বাচ্চারা হয়ত মন খারাপ করবে, তবু ওদেরকে বোঝাবে, একজন মানুষকে অন্তত একদিনের জন্য ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি।
আরমান ধীর পায়ে হেঁটে চলল বাড়ির পথে।
বাড়ি ফিরে নাস্তা সেরে, তৈরি হয়ে অফিসে এল।
অফিসে বসেও আরমান অস্বস্তি কাটাতে পারে না। সহকর্মীদের মাঝে বৈষম্য চোখে পড়ে। সে জানে, যতই পরিশ্রম করুক, প্রাপ্য সম্মান আর সুযোগ সে পাবে না। কারণ, বসদের তোষামোদি সে জানে না। যে দু-চারজন নিয়মিত তোষামোদ করে, তারা অফিসের প্রকৃত কাজের চেয়ে গল্পগুজবেই বেশি সময় কাটায়, অথচ প্রমোশন তারাই পায়, বেতন বৃদ্ধির সুযোগও তাদের হাতেই যায়।
আরমান এসব ভেবে বুকের ভেতর ক্ষোভ আর হাহাকার জমায়, কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। বেতনের টাকায় টানাটানিতে সংসার চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দুই সন্তানকে ভাল স্কুলে পড়াচ্ছে। ওদের টিউশন ফি, বই, ড্রেসে বড় অংকের টাকা বেরিয়ে যায়। সব মিলিয়ে মাসের শেষে হাত খালি হয়ে যায়। প্রমোশন নেই, স্যালারি তুলনামূলক কম, অথচ খরচ প্রতিদিন বাড়ছেই।
এই টানাপোড়েনেই আরমান নিজের অনেক ইচ্ছে দমন করে রাখে।
অফিস শেষে আনমনে হাঁটতে থাকে আরমান। কিছু টাকা সাশ্রয় করতে প্রায়ই হেঁটে বাড়ি ফেরে।
সন্ধ্যা নামলেই শহরের অন্য রূপ। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় পার্কের ধারে অপেক্ষাকৃত অল্প আলোয় দাঁড়িয়ে থাকে কিছু নারী। তাদের হাতে অদৃশ্য সাইনবোর্ড,আমি বিক্রির জন্য।
মীরার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। একসময় গার্মেন্টসে কাজ করত। তার স্বপ্ন ছিল সেলাই মেশিন কিনে ঘরে কাজ করবে।স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করবে। মালিকের অন্যায় আর দুর্নীতির কারণে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করে স্বামী ছেড়ে যায়। রেখে যায় তিনটি বাচ্চা। ছোটটার বয়স এগারো মাস।
বস্তির ঘর ভাড়া দিতে হবে, খাবার কিনতে হবে, বাচ্চার জন্য দুধ আনতে হবে। কাজের জন্য অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াল, কোথাও সুযোগ পেল না। শেষ পর্যন্ত জীবনের চাপ তাকে ঠেলে এনেছে এই অন্ধকার গলিতে।
আজও সে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অনিচ্ছা, চোখে গভীর ক্লান্তি।তবু খদ্দেরের অপেক্ষা…
একজন মাঝবয়সী লোক এসে দাঁড়াল।
-কত?
মীরা নিচু গলায় দাম বলল।
লোকটি হেসে বলল,
-বেশি। অর্ধেক দিব।
মীরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। লোকটি পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
আরেকজন এল। সে মেনে নিল, তবে শর্ত দিল,পার্কের একদম পিছনের ঝোপের আড়ালে যেতে হবে।
মীরার বুক কেঁপে উঠল। অন্ধকার জায়গা মানেই ভয়, উন্মাদনা সহ্য করা, এমনকী মৃত্যর ঝুঁকি। তবু ক্ষুধার্ত সন্তানদের মুখ মনে পড়তেই ঝুঁকি নেয়। বিনা বাক্যে রাজি হয়।
হঠাৎই মীরার চোখের সঙ্গে চোখ মিলে যায় আরমানের। অচেনা চোখ, তবু যেন ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। সেই চোখে ছিল দারিদ্র্যের অপমান, বেঁচে থাকার লড়াই, অসহায়ত্ব।
নিজের বোনের মুখটা মনে পড়ে। ভীষণ মায়া হয় আরমানের।
ছোটবোনটির বয়স ছিল উনিশ বছর। ভালবাসার ফাঁদে পড়েছিল। প্রেমিক তাকে বাড়ি থেকে পালাতে বলেছিল। দালাল প্রেমিকের হাত ধরে অবুঝ ব্বোনটি পালিয়ে গিয়ে বিক্রি হয়েছিল পণ্যের মত, পাচার হয়েছিল বিদেশে। অথচ আরমান তখনও জানত, কেবল পণ্য কেনাবেচা। এই ঘটনার পর বুঝেছিল, মানুষও বেচাকেনা হয়।
কোথায় আছে তার বোন কেউ জানে না। হয়তো আর কোনোদিন ফিরবে না।
চোখ ভিজে উঠল আরমানের। ডান হাতে চোখ মুছে এগিয়ে চলল।
পথে যেতে সরকারি হাসপাতাল পড়ল। সঙ্গে ফার্মেসিও আছে। প্রয়োজনীয় একটি মেডিসিন কিনতে দাঁড়াল আরমান।
পাশেই কপাল চাপড়ে আহাজারি করছে এক নারী।
একটু এগিয়ে গেল আরমান। যতটুকু বোঝা গেল, তাতে এখানে আরেক বাজারের গন্ধ পেলো।
এক দরিদ্র লোক বসে আছে ডাক্তা্রের চেম্বারের ভেতরে। বাইরে তার স্ত্রী কাঁদছে।
দরজার বাইরে থেকে দেখল,লোকটির চোখে আতঙ্ক, কিন্তু গলায় বেশ জোর। ডাক্তারকে বলছে,
-স্যার, সে একজন বেক্কল মাইয়া লোক। তার কান্দোনে কান দেওয়ার দরকার নাই। কিডনি বেঁইচা টাকা লাগব। যৌতুক না দিলে আমার পোয়াতি মাইয়ার সংসার ভাইঙ্গা যাইব। আপ্নে ব্যবস্থা করেন।
ডাক্তারের পাশে বসা দালাল ফিসফিস করে দাম ঠিক করল। বউয়ের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হল, আর লোকটিকে পাঠানো হল অপারেশন থিয়েটারের দিকে। সেই নারী আগের চেয়েও জোরে কান্না শুরু করলো। শোরগোল পড়ে গেলো হাসপাতালের করিডরে।
একই সময়ে পাশের কক্ষে ধনী রোগীর অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছে। তার জীবন বাঁচবে, কারণ দরিদ্রের শরীর কেটে অঙ্গ বের করা হচ্ছে।
অপারেশনের পর লোকটি অর্ধেক প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকবে। মেয়ের বরের হাতে তুলে দিবে কিছু টাকা। তাতে এ যাত্রা মেয়ের সংসারটা টিকে গেলেও, আজীবনের নিশ্চয়তা রইল না। লোকটি হয়ত অক্ষম হতে হতে আরও দরিদ্র হবে। হয়ত ধুকেধুঁকে বাঁচবে,কিংবা মারা যাবে। তার এই ত্যাগের বিনিময়েও সমাজের চোখে, মেয়ের স্বামীর কাছে এমনকী ওই ধনী ব্যক্তির কাছে সে কেবল একজন বিক্রেতা,যে একটি অঙ্গের দামে তার শরীর ও সুস্থতা বিসর্জন দিল।
আরমানের হঠাৎ গা গুলিয়ে উঠল। মাথা ঘুরতে লাগলো।
মস্তিষ্কে একের পর এক রীলে চলতে থাকল-
কাঁচাবাজারে বৃদ্ধার অপমান, শ্রমবাজারে আসমা,রাজু আর বৃদ্ধ শ্রমিকদের হাহাকার, পার্কে মীরার ভাঙা স্বপ্ন, হাসপাতালের করিডরে অঙ্গ বিক্রির নির্মম দৃশ্য…
তার কেবলই মনে হতে লাগলো, এই শহর এক বিরাট বাজার। যেখানে সবকিছু বেচাকেনা হয়, এমনকী মানুষের জীবনও।
আরমান ঘামতে শুরু করলো। চোখে ঝঁপসা দেখতে লাগলো।
ধুপ করে পা ছড়িয়ে পথের ধারে বসে পড়ল। কাঁধের ব্যাগ থেকে বোতল বের করে ঢকঢক করে পানি খেল, চোখে-মুখে,মাথায় পানি দিলো। তারপর কোনও মতে টলতে টলতে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে।
এ পথ ক্রমেই দীর্ঘ হতে থেকে, কিছুতেই যেন আর ফুরায় না… 🍁
🍂কবিতা
স্বপন কুমার ধর

অপ্রত্যাশিত
আমার কোন স্বপ্ন ছিল না,
ছিল না কোন লক্ষ্য বা চাহিদা,
স্বপ্নপূরণের প্রশ্ন ও তাই ছিল না।
আমার কোন ঘর ছিল না,
বাস করেছি খোলা আকাশের নীচে,
কখনো গাছের তলায়,কখনো ফুটপাথে।
আমার কোন বন্ধু ছিল না,
পরিচিতরা ও ছিল সাময়িক,
উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে,চলে ও গেছে।
আমার কোন প্রেমিকা ছিল না,
রুপে গুনে ও কেউ আকৃষ্ট হয় নি,
নিঃস্ব হওয়ায় কেউ জোটে ও নি।
নিঃসঙ্গ জীবনের একাকীত্বতায় আমি আবদ্ধ,
কোন কিছুই আমাকে আকৃষ্ট করে না,
না-পাওয়ার ইচ্ছে ও মোহগ্রস্ত করে না।
আমার কোন বাধ্যবাধকতা নেই,
ছন্দময় জীবনের পিছুটান ও নেই,
“আগামীর কথা” ও আমাকে ভাবায় না।
উম্মে হাবীবা

লিলাবালি
আশ্বিন ফুরিয়ে যাক।
কার্তিকের আকালে আমাদের ঘর হবে লাল টালির ছাদে। ফিঙেরা সারা সকাল নেচে ঘোষণা করবে আকাল। সোনার নাক ফুল বন্ধক রাখবো। ভোরে উঠে পুকুরের পোনামাছ জেলের জালে তড়পাতে দেখলে দুঃখ পাব না। কার্তিকের দিন গুনব দু’জন। আমাদের ঘর জুড়ে অভাব। নুন নেই, চাল নেই, তেল নেই একফোঁটা জ্বালানী। অন্ধকারে বসে থাকি মুখোমুখি। অন্ধকারে জড়াজড়ি শুই। কবে হবে ঘর, অভাবের সংসার। সারাদিন না খেয়ে চুমুর তিয়াসে
পুড়ে যাবে দু’জনের ঠোঁট।
আশ্বিন ফুরিয়ে যাক। আশ্বিন ফুরিয়ে যাক এবার। আমাদের ঘর হোক লাল টালির।
লিলাবালি লিলাবালি গানে ব্যস্ত হয়ে উঠুক পাড়ার মেয়েরা।
বৃন্দাবন দাস -এর তিনটি কবিতা

নাক না গলাইলেই হইল
আমদের বয়স্ক কবিরা এখন যত্রতত্র
জ্ঞানগর্ভতা বিলোতে থাকেন
তখন উপলব্ধ হয় তবে কি জ্ঞান কম পড়িয়াছে
এদেশে আর যাহা হউক জ্ঞানের আকাল তো ঘটে নাই
এক্ষণে নিশ্চিত ছেলেছোকরারা বাচাল হইয়াছে বটে
বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের তেমন নাকি মান্যতা দিচ্ছেন না
এদিকে যাহারা নেতা-নেত্রী হইবেন
তাহারাও নাকি মান্যতা আদায়করণ বহুবহু শিখিয়াছেন
ফলত আলাদা রকম শিক্ষাগৃহ ও বশীকরণগৃহ
বাছিয়া লইতে হয় অন্যরকম ভাষা রপ্তকরণ- নিমিত্ত
আমরা মিছেমিছি দ্বন্দ্ব করিয়া ‘সমাজ সমাজ’ করিব
সমাজ কিন্তু নিজের মতই চলিতে থাকে
বয়স্কমার্কা লোকজনের নাক না গলাইলেই হইল—
নক্ষত্ররা
যে ভূখণ্ডে কবি থাকে না
সেখানে মানুষ থাকবে এ কেমন কথা
একটু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াও
তারপর দশদিশি না হলেও
চারপাশটা দেখে নাও গাজনের পারা
তাকাও, আঙুলের ফাঁকেও ফাঁকি দাঁড়িয়ে আছে
সূর্যাস্ত সূর্যোদয় দেখেও চোরাবালি ধরতে পারবে না
রক্তের শিশির দেখে নক্ষত্ররাও
এখান থেকে ভালোবাসা তুলে নিয়ে যায় —
আর্যাবর্ত
তোমার নামের মতোই
এই নামের পাশে যাদের থাকার কথা, প্রত্যেকেই ছিল
আজ তুমি যাদের খুঁজে পাচ্ছো না
তারা আর্যাবর্তেও ছিল না
ফলত বর্তমান আর আর্যাবর্ত
আমাদের চর্চার আমাদের মননের আমাদের লালনের
তুমি নাই-বা বললে অন্যকথা অন্যরকম
মূলত আর্যাবর্ত কোন ভূমির নাম নয়
একটি দখলদারি মাত্র—
মিতা নূর

মুক্তি দিলাম
মুক্তি নিবি ছেলে তুই!
মুক্তি, তবে চল,
আজ তোকে মুক্তিই দিলাম।
যখন খুব একা থাকবি, দেখবি ঐ আকাশ,
দেখবি ছেলে তুই, একাকীত্ব আর বিষন্নতায়।
আমিই তোর একমাত্র আকাশ ছিলাম।
🍁গদ্য
হয়ত ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়ের ভেতরে কিছুটা হলেও মিল পাই। কিন্তু পাই না পোশাক -আশাকে সবকিছুই যেন কেমন বদলে গেছে। আমরা সেভাবে মণ্ডপে সেজেগুজে কখনো যাইনি কেমন ছোট্টবেলায় গ্রামের সঙ্গী- সাথীরা মিলে বেরিয়ে পড়তাম দুপুরবেলায় ঠাকুর দেখতে।
পুজোর গন্ধ

মমতা রায় চৌধুরী
”ওওও আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে
ঢ্যাম কুড়কুড় ঢ্যাম কুড়াকুর বাদ্দি বেজেছে”
এই গানটা শুনলেই মনে হয় পুজো এসে গিয়েছে। পুজো আসলেই মনটা প্রজাপতির মতো কেমন উড়ু উড়ু উড়ু বুকটা কেমন যেন হয় দুরু দুরু দুরু। কেন আজ পঞ্চাশের কোঠায় এসে এরকম অনুভূতি, কেন এরকম নস্টালজিক হয়ে যায় জানি না। তবে মনটা যেন সেই বাল্য কৈশোর ছুঁয়ে যায়। মাটির গন্ধ, কাশ ফুলের ছোঁয়া, শিউলির পরশ, পদ্মের হাতছানি, নীল আকাশ শুভ্র মেঘের আনাগোনা আর যদি কোন প্রিয়জন অপেক্ষা করে থাকে, যদি সেটা হয় স্কুল জীবনের স্মৃতি যেটা আজও হৃদয়ের মনের গভীরে অনুরাগে রঞ্জিত।
আমার ফেলে আসা অতীতকে আবার আঁকড়ে ধরতে চাই। অতীতকে ঘিরেই যেন বর্তমানের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে চাই। বাপের বাড়ি গেলে হয়ত কোনওবার বৈশাখীর সঙ্গে দেখা হয় মনে পড়ে যায় ওদের খুনসুটির কথা। কিন্তু তাতে আর প্রাণ নেই। গ্রামীণ জীবনেও কেমন বদলে গেছে শহুরে হাওয়া যে প্রবেশ করেছে চোরা স্রোতের মতো সর্বত্র।
সবাই কেমন বলবে আমি পাগল না, আসলে আমি স্পষ্ট করে বলতেই ভালবাসি। সকলের মনে কিছু না কিছু স্মৃতি আছে হয়ত সেই স্মৃতি আজ আর গোলাপি খামে ভাস্বর হয়ে ওঠে না। কিন্তু আমার একদম ফিকে হয়ে যায়নি। আমি যেন প্রতি পুজোতেই নতুন করে আবিষ্কার করি নিজেকে। কেমন যেন ওই যে ক্লাস নাইনে পড়তাম হ্যাঁ মনে পড়ে বৈশাখীর কথা ও বলেছিল জানিস তো আজ না আমি তরুণের সঙ্গে দেখা করব পূজা
মণ্ডপে। ওদের এই ছোট্ট ছোট্ট গভীর প্রথম প্রেমের অনুভূতি আমার মন ছুঁয়ে যেত। হ্যাঁ, কখনও আমি সাহস করে এগোতে পারিনি। না আমার মনে কখনও দাগ কাটেনি ভালবাসা জীবনে আসেনি প্রথম জীবনে চোরা স্রোতের মতো এটা যদি অস্বীকার করি তাহলে ডাহা মিথ্যে কথা বলা হবে। তবে এটুকু বলতে দ্বিধা করি না অপরের বা বন্ধুদের প্রেমের অনুভূতিগুলো যখন শেয়ার করতো সেটাই যেন আমার মনের সব থেকে বেশি আনন্দ এনে দিত।
হ্যাঁ আমি লক্ষণ রেখার বাইরে হাঁটতে শিখিনি তখনও কারণ সেটা ছিল আমার পারিবারিক শিক্ষা। জীবনে ভাল-মন্দ বিচারবোধ তখন আমার হয়ে ওঠেনি। এই বোধটাই বারবার বাবা মা সব সময় বয়সন্ধিকালে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। তবে যাক সে কথা আমি আসি বৈশাখীর কথায়। হ্যাঁ সেদিন ছিল নবমীর রাত। নবমীর সন্ধ্যে থেকেই ওর মধ্যে কেমন একটা গভীর উদগ্রীব লক্ষ্য করেছিলাম তেমনি আমার ভেতরেও ছিল ওদের পরস্পরের ভেতরের সেতু হিসেবে। হ্যাঁ, মনে পড়ে তবে সেটা হাসির দিক হয়ে উঠেছিল তরুণ এসে বৈশাখীর মুখরা মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারেনি ও কেমন যেন একটা ভয় পেয়ে বোকা বনে গেছিল চিঠিতে যেভাবে তার প্রেমের ভাষাটাকে ব্যক্ত করেছিল, বৈশাখীর জীবনের ঝড় তুলেছিল, সেই ঝড়টা পূজো মণ্ডপে তুলতে পারেনি। তার জন্য অবশ্য বৈশাখী অনেক আফসোসও করেছিল। তবে হ্যাঁ আজ বৈশাখী তরুণ ভিন্ন স্রোতে বয়ে গেছে। কিন্তু আজও যদি বাবার বাড়িতে যাই মা যখন ডাকতেন, ‘ডাকতেন’ শব্দটা ব্যবহার করলাম কারণ এখন আমার মা আর ইহলোকে নেই, তাই সেভাবে আর বাপের বাড়ি গিয়ে ওঠা হয় না। তবে পুজো আসলে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ঢাকের কাঠি মনে করিয়ে দেয় অনেক কথা আমার সেই মেয়েবেলার, কৈশোর বেলার স্মৃতি ।আজ মা নেই তাই সেভাবে আর হয়তো যেয়ে উঠি না। কিন্তু মায়ের আকুল আকুতি বারবার টেনে নিয়ে যেত সেই নবমীর রাত। আর যাই করি না কেন নবমীর দিন বাপের বাড়িতে যেতেই হবে আর বাপের বাড়ি যাওয়া মানেই সেই মেঠো ভাটিয়ালি সুরে বাঁধা গ্রাম্য জীবন। আমার ফেলে আসা অতীতকে আবার আঁকড়ে ধরতে চাই। অতীতকে ঘিরেই যেন বর্তমানের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে চাই। বাপের বাড়ি গেলে হয়ত কোনওবার বৈশাখীর সঙ্গে দেখা হয় মনে পড়ে যায় ওদের খুনসুটির কথা। কিন্তু তাতে আর প্রাণ নেই। গ্রামীণ জীবনেও কেমন বদলে গেছে শহুরে হাওয়া যে প্রবেশ করেছে চোরা স্রোতের মতো সর্বত্র। শহুরে জীবন থেকে বাঁচার জন্য একটু যাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জন্য গ্রামীণ পরিবেশে। আজ গ্রামীণ পরিবেশেও সেই নাগরিক সভ্যতার দাপট আমি হাঁপিয়ে উঠি। সেই ছোট্টবেলার ছেলে-মেয়েবেলার দিনগুলোকে খুঁজে পেতে। গ্রামীণ ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মধ্যে খোঁজার চেষ্টা করি। হয়ত ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়ের ভেতরে কিছুটা হলেও মিল পাই। কিন্তু পাই না পোশাক -আশাকে সবকিছুই যেন কেমন বদলে গেছে। আমরা সেভাবে মণ্ডপে সেজেগুজে কখনো যাইনি কেমন ছোট্টবেলায় গ্রামের সঙ্গী- সাথীরা মিলে বেরিয়ে পড়তাম দুপুরবেলায় ঠাকুর দেখতে। আমাদের গ্রামীণ পুজোগুলো অনেক দূরে দূরে হত এখন যেমন বারোয়ারি দুর্গা পুজোগুলো যেন ঘরের পুজো হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে পাড়ায় পাড়ায় অনেক পুজো হয়। যেন মনে হয় লক্ষ্মীপূজো হচ্ছে। আসলে এখন সরকারি অনুদানও তো অনেক পাওয়া যায়। তখন বারোয়ারি পূজো মানে গ্রামের মানুষ সব একজোট হয়ে পূজা করত। কত মানুষের ভিড়। সন্ধ্যেবেলা ধুনুচি নাচ, কবিতা আবৃত্তি ,ছড়া, গান, নাচ কখনো কখনো নাটকের প্রতিযোগিতা ও হতো।
এগুলো দেখার জন্য আমাদের মনটা মুখিয়ে থাকত। কিন্তু এখন গ্রামে গেলে দেখতে পাই যে সেখানে ডিজে বাজানো হচ্ছে সত্যি প্রাণ খোলা গ্রামের সেই আবেদন আর পাই না তেমন করে। জানিনা পুজোর গন্ধটা হয়তো রয়েছে বারুদের গন্ধ পুজোর গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ঢাকির বাদ্যের সঙ্গে কিন্তু আমাদের মনের খোরাক পূরণ হয় না। আর সেই অনুভূতির ভিটেতে যেতেও আর ইচ্ছে করে না কারণ মৃন্ময়ী মাকে দর্শন করার জন্য আমার চিন্ময়ী মায়ের আবেদন সেখানে নেই। মা আজ অনেক দূরে পুজোর গন্ধ মা স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যেন বলে দিয়ে যায় চল আবার গ্রামে চল। আমার বাড়িটা যে খাঁ খাঁ খাঁ করছে, তোরা না আসলে যে আমার বাড়ির আনন্দটাই আর পূজো হয়ে ওঠে না।
স্বপ্ন ভাঙলে মনটা বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে যায় কিন্তু যখন আবার ঢাকের কাঠি বেজে ওঠে তখন
পুজোর গন্ধে মাতোয়ারা হই। এ যেন সেই গানটার মত মন হয়ে যায় ‘যদি কিছু আমারে শুধাও /কি যে কথা কবো/ নীরবে চাহিয়া রবো/না বলা কথা বুঝিয়া নাও।’🍁
রণজিৎ সরকার -এর তিনটি লিমেরিক

লিমকা-লিমেরিক
ঘোড়ার টিপ
পি-এ কোলে করছ কেলি তুমি আমার হাবি
অফিস যাবার তাড়া কেন তাই তো কেবল ভাবি
কাজের নামে পরকীয়ায়
এই ছিল তোমার হিয়ায়
ঘোড়া টিপে দিচ্ছি এবার খাও তবে খাবি
কাঁঠালের আঠা
পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছিল ওরা রোজ
কেউ জানে না কেউ দেখেনি করেনি কেউ খোঁজ
হঠাৎ উদয় ই ডি বাবার
ত্রিশূল হাতে করল সাবার
কাঁঠাল কোয়ায় কত আঠা এবার তোরা বোঝ
নোবেল কল
টুম্পা টুম্পা কোমর দোলায় যত অপগণ্ডের দল
নোবেলটি যে চুরি গেল কোথায় তার তদন্তফল
জানল না আমজনতা
কী করলেন মা মমতা
রেপ্লিকা নিয়ে কী করব ধুয়ে ধুয়ে খাব জল!
ক্লিনার
আহামরি চমৎকার ভারী পিসার হেলানো মিনার
দেখতে ছোটে মজা লোটে খচ্চা করে দিনার
পিসির হেলানো বাড়ি
হাল-ফ্যাশান তারি
ভাইপোরা সব স্বচ্ছ অতি সাফাই কাজে ক্লিনার
🍁চিঠি-সাহিত্য
আকাশ এমন অজস্র কথা জমে আছে যা বলিনি। বলা হয়নি এই দুটো হাত দিয়ে খুন করেছি স্নেহের। রাক্ষুসে অচেনা পথে ছেড়ে এসেছি বকলেস খোলা মাতৃত্ব। যে দশটা বছর উপচে পড়ছিল বাৎসল্য কী অনায়াস দক্ষতায় ছেড়ে এসেছি তাদের। চোখ বন্ধ করলে এখনও বুকে বাজে সে আকুল করা ডাক।
যেসব চিঠি কাগজের নৌকো

সোমপ্রভা বন্দোপাধ্যায়
শ্রী
আকাশ
তোমাকে চিঠি লেখার আয়োজনে ফুরিয়ে ফেলছি আয়ু। কলমে বিষন্নতা ছড়াতে যে মেঘ জুগিয়েছে ইন্ধন তাকে পোস্ট বক্সে ফেলে আসব বিনা ঠিকানায়। এত এত বছর পরও সোচ্চারে বলতে পারিনি যা ,আজ অকপটে লিখব। মা জানতে পারেনি আমার প্রথম চুমুর কথা অথচ সেদিন থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়ে গেছে বুকজল। যেন আস্ত এক নদী ফুলেফেঁপে উঠে ভাসিয়ে দেবে গালের বিন্দু। সংস্কারের বেড়ি খসিয়ে যে হাত ছুঁয়েছিল স্তন সে হাতে হাত রাখা হয়নি। আজীবন সহ-বাসের প্রতিশ্রুতি ভেসে গেছে ড্রেনের জলে। পরবর্তীতে যেসব প্রেমিক রেখেছিল ফলক থেকে ফলকের হিসাব তাঁরা বয়সে প্রায় কাকুর সমান। তবুও তাঁদের বুকে মাথা রেখে খুঁজতে চেয়েছি বাবা গন্ধ – আশ্রয়। হোঁচট শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে গাছ হতে হয়। ক্ষণজন্মা মেঘের চেয়ে ঢের ভালো গনগনে আঁচ। গভীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাতকের গল্প।
এখন শরীর জুড়ে আগুন প্রবণতা। ঠোঁটের নিচে যে দাগ ছেড়ে গেছে ভ্রমর তাকে বন্দী রেখেছি কৌটোয়। বেগড়বাই করলেই কচলে দেব। হুল ছিঁড়ে ফেলতে সময় নেবে না দুটো হাত। অথচ একসময় এই হাত দুটো সম্বল করেই ভিক্ষা চেয়েছি পূর্ব প্রেমের কাছে। একাকীত্বের কাছে। বলেছি এত শূন্যতা নিয়ে কীভাবে বাঁচব। বিনা অপরাধে এ কোন নির্বাসন দিলে প্রভু। এ যুবতী বয়স সহ্য করতে পারবে না। তবে তুমি মৃত্যু দাও অথবা করে দাও প্রৌঢ়।
এখনো পেছনে ফিরলে আগ্নেয়গিরি থেকে উড়ে আসে মড়া ছাই। পাথরে পথে ছড়িয়ে আছে মৃত ফুল। খুচরো পয়সা। শত ছিন্ন কাপড়ে লজ্জা নিবারণের বৃথা চেষ্টা করা হাত যেদিন খেতে চেয়েছিল তাঁর পাত সাজিয়ে ছিলাম ছাপান্ন ভোগে। রঙিন বস্ত্র পরিয়ে বলেছিলাম অপ্সরা হয়ে ওঠো। তারপরেই বোধহয় পাল্টে গেছে ভাগ্যলিপি।
আকাশ… আকাশ এমন অজস্র কথা জমে আছে যা বলিনি। বলা হয়নি এই দুটো হাত দিয়ে খুন করেছি স্নেহের। রাক্ষুসে অচেনা পথে ছেড়ে এসেছি বকলেস খোলা মাতৃত্ব। যে দশটা বছর উপচে পড়ছিল বাৎসল্য কী অনায়াস দক্ষতায় ছেড়ে এসেছি তাদের। চোখ বন্ধ করলে এখনও বুকে বাজে সে আকুল করা ডাক। পাপের নমুনা আমাকে পাতে নিতে দেয় না কাঁচা লবণ। তবুও তো আমি বেঁচে আছি। ভাবতে অবাক লাগে এই আমিটাই অপেক্ষা করেছি মরিচীকার। কতবার দোজখের আগুন ঝলসে ছিল ইহজন্ম।
আজ এইটুকুই থাক। সময়ের এমন অনেক কথা আছে যা একমাত্র স্বীকার করে যাব তোমার কাছে। সামলে রেখো। দলিল দস্তাবেজ। মৃতবৎ স্বীকারোক্তি।
ইতি,
বৃষ্টি বাহানা
দেবাশিস সাহা -এর তিনটি কবিতা

পিতা
ঘুমিয়ে আছে সকল পিতা
সব শিশুরই অন্তরে
বাবা বললেই মাথার উপর একটা ছাতা খুলে যায়।
বাবা,পিতা,ড্যাডি, বাপু,বাবু- কত নামেই ডাকা যায়।সাড়া পেলেই মিলে যায় অবলম্বন আর মুশকিল আশান।
প্রাণীজগৎ এবং উদ্ভিদজগৎ এর ব্যতিক্রম নয়।সেখানেও নির্ভরতা কাজ করে।
আমার বাবা
স্মৃতি হাতড়ে পাই। তিন চার বছর যখন বয়স বাবার সাইকেলের কেরিয়ারে আমার বাবু হয়ে বসে বিশ্বদর্শনে বের হওয়া। বাবা রোদে রোদে চাষবাসের কাজ কখনো কখনও ব্যবসার প্রয়োজনে রোদে রোদে সাইকেল নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে যায়। তারপর স্কুল পেরিয়ে কলেজ যাবার পথে বাবার কঠোর শাসন। আমাকে সর্বদা ভীত ও সন্ত্রস্ত রাখত। সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরতে হবে এটা ছিলো ফরমান।আমার সবসময় বিরক্ত লাগতো। শাসনের মধ্যেও যখন বাবা বুকে টেনে নিতো।লোমশ বুকে আশ্বাসের ঘুম।শাসন আর সোহাগের মধ্যে দিয়ে বড়ো হলাম। বাবা হলাম।
বাবা হয়ে আরো বেশি করে বুঝলাম বাবা হওয়া কত কঠিন।
আমি যখন বাবা
বাবা হবার নানা স্বপ্ন নানা রঙের হয়ে হয়ে উঠছে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন – সাধ পুত্রের মধ্যে দিয়ে পূরণের ইচ্ছে। সবকিছু হয়না।যে শাসন আমাকে আহত করেছে সেটা আর আমি ব্যবহার করিনি।সোহাগের মধ্যে দিয়ে বড়ো করতে চেয়েছি আত্মজকে।সন্তান খোলা মাঠ পেয়ে এলোমেলো বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। তখন আবার বাবার কথা মনে পড়ছে।
সংসারের মোট বয়ে নিয়ে যাওয়া বাবা কখনো কোনো দিন কাউকে খুশি আর সুখী করতে পারেনা।যদিও সুখ ভীষণ আপেক্ষিক। তবে আমার কাছে বাবা একটি আকাশ রঙের ব্ল্যাকবোর্ডে। এখানে যেকোনো বায়না লেখা যায়।লিখে রেখে দিলে চলে আসে।
বায়নাক্কা , আবদার মায়ের কাছে করলেও গড়িয়ে গড়িয়ে বাবার কাছে চলে আসে।বাবা কখনো কাউকে ফেরায় না।
ক্ষুধার্ত সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য একজন পিতা,একজন বাবা ভোজবাড়ির বাইরে পড়ে থাকা খাবার অতিরিক্ত খেয়ে আসে।বাড়িতে এসে গলগল করে বমি করে।খিদে পেটে সন্তান তৃপ্ত করে খায়।পিতার মুখে তৃপ্তির হাসি। অবিশ্বাস্য হলেও এটা বাস্তব।
রোকসানা রহমান

নির্জন নিবাসে
কেউতো জানেনা শুনেনা বিষাদ বেদনার নিরব কান্নার চাপা আর্তনাদ।
তবুও তো মেকাপের আড়ালে আমরা ঢেকে রাখি বিষণন্নতা
হাসি, কথা বলি, হৃদয়ে ক্ষরণ বয়ে যায় নিরবতায়।
কান্নার মানুষেরা যেন এক একটি জীবন্ত লাশ,
কখনো দীর্ঘশ্বাসের ফানুসে ওড়ে আশার স্বপ্নচোরা
হাত বাড়াতেই শূন্য শূন্য ফানুস খেলা।
তবুও তো পৃথিবীর উপরে হাঁটি ছন্দহীন কংক্রিটে —
মানুষের কোন ছায়া নেই
ভালোবাসাহীন কঠিন ছলনার অবরুদ্ধ স্বপ্নছাড়া।
এতো আলো, তবু জীবন বিশ্বাসীর পরতে পরতে
শীতল অন্ধকার।
প্রয়োজন শেষে কেবা কার হয়,
চেনা সব আচেনা হয় বড় বেশি ব্যস্ততায়, বড় বেশি অবহেলায় ভালোবেসে যান্ত্রিক চতুরতায় কতশত রাধিকা হারায়—
সম্পর্কের আবেগী কথার দীর্ঘশ্বাস ধ্বনী ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে কাচের দেয়ালে দূর্বোধ্য হাহাকারে…..!
তবুও কেন বাঁচি, বাঁচতে যে হয়। প্রয়োজন শেষ হলে
বিধাতার খেলা চলে একোন অমোঘ নিয়মে।
সেই শ্বাসের প্রশ্বাসে কেবলই শুনি জড়িয়ে থাকা
কৌশলী কাম ধ্বনী।
প্রত্যহ চলার পথে মৃদু পায়ে থমকে দাঁড়ানো ফুটপাতে
তাকিয়ে দেখি
আশ্রয়হীন মেঘেঢাকা ঐ আকাশ রঙহীন মধ্যযুগীয় নাবিকের এক একটি শিকারী হাত।
জানি নিরাশ্রয়ের আশ্রয় হবে কোন একদিন যে মাটিকে ভালোবাসি সেইতো হবে ভরসার ছাদ,
রাখবে সেদিন যতনে আমায় ছোট্ট মাটির নির্জন নিবাসে।
হয়তো আর কান্নারা কোনদিন কাদঁবেনা নিশীথ রাতের নির্ঘুম দুঃস্বপ্নে একটু খানি ভালোবাসা, মমতা কিংবা স্নেহের বন্ধনে ভরসা হারানোর বেদনায়।
রনি রেজা

চন্দ্রানল
আকাশ ছোঁবার বাসনায়
লুটিয়েছি মাটির বুকে
উপেক্ষিত জীবন পুড়িয়েছি -চন্দ্রানলে
যে আলো আমার ঘরে
তা প্রতিদিন বাড়ে
পুরনো কাব্যে নতুন ছন্দ
আমার পূর্ণ আনন্দ
নিত্য মায়ার আনাগোনা
আর একটি রঙমাখা ক্যাম্পাস
জীবনের স্বপ্নগুলো আঁকি
পরম যত্নে রাখি
নৃত্যে আনন্দে চলুক দিন
মায়াজের হল তিন l
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আমার কিছু মানুষ দরকার
আমার কিছু মানুষ দরকার—
যাদের সঙ্গে হাসতে পারি;
যাদের সঙ্গে গাইতে পারি,
একজনমের গল্পগুলো
সবার কাছে বলতে পারি।
আমার কিছু মানুষ দরকার
যারা খুব বন্ধুবৎসল-উপকারী
ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গায়ে খাটবে
সবশেষে যা থাকে তা-ই খাবে।
আমার কিছু মানুষ দরকার
তিনজনে এককাপ চা খাবে
খালি পকেটে ক্ষুধা নেই বলে
রাতভর গল্প করে কাটিয়ে দেবে।
আমার কিছু মানুষ দরকার
অসুস্থ হলে হাসপাতালে রাত জাগবে
নাওয়া-খাওয়া চুলায় যাক
রক্তের জন্য সারাশহর চষে বেড়াবে।
আমার কিছু মানুষ দরকার
রোগের কাছে হেরে গেলে—
শোক সংবাদের মাইক ধরবে
জানাজায় সবার পেছনে
চুপিসারে চোখের জল ফেলবে।
গোলাম কবির

একদিন হৃদয়পুরে
একদিন সকাল থেকে ঠিক দুপুর তক
তোমার নামে বৃষ্টি ঝরল অঝোরে হৃদয়পুরে।
তারপর সূর্য যখন অট্টহাসি হেসে উঠল,
একটা ঘুঘু তখন একলা কাঁদতে ছিলো
অবিরত হৃদয়পুরে শুধু তোমারই বিরহে।
এরপর ঝুপ্ করে সন্ধ্যা যখন এলো
সূর্যটাকে আড়াল করে,
তখন শুধুই গাঢ় অন্ধকার জেঁকে
বসে ছিলো ঐ হৃদয়পুরেই।
আমি তখন মনখারাপের শহরে একলা জেগে
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম
তুমিহীনতার গভীর বেদনার
তীব্র বিষে নীল এবং
ঠিক তখনই অন্ধকারেই একটা তক্ষক
ডাকতে ছিল বারবার এবং রাতের
নির্জনতার সুযোগ নিয়ে ডানা ঝাপটিয়ে
আমাকে ভয় দেখাতে চাচ্ছিল
পেঁচা সহ কয়েকটা অদেখা রাতজাগা পাখি,
ঐ হৃদয়পুরে তখনও তুমুল বৃষ্টি
ঝরেছিল তোমার নামে!
মোফাক হোসেন

কাফনের দিকে ঊষার দৃষ্টি
শত শত বছর ধরে জ্বলে উঠে আগুন ধপ করে,
আকাশে উড়ে যায় কাফন—
শিশু ঊষার দিকে তাক করে।
জীবনের অংক মেলাতে গিয়ে,
গ্যালারিতে বসে নক্ষত্রেরা হাসে—
সামনের সারিতে স্বপ্নগুলো আজও হাতছানি দিয়ে ডাকে।
যেখানে হিটলারের মতো মশা বিলীন হয়েছে,
বরফের মতো ইতিহাসের শ্মশানে,
ক্লান্ত প্রাণ ঢেকে ছিল সবুজ ঘাসের মলিন অভিমানে।
চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়তেই—
কাফনের রং সেদিন থেকে ম্লান হয়ে যায় ধীরে ধীরে।
পরাণ মাঝি

ব্রহ্মাক্ষর
শরীর ছিড়ে খায় উলঙ্গ বাতাস ; গান গায় গুনগুন শীতল জ্যামিতিক স্বরে
ঘরোয়া কনকচাঁপা রঙে শব্দময় সহজ প্রহর
চুরি করে দীর্ঘশ্বাস চাপা বিদ্যালয়ে বিষ ও মধু ; সুরেলা স্বজন খোঁজে শিশির ফুল
সবুজ মোহ বিস্তৃত প্রকাশ-বিন্দুর রামধনু ; আলোর নন্দনে পাখিময় আকাশের নীল ও সাদা
শরৎ উড়ে আসে চির আনন্দ সখা হয়ে ; লবণাক্ত ঘাম আগলে ব্রহ্মাক্ষর খুঁজি সংসার ধারায়
শুরু ও শেষের মধ্যে নিহিত থাকে অনন্ত জীবনসংহিতা
সোমা বিশ্বাস

আপন ঘর
ছোট্ট একটি ঘর
তুই কি আমার পর?
পরের মুখে হাসি
পড়তে ভালোবাসি
ভালোবাসা ফুলে কাঁটা
সখা সখীর হৃদয় আটা
অন্ধকারে ফুটছে আলো
দেখতে তারে দুচোখ মেলো
মনের ঘরে বিবাদ করে
কি যে আগে কে বা পরে
যদি হয় ছন্দপতন…
থাকবে না কিছু মনের মতন?
নিরাশার পাশে আশা থাকুক
অবুঝ মনেও ভরসা রাখুক-
হাতের ওপর রাখা হাত
করেনা সব সময় বাজিমাত
মনের ঘরে কড়া নাড়ে
কারা যেন বিভাগ করে
যোগ বিয়োগের অংকগুলো
করছে যেন এলোমেলো
আকাশ জুড়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানি
দমকা বাতাস এসে কয় কানাকানি
কিসের এত ভয় এত সংশয় তোদের?
হাসি কান্না সুখ দুঃখ সব হৃদয়ের…!
সব কিছু জমাট বাধুক মনের ঘরে
তোরা যাস না বহু দূরে;
থাক একসাথে জুড়ে
তোদেরই আপন ঘরে।।
মুন চক্রবর্তী

প্রাণের সন্ধানে
মুক্ত বাতাসে ঢেলে দিও দারুচিনি
সুবাসিত ঘ্রাণে পল্লবিত হবে সময়
নীলনদের ঢেউয়ে আকাশ নীলিমা
পাথরের নক্সিতে বিচিত্র বৈভব
ভাঙনের গল্প শুনেছি অনেক
একবার নাহয়, সাঁকোর গল্প বল
কালো ধোঁয়ায় কাজলের ভালবাসা
চোখের পরিভাষায় লিখো প্রেম উপাখ্যান।
ছবি ধর

সনাতনী দুর্গাপূজা
মেঘেমেঘে ভাসমান আগমনী কোলাহল,
শ্বেতশুভ্র কাশফুল নদীতীরে ঢলোঢল।
দশদিশে ঋতুরানী শরতের আগমনী,
চিরন্তন সনাতনী বজ্রকণ্ঠে আবাহনী।
মাতৃপক্ষে মহালয়া পিতৃপক্ষ ঊষাকালে,
পেজাতুলো নীলাকাশে ছায়াভাসে নীলজলে।
সাজোসাজো বনলতা বিকশিত অনুপম,
দিঘিজলে টলমল কোকনদ নিরুপম।
আদিদেব মহাদেব নন্দিভৃঙ্গি শিবভক্ত,
দশভূজা শিবানীর তেজদীপ্ত চক্ষুরক্ত।
ধূপদীপে আরাধনা নানাবিধ উপাচারে,
নাশিনীর আগমন অসুরের পাপাচারে।
ক্ষতচিহ্ন নিরানন্দ হতাশার বেড়াজালে,
নিমজ্জিত অন্ধকারে জড়িয়েছে কূটজালে।
বীরদর্পে দশঅস্ত্রে সংহারো দেবীরূপে,
বঙ্গবাসী প্রার্থনায় ভক্তিভরে সিদ্ধিরূপে।
আবদুস সালাম

ধর্ম গর্ভবতী হয়
সংবিধানের পাতাগুলো ধর্মসূত্র দিয়ে বাঁধা
টানাটানি আর উৎপীড়ন জনিত অসুখ ওদের শরীরে
সূতো ক্ষয়ে যায় ক্রমশঃ
সংবিধানের পাতাগুলো উড়ে যায় শকুনীদের পাড়ায়
স্বর্গের পাসপোর্ট বিলি করে ধর্ম পুরুষ;
সন্দেহহীন নমস্য ভাষণে লিখে দেয় দানপত্র
আমরা সন্ন্যাসী হই
লোভের দেরাজে জমা হয় সন্ন্যাসী ক্ষুধা
উগ্রসভ্যতার ধর্ষণে ধর্ম হয় গর্ভবতী
মূর্খ মানুষেরা শেখায় সংবিধানের পাঠ
ইতিহাসের অলিন্দে ঢুকে পড়ে চাতকের দল
সার্ভে হয় পাড়ায় পাড়ায়
প্রেমের মধু রসে ভিজে সংবিধানের মরশুমী প্রেম
পরকীয়া প্রেমের যৌথ খামারে ধর্ম- চাঁদ ছায়া ফ্যালে
প্রেমের কাহিনী শুনতে শুনতে ধর্ম গর্ভবতী হয়
প্রিয়াঙ্কা নিয়োগী

জীবনের জুবিন
আসামে জন্ম,
“অ আ থেকে য়- সব জায়গায় জয়ত্র।
অতুলনীয় মহিমান্বিত,
গানের ভুবনে গলার মিষ্টি মাধুর্য।
কি যে আছে তার কণ্ঠে!
সবার থেকে আলাদা তবে,
অপ্রতিরোধ্য গানের সমাবেশে,
গান শুনলে মন তাজা, শান্ত, মিষ্টি চট করে।
জয় করে প্রতিটি মানব মনে।
ব্রহ্মপুত্র নদীর জল মচকে চলে,
মন মরুভূমি কষ্টে বুক ফেটে,
জীবনহীন জুবিনের নামে।
গানে রাজা, কণ্ঠ প্রতিটি মানুষের প্রাণে,
রাজা মানবতাতে,
ভালোবাসায় ভরপুর মানবজাতিতে,
জগৎ ব্যাক্ত সিক্ত মুগ্ধ জীবনের জুবিনে।
আছে শ্রদ্ধার সাথে প্রতিটি জীবনে,
থাকবে যুগ থেকে যুগান্তরে।
কপিল কুমার ভট্টাচার্য্য
শারদীয়া মায়ের আগমন
ভোরের শিশির ভীষণ খুশী আগমনীর ছোঁয়া লেগেছে আজ চারিদিকে,
কাশ অনবরত মায়ের আগমনের পথ করছে সুসজ্জিত,
শিউলি তার আঘ্রাণে শুরু করেছে মায়ের আহ্বান,
তুলির টান প্রায় শেষ,
নতুন বসন-অলংকারে সেজে উঠেছে মায়ের কলেবর,
পৃথিবীবাসী হয়ে উঠেছে আনন্দমগ্ন মহোৎসবের উন্মাদনায়।
হান্নান বিশ্বাস

এ শহরে ঈশ্বরের বাড়ি
এ শহরে ঈশ্বরের বাড়ি,
রিফ্লেক্টিভ কাঁচ দিয়ে পরিবেষ্টিত ও সংরক্ষিত;
ছুঁতে গেলে প্রতিফলিত হই!
ঘষা কাঁচের জানালা,
বাইরে থেকে তো কিছুই দেখা যায় না;
শুধু ভিতর থেকে দেখা যায়!
দরজার কলিংবেলে—
একটা অত্যাধুনিক অশ্রবণ সহায়ক যন্ত্র!
বারবার সুইচ টিপে ব্যর্থ হই।
ভোকাল কর্ডে যেন—
ল্যারিনজাইটিস নামক ইনফেকশনের কারণে, আগ্নেয়গিরি ঘুমিয়ে পড়েছে!
ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নে,
সেলাই করে সুখ-কাঁথা বানিয়ে সামলে রাখি,
হৃৎপিণ্ডের ওয়ারড্রোবে।
তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের নগ্নতা
তোমার চোখে ডুবব
অন্ধকারের ভেতর ঝলমলে অগ্নির মতন
তোমার ঠোঁটের ভেজা চাদরে
আমার সমস্ত ক্ষুধা জেগে ওঠে।
তুমি যখন নিঃশ্বাস ফেলো কানে
শরীর ভেঙে যায় ধীরে ধীরে
শব্দহীন উল্লাস, আমি কেঁপে উঠি…
যেন সেই চিৎকার, আমাদের নগ্নতার সাক্ষী।
গল্প
আস্তে আস্তে ওরা খাঁচার দরজাটা খুলে দিল। বন্দী খাঁচার পাখিরা প্রথমে অবাক হল, তারপর খাঁচার বাইরে এসে মুক্তির আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। আনন্দে দুই ভাইয়ের গায়ে উঠলো মাথায় উঠলো, নাচলো, মিষ্টি করে চুমু খেলো, সুরেলা কণ্ঠে ডাকলো, দুইভাই সব ভুলে পাখিদের সাথে আনন্দে মেতে উঠলো। তারপর একসময় ‘ভালোবাসার পাখিা’ দুইভাইকে অনেক ভালোবাসা দিয়ে, আদর দিয়ে নানা রঙের সব পাখিদের নিয়ে ডানা মেলে, আকাশের বহু-বহু দূরে রামধনু রঙে রাঙিয়ে নীল দিগন্তে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।
ভালোবাসার চোখে জল

প্রিয়তোষ ঘোষ
বুরুন্ডি গ্রামের পশুপতি দাসের ছিল সুখের সংসার। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, মাঠ ভরা শষ্য, কোন অভাব ছিলনা সংসারে। পশুপতি বাবুর ছিল দুই ছেলে। তাদের বড়টির নাম ছিল শ্রবন আর ছোটটির নাম ইন্দ্র। গ্রামের মানুষ ওদের শ্রবনিন্দ্র বা শ্রবনেন্দ্রিয় বলে ডাকতো। দুইভাই যথাক্রমে পঞ্চম ও সপ্তম শ্রেনীতে পড়তো। পড়াশুনায় ভালো হলেও গ্রামের ছোটদের মধ্যে দুইভাই ভীষন দুষ্টু বলে পরিচিত ছিল। ওদের দুষ্টুমীতে গ্রামের লোক সবসময় ভীষন সম্ভস্থ থাকতো। এইরকম দুষ্টু দুইভাই একদিন বাবাকে বললো-
বাবা আমরা বাড়িতে সুন্দর সুন্দর পাখি পুষবো, আমাদের কিনে দেবে?
বেশ দেব, তবে আমাকে কথা দিতে হবে যে, তোমরা মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, আর গ্রামের সকলের সাথে দুষ্টুমী করবে না-
ওরা সমস্বরে বলে উঠলো আমরা আর দুষ্টুমী করবো না বাবা।
বেশ তাহলে সামনের রথের মেলায় তোমাদের পছন্দমত পাখি কিনে দেব।
জ্যেঠু তুমি কি করে পাখিদের ভাষা বোঝো! ওদের ভাষায় কথা বলো! তোমার কথা শুনেই তো সব পাখিরা আমাদের এত আদর করলো, ভালোবাসলো! ইন্দ্র বলে উঠলো। ইন্দ্রের কথা শুনে সন্ন্যাসী হো হো করে হেসে উঠলেন।
তারপর রথের মেলায় বাবার সাথে গিয়ে দুইভাই ওদের পছন্দমত পাখি কিনলো। ওদের বাবা পশুপতি বাবু ওদের বাড়ির রাস্তার পথ দেখিয়ে দিয়ে, শহরের পথে সাইকেল চড়ে চলে গেলেন। এই যে খোকাবাবুরা কি নাম তোমাদের? কোন গ্রামে থাকো? বাবার নাম কি? বাঃ তোমরা হাট থেকে এতগুলো সুন্দর সুন্দর পাখি কিনেছো! তোমরা কি জানো এদের কি নামে ডাকে? দুইভাই প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওরা দেখলো একজন ভয়ঙ্কর চেহারার বিশালদেহী কালো আলখাল্লা পরা এক সন্ন্যাসী ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে!
ইন্দ্র ফিসফিসিয়ে শ্রবনকে বললো এই দাদা এই ভয়ঙ্কর চেহারার লোকটা আমাদার পাখিগুলো নিয়ে নেবে না তো?
আরে না না। ভয় পাস না ভাই আমি তো আছি। শ্রবন বললো-
লোকটা বললো কি খোকারা কিছু বলছো না যে ভারি, আমাকে দেখে ভয় পেলে নাকি!
ভয় পাবো কেন, আমরা তো এখন আর ছোট্টটি নই। শ্রবন উত্তর দিল
তাই নাকি! বেশ বেশ খুব ভালো তবে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও বড় বাবুসকল?
আমি শ্রবন ও আমার ভাই ইন্দ। আমাদের বাড়ি পাশের গ্রামের দাস পাড়ায়। আমার বাবার নাম শ্রীপশুপতি দাস।
পশুপতি বাবুর ছেলে তোমরা, সেই বিখ্যাত শ্রবনেন্দ্রিয়! তোমাদের দুষ্টুমীর কথা খুব শুনেছি। বেশ এবার পাখিদের নাম গুলো বল তো বাবারা? পারবে তো?
-নিশ্চয়ই পারবো শ্রবন বললো। ওটা বদ্রী, ওটা মুনিয়া, ওটা টিয়া আর ওটা ওটা ওটা
ঠিক মনে পড়ছে না।
আমি তবে বলে দিই? আলখাল্লা পরা লোকটি বললো
আপনি জানেন! আপনি বুঝি পাখি পোযেন?
হ্যাঁ বলতে পার পুষি আবার বলা যায় ওরাই আমায় পোষে। কি বলতে পারলে না তো? ওর
নাম বেনেবউ। তোমরা যখন পাখীদের এত ভালোবাসো আর তোমরা যদি আমার কথা শোন, তবে তোমাদের আমি এদের চেয়েও অনেক সুন্দর সুন্দর পাখি দিতে পারি। অবশ্য তোমরা যদি তা নিতে চাও। আমার আশ্রমে সামনের ছুটীর দিন এসো। আমি তোমাদের বাবাকে বলে আশ্রমে আসার অনুমতি করে দেব।
ইন্দ্র বললো কিন্তু সন্ন্যাসী জ্যেঠু আমাদের কাছে আর পয়সা নেই, বাবা শহরে গেছেন আমাদের স্কুলের বই-খাতা কিনতে।
সন্ন্যাসী না না পাখির জন্যে তোমাদের কিছু দিতে হবে না বাবারা, পাখি পোষার যে কত আনন্দ তোমাদের দুইভাইকে দেখে আজ বুঝতে পারলাম। সেদিন রাত্রে শুয়ে দুই ভাই সন্ন্যাসী ঠাকুর আর পাখীদের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল।
তারপর একদিন ছুটির দিনে দুইভাই বাবার অনুমতি নিয়ে ঐ সন্ন্যাসী ঠাকুরের কথামত পাশের গ্রামে তাঁর আশ্রমের উদ্দ্যেশে রওনা দিল। নদীর ধারে বিশাল বট গাছের নীচে সন্ন্যাসী ঠাকুরের আশ্রম। দুইভাই শ্রবন আর ইন্দ্র বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলো ঐ সন্ন্যাসী চোখবুজে হাঁটুমুড়ে আসনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন, আর ওর সারা শরীর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত রঙের বদ্রী টুনটুনী -মুনিয়া -কাকাতুয়া -বেনেবউ-টিয়া আরো কতশত নাম না জানা পাখী! হটাৎ দুই ভাইয়ের পা -এর শব্দে পাখিরা ভয়ে উড়ে গাছে গিয়ে বসলো। সন্ন্যাসী ঠাকুর চোখ মেললেন। দেখলেন ওদের দুজনকে।
স্মিত হেসে বললেন আরে এস এস বাবা সকল
সন্ন্যাসী ঠাকুর পাখীদের হেসে বললেন বাছারা ভয় পাস না, এরা খুব ভালো ছেলে, এরা তোদের খুব ভালোবাসে। সন্ন্যাসী ঠাকুরের কথা শুনে সব পাখীরা আবার আনন্দে কিচির মিচির করতে করতে গাছ থেকে নেমে এল। তারপর মিষ্টি সুরেলা সুরে আওয়াজ করতে করতে ওদের দুই ভাইয়ের কোলে বসলো, মাথায় বসলো, গালে চুমু খেল। এইভাবে দুইভাই প্রায় সারাদিন পাখীদের সাথে আনন্দে খেলায় মেতে উঠলো। তখন কে বলবে ওদের ডানপিটে, দুষ্টু। একটা ছোট্ট লাল-সবুজ পাখী দেখে দুই ভাইয়ের খুব পছন্দ হয়েছিল।
সন্ন্যাসী ঠাকুর ঐ ছোট্ট লাল-সবুজ পাখীটার কি নাম? আমাদের দেবে? এক নিঃশাসে বললো দুই ভাই।
সন্ন্যাসী ঠাকুরের ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝিলিক খেলে গেল।
মাথা ঝাকিয়ে বললেন ওহো! তোরা আমার সুন্দরীকেই পছন্দ করলি বাবারা! ও হচ্ছে
ভালোবাসার পাখি, লাভবার্ড।
তারপর কিছুক্ষন চুপ সন্ন্যাসী ঠাকুর একটু বললেন বেশ তোমরা যখন ওকে নিতে চাও তো নিয়ে যাও, তবে একটা কথা মনে রেখো বাবারা, ও ভালোবাসার পাখি, ঐ পাখি তোমাদের ভালোবাসা না পেলে কিন্তু মরে যাবে। কথাটা মনে থাকবে তো বাবারা?
থাকবে ঠাকুর। আসুস্থ করলো দুইভাই।
আস্থ্য সন্ন্যাসী জ্যেঠু অভয় দাও তো একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই কি কথা বলো?
আচ্ছা জ্যেঠু তুমি কি করে পাখিদের ভাষা বোঝো! ওদের ভাষায় কথা বলো! তোমার কথা শুনেই তো সব পাখিরা আমাদের এত আদর করলো, ভালোবাসলো! ইন্দ্র বলে উঠলো। ইন্দ্রের কথা শুনে সন্ন্যাসী হো হো করে হেসে উঠলেন।
বললেন তোমরাও পারবে বাবারা, তবে তার আগে তোমাদের যে পাখিদের ভালোবাসতে হবে, ওদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। ওদের সত্যি ভালো না বেসে, বন্দি করে যদি ভালোবাসার ভান কর, তবে ওরা তা ঠিক বুঝতে পারবে। আগে মন দিয়ে পাখিদের ভালোবাসো। তারপর দেখবে তোমরাও ওদের সব কথা বুঝতে পারবে।
অবশেষে, সারাদিন পাখিদের সাথে কাটিয়ে, সন্ধ্যায় একটি খাঁচায় ওদের পছন্দের ভালোবাসা পাখিকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরলো দুইভাই। ভালোবাসার পাখিকে পেয়ে অন্য সব খাঁচার পাখিরা প্রথমে আনন্দে নৃত্য করলো, অনেক আদর করলো, তারপর ডাকাডাকি শুরু করে দিল। শ্রবন-ইন্দ্রের মা বাবাও লাভবার্ড পাখিকে দেখে খুব খুশী হলেন।
এরপর রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে দুইভাই শুয়ে পড়লো। রাত্রে স্বপ্নের মধ্যে দুইভাই দেখতে পেল ওদের প্রিয় ভালোবাসার পাখিটার চোখে জল, পাখীটা কাঁদছে। বলছে কি বাবারা তোমরা না ভালো ছেলে, তবু আমাদের বন্দি করে রেখেছো! ঘুম ভেঙে গেল ওদের। তখন ভোর হয়ে আকাশ পরিস্কার হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠেই শ্রবন-ইন্দ্র ছুটলো খাঁচার দিকে-খাঁচার দিকে তাকিয়ে ওদের তখন অবাক হবার পালা। ওরা দেখলো, খাঁচায় বন্দি সব পাখিরা একসাথে আকাশের উড়ে যাওয়া অন্য পাখীদের দিকে তাকিয়ে করুন সুরে ডাকছে। ভালোবাসার পাখির চোখে সত্যি জল! সব পাখিরাও আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। ঐ দৃশ্য দেখে ওদের শিশু মনও কেঁদে উঠলো। ওদেরও চোখ জলে ভরে এল। কিছুক্ষন বন্দি খাঁচার পাখিদের এই দৃশ্য দেখতে দেখতে, দুই ভাইয়ের সন্ন্যাসী জ্যেঠুর কথা মনে পড়লো।
সন্ন্যাসী বলেছিলেন ও বাবা ভালোবাসার পাখি ভয়মুক্ত ভালোবাসা না পেলে ও পাখী মরে যাবে কিন্তু…
এই কথাটা তখন ওদের কানে বাজছিল ওরা সন্ন্যাসীর কথাটা ভাবতে ভাবতে খাঁচাটার সামনে এল। তারপর আস্তে আস্তে ওরা খাঁচার দরজাটা খুলে দিল। বন্দী খাঁচার পাখিরা প্রথমে অবাক হল, তারপর খাঁচার বাইরে এসে মুক্তির আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। আনন্দে দুই ভাইয়ের গায়ে উঠলো মাথায় উঠলো, নাচলো, মিষ্টি করে চুমু খেলো, সুরেলা কণ্ঠে ডাকলো, দুইভাই সব ভুলে পাখিদের সাথে আনন্দে মেতে উঠলো। তারপর একসময় ‘ভালোবাসার পাখিা’ দুইভাইকে অনেক ভালোবাসা দিয়ে, আদর দিয়ে নানা রঙের সব পাখিদের নিয়ে ডানা মেলে, আকাশের বহু-বহু দূরে রামধনু রঙে রাঙিয়ে নীল দিগন্তে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। সেই দিকে চেয়ে শ্রবন আর ইন্দ্রের চোখ যে কখন আনন্দের জলে চিক্-চিক করে উঠলো তা ওরা বুঝতেও পারলো না। তারপর থেকে গ্রামের কেউ আর কোনদিন ওদের দুষ্টুমী করতে দেখেনি।,🍁
🍂লোক-কথা
এই বলে প্রথম পুরুষটি সবচেয়ে বড় ছেলেটিকে ডেকে তার হাতে একটি মেয়ের হাত তুলে দিলেন। তারপর সেই নবদম্পতিকে পশ্চিমে চলে যেতে বললেন। সেখানে গিয়ে তারা দুইজনে পিট-নদীতে পরিণত হয়ে গেল। অন্য ছেলেমেয়েরা যারা শান্তিপ্রিয় ছিল, তাদের তিনি বাড়িতে রেখে দিলেন। তিনি তাদের বলে গেলেন –“তোমরা কিন্তু তোমার মায়ের যত্ন নেবে। তোমাদের মাকে আমি তোমাদের সঙ্গে রেখে যাচ্ছি।”
পাইউট ইন্ডিয়ান লোক-কথা

রাখী নাথ কর্মকার
[পাইউট ইন্ডিয়ানরা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট বেসিনে বসবাসকারী আদিবাসীদের তিনটি অ-সংলগ্ন গোষ্ঠী। পৃথিবী তো বটেই, পিরামিড লেক, স্টিলওয়াটার মাউন্টেন কিংবা ‘স্টোন মাদার’এর মতো নেটিভ আমেরিকান হেরিটেজ সাইটের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে নানা লোক-কথা প্রচলিত রয়েছে তাদের মধ্যে। এই গল্পটি তেমনই একটি অরিজিন মিথ।]
সে বহু বহুদিন আগের কথা। একদিন সমস্ত আদিম ইন্ডিয়ান উপজাতিদের পিতা নেভাদার এই অঞ্চলে এসে উপস্থিত হন এবং স্টিলওয়াটারের কাছে একটি পাহাড়ে বাস করতে শুরু করেন। কথিত আছে, তার জন্ম হয়েছিল রিস নদীর কাছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মহান ও ভালো মানুষ। কিন্তু তিনি খুব নিঃসঙ্গ ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই, তিনি তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য কাউকে চাইছিলেন।
তার বেশ কিছু পরে, প্রথম মানবী প্রথম পুরুষের কথা জানতে পারেন। প্রথম মানবী প্রথমে একটি ভালুককে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি মনে মনে আশা করে ছিলেন যে কোনও দিন তিনি কোনও মানুষকে দেখতে পাবেন। কিন্তু তার এই ভাবনার কথা অজান্তে পেরে সেই ভালুক খুব ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল। একদিন এই নিয়ে প্রথম মানবী ও ভালুকের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া শুরু হল। তারা দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করেছিল এবং অবশেষে প্রথম মানবী তাকে ছিটকে ফেলে একটি পাথরের টুকরো দিয়ে হত্যা করেন। তারপর তিনি ওই দেশ ছেড়ে প্রথম মানুষের সন্ধানে উত্তর দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শোনা যায়, মানবীর সেই সুদীর্ঘ ভ্রমণপথে তার অনেক আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আজও, নাকি মনো লেকের ধারে তার পায়ের ছাপ দেখা যায়।
যেখান থেকে তিনি পিট নদী আর তার পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবেন। সেখানে পৌঁছে প্রথম মানবী দিনের পর দিন সেই পাহাড়ে বসে কাঁদতেন। তার চোখের জল জমতে জমতে সেই অঞ্চলে একটা বিশাল বড় হ্রদ তৈরি হয়ে গেল। সেই হ্রদই হল গিয়ে “পিরামিড লেক”।
চলার পথে, ইয়েরিংটনের কাছে, প্রথম মানবী হঠাৎই এক দৈত্যের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। দৈত্য তাকে খাওয়ার চেষ্টা করলে প্রথম মানবীর সঙ্গে তার ভয়ঙ্কর লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই লড়াইতে অবশেষে প্রথম মানবী দৈত্যকে হত্যা করে বিজয়ী হন। সেই দৈত্যের দেহ তারপর পাথরে পরিণত হয়ে যায়। পাইউট ইন্ডিয়ানদের বিশ্বাস, ইয়েরিংটনের কাছে সেই পাথরটি আজও দেখা যায়।
চলতে চলতে অবশেষে তিনি স্টিলওয়াটার মাউন্টেনে এসে পৌঁছলেন। সেখানে পৌঁছেই দূর থেকে তিনি এক সুদর্শন পুরুষকে দেখতে পেলেন। কিন্তু পাছে সেই পুরুষটি তাকে দেখেই স্টিলওয়াটার মাউন্টেন ছেড়ে চলে যান এই ভেবে তিনি বেশ কিছুদিন পাহাড়ের আনাচেকানাচে লুকিয়ে রইলেন। একদিন সকালবেলা, পুরুষটি মাউন্টেনের চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম মানবীর পায়ের ছাপগুলি দেখতে পেলেন। কৌতূহলী হয়ে পুরুষটি আশেপাশে খুঁজতে শুরু করলেন, “এ কার পায়ের ছাপ?” অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে এক পাহাড়ের আড়ালে তিনি প্রথম মানবীকে দেখতে পেলেন। পুরুষটি প্রথম মানবীকে ডেকে বললেন যে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেউ তার আশেপাশে আছেন –“তুমি নিশ্চিন্তে বেরিয়ে আসতে পারো আমার সামনে। কোনও ভয় নেই!”
তার কথা শুনে অবশেষে প্রথম মানবী আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। প্রথমে তো মানবী খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন, শুধু তাই নয়, এতদিন এতটা পথ পায়ে হেঁটে এসে তিনি খুব ক্লান্তও হয়ে পড়েছিলেন। প্রথম পুরুষ তা স্পষ্টই লক্ষ্য করলেন এবং প্রথম মানবীকে সদয়ভাবে প্রশ্ন করলেন –“তুমি কি আমার সঙ্গে আমার কুঁড়ে ঘরে যাবে? আমি জানি তুমি খুব ক্ষুধার্ত। আমি তোমাকে আশ্রয় ও খাবার দিতে পারি।” পুরুষটির কথা শুনে প্রথম মানবী নম্রভাবে তাকে অনুসরণ করলেন।
কুঁড়ে ঘরে পৌঁছে ফলমূল খাওয়া শেষ হওয়ার পরে প্রথম পুরুষ প্রথম মানবীকে অনুরোধ করলেন –“তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে থাকতে পার।” সেই রাতে কিন্তু প্রথম মানবী সেই ঘরের সামনে আগুনের কাছেই শুয়ে রইলেন। পরের রাতে প্রথম মানবী ঘরের দরজার পাশে গিয়ে ঘুমোলেন। এইভাবে প্রতি রাতে তিনি একটু একটু করে প্রথম পুরুষের কাছে এলেন, অবশেষে পঞ্চম রাতে তাদের দুজনের বিয়ে হল। কয়েক বছর পরে তাদের অনেকগুলি সন্তানের জন্ম হল। তাদের প্রথম যে সন্তানটির জন্ম হল, সেই ছেলেটির আচারআচরণ কিন্তু মোটেই ভাল ছিল না। ছেলেটি সবসময় অন্য শিশুদের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করত। একদিন যখন তারা মারামারি করছিল, তাদের বাবা তার সাথে কথা বলার জন্য ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। তিনি তাদের বললেন, যে তারা যদি এভাবেই নিজেদের মধ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে তাদের আলাদা থাকতে হবে। কিন্তু তিনি কথা শেষ করার আগেই তারা সবাই আবার মারামারি শুরু করে দিল।
ছেলেদের বাবা তা দেখে স্বাভাবিকভাবেই খুব রেগে গেলেন। তিনি তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি এবার আমি সত্যিই তোমাদের সবাইকে আলাদা করে দেব। আমি এখনই আমার আসল বাড়ি, যা আকাশে অবস্থিত…সেখানেই চলে যাব। তোমরা তোমাদের মৃত্যুর পর আমার কাছে আসবে। তোমাদের তখন যা করতে হবে তা হল…” তারপর তিনি দূর আকাশে মিল্কি-ওয়ের দিকে নির্দেশ করে বললেন –“ঐ ধুলোময় রাস্তাটা তোমরা অনুসরণ করবে। তাহলেই তোমরা আমার বাড়িতে এসে পৌঁছবে। সেখানে আমি অপেক্ষা করব তোমাদের জন্যে। আমি আশা করি, একদিন তোমাদের সকলেরই জ্ঞান হবে, এবং শান্তিতে একসাথে বসবাস করবে!”এই বলে প্রথম পুরুষটি সবচেয়ে বড় ছেলেটিকে ডেকে তার হাতে একটি মেয়ের হাত তুলে দিলেন। তারপর সেই নবদম্পতিকে পশ্চিমে চলে যেতে বললেন। সেখানে গিয়ে তারা দুইজনে পিট-নদীতে পরিণত হয়ে গেল। অন্য ছেলেমেয়েরা যারা শান্তিপ্রিয় ছিল, তাদের তিনি বাড়িতে রেখে দিলেন। তিনি তাদের বলে গেলেন –“তোমরা কিন্তু তোমার মায়ের যত্ন নেবে। তোমাদের মাকে আমি তোমাদের সঙ্গে রেখে যাচ্ছি।”
সেই ছেলেমেয়েরাই পরে “পাইউটস ইন্ডিয়ান” হয়ে ওঠে। অতঃপর প্রথম মানুষ পাহাড়ের দিকে যাত্রা করলেন এবং দেখতে দেখতে তিনি আকাশে গিয়ে উঠলেন। ধীরে ধীরে পাইউটরা একটি শক্তিশালী উপজাতিতে পরিণত হল। কিন্তু প্রথম মানবী তার প্রথম সন্তানের শোক ভুলতে পারলেন না। তিনি এতটাই দুঃখ পেলেন যে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তিনি প্রতিনিয়ত তার অন্য সন্তানদের কথাও ভাবতেন আর প্রতিদিন তাদের জন্য চোখের জল ফেলতেন।
একদিন তিনি স্থির করলেন তিনি একটি পাহাড়ের কাছে গিয়ে বসবেন, যেখান থেকে তিনি পিট নদী আর তার পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবেন। সেখানে পৌঁছে প্রথম মানবী দিনের পর দিন সেই পাহাড়ে বসে কাঁদতেন। তার চোখের জল জমতে জমতে সেই অঞ্চলে একটা বিশাল বড় হ্রদ তৈরি হয়ে গেল। সেই হ্রদই হল গিয়ে “পিরামিড লেক”। আর প্রথম মানবী সেখানে বসে থাকতে থাকতে একদিন পাথরে পরিণত হয়ে গেলেন। তার সেই প্রস্তরীভূত মূর্তি নাকি আজও সেখানে রয়ে গিয়েছে। কেউ সেখানে গেলে আজও দেখতে পাবে, পিরামিড লেকের পূর্ব তীরে প্রথম মানবী বসে আছেন, পাশে তার ঝুড়ি নিয়ে। “কুইয়িইডোকাডো”রা (পিরামিড লেক পাইউটস/কুই-উই ভক্ষকরা) সেই প্রস্তরীভূত মূর্তিটিকে আজও “স্টোন মাদার” বলে ডাকে।🍁
🍂গদ্য
নির্বুদ্ধিতা ও অমানুষিক চিন্তা ভাবনার জন্য বাঙালিকে এবং বাঙালি সমাজের মাথাদের এই নিম্নরুচির মানসিকতা দেখে তিনি বাঙালির এই রূপ কট্টর সমালোচনা করে ছিলেন।
বাঙালির বাঙালিত্ব

দুর্গাদাস মিদ্যা
আমাদের চিরকালের আত্মীয় বন্ধুর বন্ধু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা বলেছেন –‘সাত কোটি সন্তানেরে এ মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি’ ঋষিকল্প এই মানুষটি এমন কথা বললেন কেন? কোন কারণেই মনে হয় না বাঙালি সম্বন্ধে তাঁর এই মূল্যায়ন ভ্রান্ত। তিনি নিজে একজন বাঙালি হয়ে কেন বাঙালিকে এমন চোখে দেখলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে বাঙালির ইতিহাস নিয়ে একটু বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
এই একই বাঙালির জয়গান গেয়েছেন আর এক কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।’আমরা’কবিতায় তিনি বাঙালির জয়গৌরবের কথা বলেছেন। তিনি বলছেন — ‘বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়
বাঙালির ছেলে ব্যাঘ্রে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয়।
আবার বলেছেন — ‘আমাদের ছেলে বিজয় সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়
সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।’
তাহলে তো বাঙালি জাতির সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ কেন এমন এক ধারণা পোষণ করলেন!
নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে যার ফলে রবীন্দ্রনাথ এতটাই বিরূপতা প্রকাশ করেছেন! সেই কারণের অনুসন্ধানে কার্য কারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করি।
আমার ভাবনায় নবজাগরণের দুই প্রবাদ পুরুষ ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অপমান বাঙালি ব্রাহ্মণদের দ্বারা যেহেতু তিনি অর্থাৎ বিদ্যাসাগর সামাজিক মাৎন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবং তিনি নারী শিক্ষা প্রচলন করে ছিলেন। গৃহবধূদের মানুষ করার স্বপক্ষে প্রয়াস নিয়ে
ওদের ঘরের বাইরে বের করে এনেছিলেন। স্কুল স্থাপন করে নারী শিক্ষার দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন তা তৎকালীন টিকিধারি তথাকথিত সমাজ রক্ষকদের রোষে পড়েছিলেন এমন কি তাঁকে শারীরিক আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি। রামমোহন রায়কে ও হেনস্তা করেছিল এই কূপমন্ডুক ব্রাহ্মণ সমাজ। এই নির্বুদ্ধিতা ও অমানুষিক চিন্তা ভাবনার জন্য বাঙালিকে এবং বাঙালি সমাজের মাথাদের এই নিম্নরুচির মানসিকতা দেখে তিনি বাঙালির এই রূপ কট্টর সমালোচনা করে ছিলেন। এখনও আমরা দেখছি, প্রতিদিন দেখছি নিজ পরিবার সর্বস্ব স্বার্থপর একটা জাতি বাঙালি। প্রতিবেশী সুলভ কোন প্রীতি এখন আর চোখে পড়ে না যা অন্য জাতির মধ্যে খুব বিদ্যমান।
এই কারণে বাংলা ভাষায় কথা বললে যখন অন্য রাজ্যে বাঙালিদের উপরে অত্যাচার নেমে আসছে তখনও বাঙালি গর্জে ওঠে না সমস্বরে তখনি মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যায়ন ঠিক আছে। একটা স্বার্থ সর্বস্ব জাতি। পৌরুষত্ব কিছু নেই। এইসব দেখে আমাদের ও মনে হয় এই বাঙালিয়ানার জন্য কোন অহংকার নেই।তাই বোঝা যায় বাঙালি কোনদিন ই মানুষ হয়ে উঠলো না।🍁
🍂রম্য রচনা
বাড়ি থেকে এক ছুটে রাস্তায় এলেন, কিন্তু বাসটা তক্ষুনি বাই বাই করতে করতে বেরিয়ে গেল! ক্ষোভে তিনি বললেন— “বেইমান ড্রাইভার! যেদিন আমি দেরি করি সেদিনই আগে চলে যায়।” বাধ্য হয়ে টোটো ধরলেন। টোটো এমন চলছে যেন তিনি বেড়ানোর জন্য টোটো চড়েছেন। রেগে বললেন—
— “ভাই, আমি কি সাইডসিন দেখতে তোমার টোটো ধরেছি? তাড়াতাড়ি চালাও!”
মর্নিং শোজ দ্য ডিলেমা

পার্থসারথি মহাপাত্র
শিক্ষক মানেই শৃঙ্খলার প্রতীক। যাঁকে দেখে ছাত্ররা উচ্ছৃঙ্খল না হয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়। কিন্তু নৃসিংহবাবু সেই শৃঙ্খলার বিপরীতে চলেন, অথচ ভাব দেখান যেন তিনিই আদর্শ শিক্ষক! তাঁর জীবনদর্শন— “মর্নিং শোজ দ্য ডে”, কিন্তু তাঁর সকাল দেখলে পুরো দিন কেমন কাটবে, তা সহজেই বোঝা যায়।
রাতের বেলা তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন— “কাল থেকে সব কিছু ঠিক সময়ে করব।” মোবাইলে ঠিকঠাক অ্যালার্ম সেট করে ঘুমোলেন। স্বপ্নের দেশে বিচরণ করতে করতে হাতে আইসক্রিম। তিনি আইসক্রিম মুখে দিতেই হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। জিভে জল এলেও স্বপ্নের আইসক্রিম মুখে দেওয়ার আগেই বাস্তবে ফিরতে হল। বিরক্ত হয়ে মোবাইলের স্নুজ চাপলেন, আর অজান্তেই আবার ঘুমিয়ে গেলেন।
একটু পরে স্বপ্নে দেখেন দেরিতে স্কুলে যাওয়ায় বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে ক্লাসে যাচ্ছেন। এমন সময় হেডস্যার পেছন থেকে গর্জে বললেন,—“দেরি করলে কী হবে মনে আছে নিশ্চয়ই?” নৃসিংহবাবু ভয়ে করিডোরে দৌড়াতে গিয়ে মশারি টেনে ফেললেন। তড়িঘড়ি মোবাইল খুলে দেখেন স্কুল শুরু হতে আর মাত্র কুড়ি মিনিট বাকি। তাই দেখে হৃদস্পন্দন এমন বেড়ে গেল যেন ম্যারাথনে প্রথম পুরস্কার নিশ্চিত।
নৃসিংহবাবু তড়িঘড়ি উঠে দাঁত মাজার সঙ্গে তেল মাখা, শার্ট পরার সঙ্গে খাবার খাওয়া— সব একসাথে শুরু করলেন। টাই গলায় ঝোলানো, জুতোর ফিতা বাঁধা— সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত কসরত! তাড়াহুড়োয় এক পায়ে মোজা পরায় হয়নি— পকেটে পুরে নিলেন।
বাড়ি থেকে এক ছুটে রাস্তায় এলেন, কিন্তু বাসটা তক্ষুনি বাই বাই করতে করতে বেরিয়ে গেল! ক্ষোভে তিনি বললেন— “বেইমান ড্রাইভার! যেদিন আমি দেরি করি সেদিনই আগে চলে যায়।” বাধ্য হয়ে টোটো ধরলেন। টোটো এমন চলছে যেন তিনি বেড়ানোর জন্য টোটো চড়েছেন। রেগে বললেন—
— “ভাই, আমি কি সাইডসিন দেখতে তোমার টোটো ধরেছি? তাড়াতাড়ি চালাও!”
টোটোওয়ালা হেসে উত্তর দিল— “স্যার, যত দেরি করে যাবেন, জীবনকে তত বেশি উপভোগ করতে পারবেন।”
নৃসিংহবাবু বক্রোতি করলেন— “তুই এখানে কেন বাবা, তোকে তো কবি সম্মেলনে ডাকছে!”
অবশেষে স্কুলের গেটে পৌঁছাতেই দেখলেন গেট বন্ধ। টোকা দিতেই পিয়ন দরজা খুলল, তবে মুখভঙ্গি এমন যেন খুনের আসামি ভেতরে ঢুকছে। স্টাফরুমে গিয়ে দেখলেন হাজিরার খাতা হেডস্যারের টেবিলে। অগত্যা বাঘের খাচায় নৃসিংহের প্রবেশ। খাতায় লাল দাগ পড়ে গেছে— এ মাসে এটা দ্বিতীয়বার।
হেডস্যার মুচকি হেসে বললেন—
— “আজ থেকে ছাত্রদের শেখানো ছেড়ে তাদের কাছ থেকে শিখতে শুরু করুন।”
— “কী শিখব স্যার?”
— “প্রথমত শার্টের বোতাম লাগাতে, দ্বিতীয়ত টাই বাঁধতে। যান, ক্লাসে গিয়ে শিখে নিন।”
— “না মানে… স্যার, দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে তাড়াহুড়োয়…”
— “হ্যাঁ, ওই কারণেই তো আপনি যথাসময়ে হাজির হয়েছেন!”🍁
🍂কণাগদ্য
নির্জন নীরব গাছতলা পেলাম আকস্মিক ভাবেই৷ এবার ঘুমাব৷ পরদিন সকাল এলো৷ প্রভাত পাখি অদৃশ্য দরজায় ধাক্কা মারছে— ঘুম থেকে ওঠ৷ ঘুম থেকে ওঠ৷ নিদ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই জেগে উঠি৷ দেখি বেকারত্বের জ্বর আমায় গ্রাস করছে৷ পুরুষাঙ্গ থেকে কোনও সুর বের হচ্ছে না৷
অমিত পাল –এর গুচ্ছ কণাগদ্য

মেঘেদের সহবাস
ছেঁড়া ছেঁড়া পাঁউরুটির ন্যায় দুটি মেঘ নারী ও পুরুষ৷ কি বিচিত্র চেহারা তাদের৷ পিঠে চুম্বন করা পুরুষ মেঘ পড়ন্ত রোদের ছটা মাখতে ভালো বাসে৷ নারী মেঘ চাই অন্ধকার…
পদ্মবনে কামকেলিতে রত থাকা ডুবুরী হাঁস দু’টি ঐ মেঘেদের সহবাসের কথা জানে৷ কস্তুরী নয়, ছাই ভস্ম মাখা নারী মেঘ রক্তিম উজ্জ্বলতার দ্বারা নিজে অঙ্গ ঢাকছে দেখো৷ ফুটে উঠছে ওদের সহবাসের পদ্মফুল৷
আকস্মিক করাল গ্রাস নামে৷ কালো কালো ধোয়া, চর্বি জাতীয় বিকৃত মেঘ ওদের ঘিরে ফেলল৷ এবার ওরা দিশেহারা কাপালিক…
মেঘেরা হাসছে দেখো
গাছগুলির রক্ত কেমন যেন শুখিয়ে যাচ্ছে৷ বৃষ্টি নেই৷ তাই প্রতিদিনই জল দি৷ ঘুম পাড়াই৷ তবুও তাদের স্বাস্থ্য ফিরছে না৷ গাছেদের খাদ্য নালীতে বোধ হয় পাথর আটকেছে৷
লতানে সিম গাছ একরাশ হাসি ফুটিয়েছে৷ কিন্তু আমি চাই গোলাপের রক্ত প্রেম৷ কিংবা গোলাপি নাভিকুন্ড৷
গাঁদাফুল গাছের পত্রে ঔষধ তৈরির বিবরণ দেখেছি৷ সেবার সুরভীর পা কেটে যায়৷ বেরিয়ে আসে শ্বেতকণিকার বামন রূপ৷ তখনই দেখেছিলাম পাশের বাড়ির কাকীমা গাঁদা গাছের পত্র থেঁতলে রক্ত আটকাচ্ছে…
বাড়ির ছাতে এখন বাগান সাজিয়েছি৷ এটি নিছক অমূলক নয়৷ মায়ের আদরের ফুল গাছগুলি রাজ নন্দিনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিন্তু কোথায় সেই রাজনন্দিনীর পুরাতন আবেশ? কোথায় সেই কস্তুরী রেণু? বিবর্ণতার উচ্ছ্বাস বাড়ছে কেমন দেখো হয়ত তাই ঢেলে দি গোধূলি নামার আগে একগলা করে গঙ্গা জল৷
মেঘেরা হাসছে৷ হয়ত কটাক্ষ করে বলছে দে, দে আরও দে, ভালো করে একটু বেশী বেশী করে জল দে! যতটা পারিস শুধু ঢেলে যা, আমার অপেক্ষা ভুলেও করিস না…
মেলাতলার মাঠ
আমাদের গ্রামের খেলার মাঠ৷ মেলাতলার মাঠ নামেই পরিচিত, কারণ একটাই আমাদের গ্রামে ঐ মাঠটিতে ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে বড় মেলা হয়৷ বহু লোকের সমাগম৷ দেশ দেশান্তর থেকে লোকজনের ভিড় জমে৷ আমাদের গ্রামে মন্দিরে বুদ্ধদেবের শিলা মূর্তি পূজা হয়৷ যা ‘ন্যাঁংটাশ্বর’ নামেই পরিচিত৷ শিবরাত্রিতে এই দেবতারই পূজা উপলক্ষ্যে মেতে ওঠে দেশ বিদেশের মানবতা৷
মাঠটির অবস্থান বড়ই বিচিত্র৷ মাঠটির এক প্রান্তে আমাদের গ্রাম (শঙ্করপুর) এবং অন্যপ্রান্তে বাবলাডিহি গ্রাম অবস্থিত৷
বৈশাখের বিকেলে ছেলের দল ফুটবল খেলে৷ শীতের মরশুমে চলে ক্রিকেট খেলার আমেজ৷ আমিও খেলা ধূলায় নিমগ্ন হই৷ তবে ফুটবল খেলার পুরাতন আমেজটা আর নেই৷ খেলাধুলো কেমন যেন ঘৃণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ তবে শান্তির পরিবেশ একটা আছে বটে…
খেলা শেষে ক্ষণেক মুহূর্ত বিশ্রাম নেওয়া, মাঠের একপাশে সবুজ ঘাসের উপর বসে সমালোচনা করার বাতিকটা এখনো রয়েই গিয়েছে৷
কারুর কারুর মধ্যে চলে খেলা প্রসঙ্গে সমালোচনা৷ আবার কারুর কারুর চলে রাজনীতির সমালোচনা৷ জানিনা এর থেকে নিবৃত্তি কবে পাবো! হয়ত ক্ষণিক সমালোচনা থেকে মুক্তি পেতে সাঁঝ বেলায় ফিরে যায় ঘরের পথে…
ফিরিকোয়েনশি
বীজ পোঁতা জমিতে ছানাকাটা শ্যাওলারা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে কেমন! ঐ দূরের মোবাইল টাওয়ারের দিকে তাকালেই পাখিদের নৈঃশব্দের কথা কেমন যেন মনে পড়ে৷ ভেসে যায় নিজের সুবিধার্থে…
নস্টালজিক বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে আমি জানি সে আমার বিদীর্ণ হৃদয়ে বারবার কোদাল চালাচ্ছে৷ দেখো দেখো কতটা গভীরতা পেয়েছে কোদাল আঘাতে৷
জানি না 5g এলে কি হবে! তবে 3g, 4g, 5g নেটওয়ার্ক চাইলেও পাখিদের বংশবৃদ্ধি, বাস্তুুুতন্ত্রের কথা ভুলি নাই৷
ডানা পচে যাওয়া পায়রার শরীরের পোকাটা নিজেকে সত্যবান বলছে৷ শুধু তাকাচ্ছে বারবার আর বলছে ফিরিকোয়েনশিটা একটু কমলে ভাল হতো…
চাকরী চাই
অক্লান্ত চামড়া পুড়িয়ে দেওয়ার পর, কাঠঠোকরার ঠোকর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ঘুমানোর জন্য একটু ফাঁকা মূহূর্ত খুঁজছি৷ সমুদ্র তরী কখন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ছন্নছাড়া হয়ছে সে খোঁজ মালিক রাখেনি৷ নজরবন্দি শুধু আমার উপর৷
নির্জন নীরব গাছতলা পেলাম আকস্মিক ভাবেই৷ এবার ঘুমাব৷ পরদিন সকাল এলো৷ প্রভাত পাখি অদৃশ্য দরজায় ধাক্কা মারছে— ঘুম থেকে ওঠ৷ ঘুম থেকে ওঠ৷
নিদ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই জেগে উঠি৷ দেখি বেকারত্বের জ্বর আমায় গ্রাস করছে৷ পুরুষাঙ্গ থেকে কোনও সুর বের হচ্ছে না৷ এবার অদৃশ্য পাশবালিশ খুঁজি কিন্তু পাই না৷
এই অসুখ প্যারাসিটেমল খেলেও সারবে না৷ জানি, এর জন্য চাই হিজল বনের খসখস শব্দ, চাঁদনী রাত্রের গিটারের পদধ্বনি কিংবা চাকরী নামক বনফুল…🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : মহামিলনের কথা ও ফিরে পড়া বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।









