নতুন দিল্লি, ৫ জুলাই ২০২৫ : UPSC’র স্বপ্ন ছিল চোখে। সেই স্বপ্নের পথেই কঠিন প্রস্তুতিতে দিন কাটছিল ধীরেন্দ্র প্রসাদ (Dhirendra Prasad)-এর। কিন্তু হঠাৎই এক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল সবকিছু। শুক্রবার সন্ধেয় দিল্লির করোল বাগ (Karol Bagh)-এর বিশাল মেগা মার্ট (Vishal Mega Mart) শপিং মলে আগুন লাগার ঘটনায় ভয়াবহ পরিণতি হয় এই তরুণের জন্য। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় এক ব্যক্তির। আর ধীরেন্দ্রর মৃত্যু হয় লিফটে আটকে পড়ে, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে। পুলিশ ও দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় লিফটে আটকে পড়েন ধীরেন্দ্র, যিনি সেসময় দোকানের একটি ফ্লোরে উঠছিলেন। আগুন লাগার ফলে মলের বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়, সেই সঙ্গে থেমে যায় লিফট। আটকে পড়ে ধীরেন্দ্রর নিশ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হয়। লিফটের ভেতর অক্সিজেন কমে আসতে থাকলে নিজের মোবাইল থেকে ক’য়েকজনকে ফোন করার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কোনও সাহায্য পৌঁছায় না। শেষ পর্যন্ত নিজের ভাইকে একটি মেসেজ করেন ধীরেন্দ্র। সেই বার্তায় লেখা ছিল, “ভাই আমি লিফটে আটকে গিয়েছি। একদম শ্বাস নিতে পারছি না। দয়া করে আমায় বাঁচাতে আয়…” এই ছিল তার শেষ বার্তা।
ধীরেন্দ্রর মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আসে শনিবার সকালবেলা। অগ্নিকাণ্ডের প্রায় আট ঘণ্টা পর দমকল বাহিনী লিফটটি ভেঙে উদ্ধার করে তাঁর দেহ। ফোনে মেলে সেই হৃদয়বিদারক মেসেজ।স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী রাহুল সিং জানালেন, “আগুন লাগার সময় প্রচণ্ড ধোঁয়া হচ্ছিল। আমরা তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে আসি। কিন্তু অনেকেই তখন মলে আটকা পড়েছিলেন। ধীরেন্দ্র হয়তো সবার মতোই ভাবেনি, এভাবে মৃত্যু আসবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় মলের একটি ফ্লোরে শর্ট সার্কিট থেকে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য ফ্লোরে। দমকলের ১৬টি ইঞ্জিন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী কাজ শুরু করে। তবে পুরো এলাকা থেকে ধোঁয়া ও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে। এর মধ্যেই ঘটে যায় মর্মান্তিক কাহিনি।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিস (Delhi Fire Service)-এর এক আধিকারিক জানান, “আমরা খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাই। কিন্তু মলের গঠন এবং ধোঁয়ার পরিমাণ এতটাই ছিল, যে নির্দিষ্ট ফ্লোরে পৌঁছাতে অনেকটা সময় লেগে যায়। দুঃখের বিষয়, লিফটে আটকে পড়া ছেলেটিকে বাঁচানো যায়নি।”
ধীরেন্দ্রর পরিবার জানিয়েছে, তিনি বিহারের (Bihar) বাসিন্দা। দিল্লিতে থেকে UPSC প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইচ্ছা ছিল প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়ার। বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। পরিবারে একমাত্র ভরসা ছিলেন ধীরেন্দ্রই।
এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় মানুষজন। তাঁদের অভিযোগ, “শপিং মলের ভেতরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা একেবারে অনুপযুক্ত। কোনও ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তাও ঠিকমতো চিহ্নিত ছিল না। এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির পরিণাম।” এই ঘটনার পর দমকল বিভাগ ও দিল্লি পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। মলের ম্যানেজমেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আপাতত ওই মলটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।
ধীরেন্দ্রর ভাই সংবাদমাধ্যমে বলেন, “ও ছোটবেলা থেকেই খুব পরিশ্রমী। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে দিনরাত পড়াশোনা করত। ভাবতেই পারছি না, একটা মলে গিয়ে এভাবে মারা যেতে পারে আমার ভাই।” এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল রাজধানী দিল্লির মতো শহরেও কীভাবে শপিং মলগুলিতে নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, মলে আগুন লাগলে কিভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে একজন যুবকের? কেন লিফটে এমন পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করল না? অন্যদিকে, দিল্লি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় মল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে ও গাফিলতির প্রমাণ মিললে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধীরেন্দ্রর মতো হাজার হাজার তরুণ আজ প্রশাসনিক স্বপ্ন নিয়ে পথ হাঁটছে। কিন্তু একটা অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নই শুধু নয়, প্রাণও কেড়ে নিতে পারে, এই বার্তা দিল্লির করোল বাগের এই ঘটনা যেন পুরো দেশকে মনে করিয়ে দিল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :




